ইউরোপের ফুটবলে ছোট দলগুলোর উত্থান
Printed Edition
মীর মোকাম্মেল আহছান
ইউরোপীয় কাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। এখানে দীর্ঘদিন ধরে শিরোপার লড়াই মানেই ছিল বড় বাজেটের ঐতিহ্যবাহী তারকাখচিত পরাশক্তি কাবগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য। বিশ্ব ফুটবলে স্থানীয় লিগগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তায় শীর্ষে রয়েছে ইউরোপের ‘বিগ ফাইভ’ হিসেবে পরিচিত- ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ (ইংল্যান্ড), লা লিগা (স্পেন), বুন্দেসলিগা (জার্মানি), সিরি আ (ইতালি) ও লিগ ১ (ফ্রান্স)। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিত্রটা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। এই মঞ্চেই জেগে উঠেছে এক ভিন্ন সুর। তুলনামূলক কম পরিচিত লিগ, ছোট বাজেটের দল, সীমিত সম্পদের দলগুলোর সাহসী পারফরম্যান্স বদলে দিচ্ছে প্রতিযোগিতার গল্প। এর মধ্যে রয়েছে পর্তুগাল, তুরস্ক, বেলজিয়াম, গ্রিস, আজারবাইজান কিংবা নরওয়ের কাবগুলো। এসব দেশের লিগের কাবগুলো এখন আর ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে কেবল অংশগ্রহণ করতেই আসে না, তারা আসে লড়তে, চমক দিতে ও ইতিহাস লিখতে।
ইউরোপীয় ফুটবলে এক অনুপ্রেরণার নাম নরওয়ের উত্তরীয় জাগরণ বোদো/গ্লিমিটের। নর্ডল্যান্ড কাউন্টির বোদো পৌরসভার বোদো শহরের একটি নরওয়েজিয়ান পেশাদার ফুটবল কাব। বর্তমানে নরওয়েজিয়ান শীর্ষ বিভাগ এলিটসেরিয়ানে খেলা কাবটি ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২০, ২০২১, ২০২৩ ও ২০২৪ এলিটসেরিয়ান মৌসুম জিতে নরওয়েতে চারবার চ্যাম্পিয়ন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এবারই প্রথম খেলতে এসেই দেখাচ্ছে চমকের পর চমক। আসরের গ্রুপ পর্বের শেষ দুই ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটিকে ৩-১ ব্যবধানে হারানোর পর ২-১ গোলে অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদকে হারিয়ে অব্যাহত রাখে চমক। শেষ ষোলোর প্লে অফের প্রথম লেগে ধরে রেখেছে সেই ধারা। ইতালির সিরি ‘আ’ টেবিলের শীর্ষে থাকা ইন্টার মিলানকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে রীতিমতো ফুটবল বিশ্বে ঝড় বইয়ে দিয়েছে বোদো/গ্লিমিট।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের বাইরে থাকা দলগুলোর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এক আসরে টানা তিনটি ম্যাচ জয়ের কীর্তি খুবই বিরল। সেই বিরল কাতারেই জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ের কাবটি। শীর্ষ পাঁচ লিগের দলগুলোর বিপে টানা তিন ম্যাচ জেতা ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ দল তারা। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিল পানাথিনাইকোস (২০০১-০২), বেনফিকা (২০০৫-০৬) ও জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গ (২০১৫-১৬)। চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অসাধারণ এই অর্জন বোদো/গ্লিমিটের।
১ জুলাই ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পর্তুগালের ‘বিগ থ্রি’ কাবগুলোর মধ্যে একটি স্পোর্টিং সিপি। যারা কখনো প্রাইমিরা লিগা থেকে অবনমিত হয়নি। দলটির হোম গ্রাউন্ড এস্তাদিও হোসে আলভালাদে যা ২০০৩ সালে নির্মিত হয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী কাবটি এর যুব একাডেমির জন্য পরিচিত। লুইস ফিগো ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো ফুটবলার তৈরিতে সহায়তা এই কাব সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে আবার ইউরোপে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে। নতুন ফরম্যাশনের ইউরোপ সেরার এই প্রতিযোগিতার গ্রুপ পর্বে জুভেন্টাসের মতো দলের বিপক্ষে চোখে চোখ রেখে লড়াই করে ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পিএসজির মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়েছে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছে স্পোর্টিং। ইতোমধ্যে চলমান আসরে নকআউটে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে পর্তুগালের দলটি।
বহু বছর ধরেই ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় পরিচিত নাম গ্রিসের কাব অলিম্পিয়াকোস এফসি। বড় কাবগুলোকে ঘরের মাঠে চাপে ফেলে দেয়ার ইতিহাস রয়েছে ১৯২৫ সালে ফুটবলে পথচলা শুরু করা এই দলটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিক ফুটবলের আর্থিক সঙ্কটে সময় অতিবাহিত হলেও ইউরোপে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রেখেছে এই কাব। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সফলতম দল রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে সমান তালে লড়ে হারলেও জার্মান কাব বায়ার লেভারকুজেন, অ্যাজাক্সের মতো কাবকে হারিয়ে নকআউটের প্লে অফে জায়গা করে নিয়েছে অলিম্পিয়াকোস।
বেলজিয়ান বিস্ময় কাব ব্রুজ। সাম্প্রতিক মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে একাধিকবার চমক দেখিয়েছে। তুলনামূলক ছোট লিগ থেকে উঠে এসে তারা গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী প্রতিপদের সাথে লড়াই করে সমানে সমানে। বার্সেলোনার সাথে ৩-৩ গোলে ড্র। অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদকেও একই ব্যবধানে ঠেকিয়ে দেয়া আর অলিম্পিক মার্সেইকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোর প্লে অফে জায়গা করে নিয়েছে ব্রুজ। তাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দ্রুতগতির উইঙ্গার ও আক্রমণাত্মক মানসিকতা। তারা রণে সংগঠিত থেকে সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে আঘাত হানে। ইউরোপীয় মঞ্চে তাদের আত্মবিশ্বাস প্রমাণ করে- সঠিক কাঠামো থাকলে ছোট লিগের কাবও বড় স্বপ্ন দেখতে পারে।
তুরস্কের উন্মাদনা ও ঐতিহ্যের কাব গ্যালাতাসারাইয়ের পথচলা শুরু ১৯০৫ সালে। ইউরোপে পরিচিত নাম হলেও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত সাফল্য ধরে রাখা কঠিন এই কাবের। তবু ইস্তাম্বুলের ঘরের মাঠে তাদের সমর্থকদের উন্মাদনা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বিশেষ মাত্রা যোগ করে। বড় তারকা ও তরুণ প্রতিভার মিশেলে গঠিত দলটি নকআউটের প্লে অফে ইতালির কাব জুভেন্টাসকে ৫-২ গোলে উড়িয়ে বড় চমক সৃষ্টি করে দলটি। কখনো অভিজ্ঞ ফুটবলারদের নিয়ে, কখনো একাডেমির ওপর ভর করে নকআউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে থাকে দলটি।
আজারবাইজানের কাব কারাবাগ এফকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অংশ নিয়ে এক সময় ইতিহাস গড়েছিল। ১৯৮৭ সালে গঠিত কারাবাগ ১৯৯২ সালে আজারবাইজান প্রিমিয়ার লিগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিল। এক মৌসুম পরই তারা লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে। তুলনামূলক কম পরিচিত লিগ থেকে উঠে এসে তারা প্রমাণ করেছে- ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা সাফল্যের পথে বাধা নয়। নতুন ফরম্যাটের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে বেনফিকাকে হারিয়ে চমক জাগিয়েছিল কারাবাগ। এরপর চেলসির সাথে ড্র ও আইনট্রাক্ট ফ্রাঙ্কফুর্টকে হারিয়ে নকআউটে প্লে অফে জায়গা করে নেয় তারা। অবশ্য প্লে অফের প্রথম লেগে ইংলিশ কাব নিউক্যাসলের বিপক্ষে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে তারা।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এখন আর রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান, লিভারপুল, চেলসি বা ম্যানচেস্টার সিটির মতো পরাশক্তিদের গল্প নয়; স্পোর্টিং সিপির তারুণ্য, অলিম্পিয়াকোসের আবেগ, কাব ব্রুজের কৌশল, গ্যালাতাসারাইয়ের উন্মাদনা, মোনাকোর বুদ্ধিদীপ্ত বিনিয়োগ, কারাবাগের সংগ্রাম ও বোদো/গ্লিমিটের নির্ভীকতার গল্পও। ইউরোপের রাতগুলো এখন আরো অনিশ্চিত, আরো উত্তেজনাপূর্ণ। আর সেই অনিশ্চয়তাই ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।