কাজে আসছে না ১৬ কোটি টাকায় নির্মিত পোনা বিক্রয়কেন্দ্র
Printed Edition
এম আইউব যশোর অফিস
যশোরের চাঁচড়া মাগুরপট্টিতে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মাছের পোনা বিক্রয়কেন্দ্রটি ব্যবসায়ীদের কোনো কাজে আসছে না। ভুল পরিকল্পনা, ত্রুটিপূর্ণ স্থাপত্যশৈলী ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে কোটি কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ ভেস্তে যেতে বসেছে, যার ফলে প্রতি বছর বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। দেশের অন্যতম প্রধান এই মৎস্য পল্লী থেকে সার্বিক পোনা সরবরাহের বড় অংশ এলেও আধুনিক সুবিধার নামে তৈরি কেন্দ্রটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
দেশের মোট ব্যবহৃত মাছের পোনার প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ হয় যশোরের চাঁচড়া থেকে। ৪০০ থেকে ৫০০ জন মৎস্যজীবী সরাসরি এবং প্রায় দুই হাজার মানুষ পরোক্ষভাবে এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। ফাল্গুন থেকে কার্তিক মাসের ভরা মৌসুমে চাঁচড়ার বাবলাতলা হাটে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ মণ পোনা বেচাকেনা হয়, যার দৈনিক বাজারমূল্য প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। ঢাকা, সিলেট, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ৫০-৬০টি ট্রাকে করে প্রতিদিন রুই, কাতলা, শিং, পাবদাসহ বিভিন্ন জাতের পোনা পাঠানো হয়। অথচ সরকারি অর্থায়নে নির্মিত বিশেষায়িত ডিজিটাল বিক্রয় ভবনটি মৎস্য বিভাগের অব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, ভবনটি নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ মৎস্য অধিদফতর আট কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮০ শতক জমি অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীতে আট কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৯ সালে উদ্বোধন হওয়া এই কেন্দ্রে ৫১টি হাউজ এবং দ্বিতীয় তলায় হাড়ি বসিয়ে ৬০ জনের মাছ বিক্রির সুযোগ রাখা হয়। কিন্তু বর্তমানে মাত্র সাত থেকে ১০ জন ব্যবসায়ী হাউজ বরাদ্দ নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছেন, বাকি ৪০টিরও বেশি হাউজ সম্পূর্ণ খালি পড়ে আছে।
কেন্দ্রে কর্মরত ব্যবসায়ী সামিউল্লাহ হোসেন জানান, সেখানে পানির সাপ্লাই লাইন অত্যন্ত সঙ্কুচিত এবং পানিতে প্রচুর আয়রন থাকায় তারা মারাত্মক সমস্যায় পড়ছেন। সদর উপজেলা মৎস্য অধিদফতরের সিনিয়র কর্মকর্তা রিপন কুমার ঘোষ স্বীকার করেন যে কেন্দ্রটি পুরোপুরি ব্যবহৃত না হওয়ায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। তবে তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অমৎস্যজীবীদের নামে দেয়া ৩০টি অবৈধ বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি কেন্দ্রটি পরিচালনা করছে। খুব শিগগিরই এক মাসের মধ্যে নতুন করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের নামে হাউজ বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরো জানান, খোলা বাজারে লেনদেন করে ক্রেতারা প্রায়ই ওজন ও গুণে ঠকছেন। বিকাশে টাকা নিয়ে পোনা না দেয়া কিংবা ১০ কেজির বদলে ছয় কেজি দেয়ার অহরহ অভিযোগ আসছে, যা চাঁচড়ার ঐতিহ্য ও সুনাম নষ্ট করছে। অথচ সরকারি কেন্দ্র থেকে কেনাকাটা করলে মধ্যস্থতা ও আইনি সুরক্ষার সুবিধা ছিল। বর্তমানে বিদ্যুৎ মিটার চুরি রোধে ব্যবসায়ীরা নিজস্ব খরচে নিরাপত্তাকর্মী রেখেছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ফুরকান হোসেন ও মুরাদ হোসেন জানান, এই কেন্দ্র নির্মাণের মূল নকশাতেই ভুল রয়েছে। একেকটি ছোট হাউজে সর্বোচ্চ ৫-১০ হাজার পোনা ধরে। মাগুর মাছ রাখা গেলেও পাঙ্গাস, রুই, কাতল বা মৃগেলের মতো বড় জাতের পোনা রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা এখানে নেই। এলাকাটি দালালচক্রের হাতে জিম্মি। ফলে রাস্তার পাশে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে পুকুর লিজ নিয়ে ব্যবসা করতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন চৌধুরী সুমন জানান, ত্রুটিপূর্ণ স্থাপত্যশৈলীর কারণে ৫১টি হাউজ একযোগে চালুর মতো ওভারহেড পানির ট্যাংকির ধারণক্ষমতা নেই। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ন্যারো পাইপলাইনের কারণে পানি ইন-আউটে জটিলতা তৈরি হয়। আয়রনযুক্ত পানির বদলে ফিল্টারিং ও জরুরি পানি চলাচলের ব্যবস্থা না করলে এর সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু ফান্ডের অভাবে মৎস্য বিভাগ সংস্কার করতে পারছে না।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, যে লক্ষ্য নিয়ে বিক্রয়কেন্দ্রটি নির্মিত হয়েছিল তা বাস্তবায়ন হয়নি। বিগত সময়ের ৩০টি ভুয়া বরাদ্দ বাতিল করে বকেয়া সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন করে প্রকৃত মৎস্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে এটি বরাদ্দ দেয়ার আইনি ও দাফতরিক প্রক্রিয়া চলছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুষ্ঠু বরাদ্দের মাধ্যমে কেন্দ্রটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ চালু করা হবে।