দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার উদ্যোগ
মন্ত্রিসভায় উঠছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’
Printed Edition
বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে আফ্রিকার উগান্ডা ও ঘানার মতো দেশগুলোর থেকেও পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সেবা প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার লক্ষ্যে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ শিরোনামে একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করেছে সরকার। নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য খসড়া আইনটি আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নতুন এ আইনটি পাস হলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ)- এই চারটি সংস্থা একটি একক ছাতার নিচে চলে আসবে। এর ফলে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তঃসমন্বয় বাড়বে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেকটাই হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খসড়া আইনের মূল লক্ষ্য ও কাঠামো
খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, সমন্বিত এই নতুন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নে গতি আনা, বিনিয়োগসংক্রান্ত সরকারি সেবার মানোন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প ও বাণিজ্যিক সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হবে।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ (স্ট্যাটিউটরি) প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। প্রধান কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত হবে। শাখা কার্যালয় প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিদেশেও শাখা খোলার সুযোগ থাকবে।
বিডার তথ্য মতে, বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের তাদের প্রকল্পের ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় সব সেবা পাওয়া যাবে, যা পুরো বিনিয়োগপ্রক্রিয়াকে অনেক বেশি সমন্বিত ও সহজ করবে। তবে নতুন এই একীভূত কাঠামো চালু হলেও চার প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান সেবার পরিধি অপরিবর্তিত থাকবে; কেবল সেবা প্রদান ও সমন্বয় পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসবে।
পরিচালনা ও প্রশাসনিক রূপরেখা
খসড়া আইনে এই সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পর্ষদের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী অথবা তার মনোনীত মন্ত্রী পদমর্যাদার কোনো ব্যক্তি। পর্ষদের সদস্য হবেন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রী বা উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, একীভূত হতে যাওয়া চার প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং বেসরকারি খাতের তিনজন প্রতিনিধি।
প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালিত হবে একটি ‘নির্বাহী পরিষদের’ মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে থাকবেন একজন নির্বাহী চেয়ারম্যান। নবগঠিত এই কর্তৃপক্ষ যাকে ‘ইউনিডা’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে- বিনিয়োগ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বভিত্তিক (পিপিপি) প্রকল্পগুলোর সার্বিক তদারকি করবে।
একই সাথে বিনিয়োগ নীতি প্রণয়ন, প্রকল্প অনুমোদন, অবকাঠামোগত সহায়তার সমন্বয়, অনুমোদিত প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা নিরসনের দায়িত্বও ইউনিডার ওপর ন্যস্ত থাকবে।
ক্ষমতার পরিধি ও সেবার দ্রুততা
আইনটি কার্যকর হলে যেসব বেসরকারি শিল্পপ্রকল্প কোনো বিশেষায়িত কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত নয়, সেগুলোকে ইউনিডার নিবন্ধন বা অনুমোদন নিতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশে শাখা, লিয়াজোঁ বা প্রতিনিধি কার্যালয় খুলতে ইচ্ছুক বিদেশী কোম্পানিগুলোর জন্য এই কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক হবে।
প্রকল্প অনুমোদনের পর জমি বরাদ্দ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, শুল্ক ছাড় এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের মতো মৌলিক সেবাগুলো যাতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন হয়, সে-সংক্রান্ত বিশেষ ক্ষমতাও ইউনিডাকে দেয়া হবে।
খসড়া আইনে আরো বলা হয়েছে, সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক ঘোষণা করতে পারবে। প্রয়োজনে ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭’ অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ করা এবং অব্যবহৃত সরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক সম্পদ বিনিয়োগ প্রকল্পে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে হস্তান্তরের বিধানও রাখা হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বিনিয়োগের বর্তমান চিত্র
সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসঙ্ঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে মাত্র ১৮০ কোটি (১.৮ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে আফ্রিকার দেশ উগান্ডা ৩৪০ কোটি ডলার এবং ঘানা ও ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) প্রত্যেকে ১৯০ কোটি ডলার করে বিদেশী বিনিয়োগ টানতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আফ্রিকার এসব দেশ জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ পেয়ে লাভবান হলেও বাংলাদেশ তার প্রধান সম্ভাবনাময় ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে টানা হিমশিম খাচ্ছে।
ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও যা উদ্বেগজনক
বিনিয়োগের মোট পরিমাণের দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এফডিআই প্রবৃদ্ধির হারে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের ১২৩ কোটি ডলারের তুলনায় ২০২৫ সালে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ৪৫ শতাংশ।
তবে এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট স্থাবর মূলধন গঠনের মাত্র ১.৪ শতাংশ আসছে বিদেশি বিনিয়োগ থেকে; অর্থাৎ দেশের বিনিয়োগ অবকাঠামো এখনো প্রধানত অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপরই চরমভাবে নির্ভরশীল। অন্য দিকে একদম নতুন বা ‘স্ক্র্যাচ থেকে’ শুরু হওয়া গ্রিনফিল্ড প্রকল্পের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে গ্রিনফিল্ড প্রকল্পের মূল্য ছিল ১৭৩ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে তা ২২.৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৩ কোটি ডলারে।
নতুন প্রকল্পের এই ধারাবাহিক পতনকে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ ও সতর্ক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে ইতিবাচক বিষয় হলো, বাংলাদেশী কোম্পানিগুলোর বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালের এক কোটি ৫০ লাখ ডলার থেকে ৭২.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে তা দুই কোটি ৫০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট এফডিআই স্টকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯.৬ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৯.৯ শতাংশ বেশি।