গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের আগ্রাসনে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি বলে উঠে এসেছে গবেষণায়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ’-এ প্রকাশিত এক গবেষণার বরাতে আলজাজিরা জানায়, ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত গাজায় সহিংস মৃত্যু ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

‘গাজা মর্টালিটি সার্ভে (জিএমএস)’ শীর্ষক জনসংখ্যাভিত্তিক এই গবেষণায় বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আনুমানিক ৭৫ হাজার ২০০ জন সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। এটি যুদ্ধ-পূর্ব ২২ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৩.৪ শতাংশ এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একই সময়ের ৪৯ হাজার ৯০ জন মৃত্যুর হিসাবের তুলনায় প্রায় ৩৪.৭ শতাংশ বেশি। গবেষণায় দুই হাজার পরিবারের প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রধান গবেষক লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল স্প্যাগাট বলেন, অবকাঠামো ভেঙে পড়ায় সরকারি হিসাব স্বাভাবিকভাবেই কম প্রতিফলিত হয়েছে।

এ ছাড়া প্রথমবারের মতো ‘অসহিংস অতিরিক্ত মৃত্যু’র হিসাবও উঠে এসেছে- যুদ্ধ, অবরোধ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয় ও গাজার আল-শিফা হাসপাতালের গবেষকদের আরেক গবেষণায় বলা হয়, ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আহতের সংখ্যা এক লাখ ১৬ হাজার ছাড়িয়েছে, যাদের বড় অংশের জটিল অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। গবেষকদের মতে, এসব তথ্য আন্তর্জাতিক জবাবদিহি ও দ্রুত হামলা বন্ধের জরুরি আহ্বান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

গাজায় ধ্বংসস্তূপ সরাতে লাগতে পারে ৭ বছর : জাতিসঙ্ঘ : জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছে, বর্তমান গতিতে গাজায় ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে আরো অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে। এতে করে উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ এখনো চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। জেরুসালেম থেকে ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে ইউএনডিপি প্রধান আলেকজান্ডার ডি ক্রু জানান, গাজায় তিনি জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তার ভাষায়, ‘মানুষ ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই বসবাস করছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।’ তিনি জানান, ইউএনডিপি বর্তমানে তিনটি অগ্রাধিকার নিয়ে কাজ করছে- ধ্বংসস্তূপ অপসারণ, অস্থায়ী আবাসন এবং বেসরকারি খাত পুনরুজ্জীবন। এখন পর্যন্ত মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ ধ্বংসাবশেষ সরানো সম্ভব হয়েছে। অস্থায়ী আবাসনের ক্ষেত্রে ৫০০টি ইউনিট নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজন দুই থেকে তিন লাখ ঘর। ইউএনডিপি প্রধান গাজায় ত্রাণ ও নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে ইসরাইলি বাধা শিথিল করারও আহ্বান জানান।

পশ্চিমতীর ও গাজায় ‘জাতিগত নির্মূলের’ আশঙ্কা জাতিসঙ্ঘের : গাজা ও অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলের হামলা ও অবরোধ ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসঙ্ঘ। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক রিপোর্টে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতর জানায়, পরিস্থিতি ‘জাতিগত নির্মূলের’ আশঙ্কা তৈরি করছে। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের। খবরে বলা হয়, গাজায় লাগাতার হামলা, সম্পূর্ণ এলাকা ধ্বংস এবং মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার ফলে সেখানে স্থায়ী জনসংখ্যা পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। একই সাথে জোরপূর্বক স্থানান্তরের ঘটনাও উদ্বেগজনক। অধিকৃত পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমে ইসরাইলি বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচার গ্রেফতার এবং ঘরবাড়ি ভাঙার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণ ও দমন করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়।

রমজানেও গাজায় ইসরাইলের বিমান হামলা অব্যাহত : রমজান মাস শুরু হলেও গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরাদের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে একযোগে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ চালানো হয়। শুজাইয়া এলাকায় রাতের বেলায় আলোকবোমা নিক্ষেপ করে ইসরাইলি বাহিনী। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুস ও রাফাহ শহরেও একাধিক বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। খান ইউনুসে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি যুবক নিহত হয়েছেন। স্থানীয় হাসপাতালের চিকিৎসকরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। রাফাহর পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায়ও গোলাবর্ষণ করা হয়। অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতির পরও এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকায় গাজাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, রমজানের পবিত্রতা উপেক্ষা করেই সামরিক অভিযান চালানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলা শুধু যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গই নয়, বরং মানবিক পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

দারিদ্র্য ও শোকের ছায়ায় গাজায় রমজান

ইসরাইলের দীর্ঘ হামলা ও ত্রাণে বাধার কারণে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রমজান শুরু করেছে গাজাবাসী। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা আগ্রাসনে উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভবন ধ্বংস হয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। বর্তমানে গাজার অধিকাংশ মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছে, যেখানে কাজের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। যুদ্ধবিরতিতে প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে তা সীমিত রাখা হয়েছে। খান ইউনিসে একটি তাঁবুতে বসবাসরত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মা হালেহ মোহাম্মদ আওয়াদ জানান, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, আগে রমজান ছিল আনন্দের, এখন তা বেদনা ও অনিশ্চয়তায় ভরা। আরেক গাজাবাসী হিদায়া হামাইদে বলেন, খাদ্যের অভাবে ইফতার ও সাহরির ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও গাজাবাসী রমজান পালন করছে ধৈর্য ও বিশ্বাসের সাথে, শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনের আশায়।

গাজায় ৫ হাজার সেনার সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা : গাজায় প্রায় পাঁচ হাজার সেনা ধারণক্ষম একটি বড় সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সংশ্লিষ্ট একটি নতুন কাঠামো, এমন তথ্য উঠে এসেছে ফাঁস হওয়া এক নথিতে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পর্যালোচিত নথি অনুযায়ী, দক্ষিণ গাজার প্রায় ৩৫০ একর এলাকায় এই ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ঘাঁটিটি ভবিষ্যৎ ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’-এর (আইএসএফ) জন্য সামরিক অপারেশন বেস হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এই বাহিনী পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নতুন সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’-এর নেতৃত্বে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তার জামাতা জ্যারেড কুশনার। পরিকল্পনায় সাঁজোয়া নজরদারি টাওয়ার, বাঙ্কার, অস্ত্রগুদাম ও কাঁটাতারের বেষ্টনীর উল্লেখ রয়েছে। নথিতে আরো বলা হয়েছে, নির্মাণের আগে ভূগর্ভে সুড়ঙ্গ বা ফাঁকা জায়গা আছে কি না তা পরীক্ষা করা হবে এবং মানবদেহাবশেষ পাওয়া গেলে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে। গাজার সিভিল ডিফেন্সের হিসাবে, ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ১০ হাজার মানুষের মরদেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে। এই ঘাঁটি নির্মাণকে ফিলিস্তিনি ভূমিতে নতুন করে দখল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তবু পরিকল্পনাটি গাজায় ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরও গাজায় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে হামাস : যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধবিরতি গত অক্টোবর গাজা যুদ্ধ থামালেও হামাসের লড়াই থামেনি। ইসরাইলের বিরুদ্ধে টিকে থাকার যুদ্ধ থেকে এবার তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে। যুদ্ধে হামাসের শৃঙ্খলাবদ্ধ সামরিক ইউনিটগুলো ভেঙে গেরিলা বাহিনীতে পরিণত হয়। অধিকাংশ নেতা নিহত হন। গাজার ভবন ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়, জনগণ বাস্তুচ্যুত হয়, অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সংঘাতে ইসরাইলি হামলায় ৭২ হাজারের বেশি গাজাবাসী নিহত হয়েছেন।

চার মাস পর গাজার বাসিন্দারা বলছেন, নিরাপত্তা, কর রাজস্ব ও সরকারি সেবায় আবারো নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে হামাস। এতে সংগঠনটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে অস্ত্র ও কর্তৃত্ব ছাড়ার শর্ত সামনে থাকায়।