সরকারের প্রথম দিনই বড় হোঁচট খেলো পুঁজিবাজার

এশিয়াটিক ল্যাবের শেয়ারে লক-ইন বাড়ল

Printed Edition
artho-1
সরকারের প্রথম দিনই বড় হোঁচট খেলো পুঁজিবাজার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

নতুন সরকারের প্রথম কার্যদিবসেই বড় ধরনের হোঁচট খেল পুঁজিবাজার। গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারই বড় ধরনের পতনের র্শিকার হয়েছে। দর হারিয়েছে লেনদেন হওয়া কোম্পানির ৭৩ শতাংশ। সাধারণ বিবেচনায় যেখানে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনিয়োগকারীরা বড় প্রত্যাশা নিয়ে ভালো বাজার আচরণ দেখতে চেয়েছিলেন গতকাল তার উল্টোটাই প্রত্যক্ষ করলেন তারা। নির্বাচনে বিএনপির বড় বিজয়ে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা যে আস্থার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন সরকার গঠনের পর হঠাৎ যেন তা মিইয়ে গেল।

গতকাল শুরু থেকেই বারবার বিক্রয়চাপের মুখে পড়া দুই পুঁজিবাজারে দিনশেষে সব সূচকের অবনতি ঘটে। এ নিয়ে গত তিন দিনই টানা অবনতি ঘটল পুঁজিবাজার সূচকের। তবে আগের দু’দিন মুনাফা তুলে নেয়ার প্রক্রিয়ায় সূচকের পতন সহনীয় থাকলেও গতকাল পতনের মাত্রা ছিল চোখে পড়ার মতো যা বিনিয়োগকারীদের মুখের হাসি মুছে দিয়েছে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণকে সংশোধন হিসেবেই দেখছেন। তবে বিনিয়োগকারিদের একটি অংশ মনে করছেন, সরকার গঠন ও এর আগে-পরের কিছু বিষয়ে সৃষ্ট অসামঞ্জস্যতার কারণে এটি ঘটতে পারে। কারণ পুঁজিবাজার বরাবরই একটি সংবেদনশীল জায়গা।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি গতকাল ৫১ দশমিক ৪৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়েছে। ৫ হাজার ৫৭০ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৫১৯ দশমিক ১৩ পয়েন্টে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এক দিনে ডিএসইর প্রধান সূচকটির ২০০ পয়েন্ট উন্নতি ঘটলেও গত তিন দিনে তার ৮০ পয়েন্টের বেশি হারাল ডিএসই। গতকাল বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১৬ দশমিক ১৯ ও ১১ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ৮৫ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের পতন ঘটে যথাক্রমে ৭৫ দশমিক ৩৯ ও ৬২ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট।

গতকাল ঢাকায় লেনদেনের শুরুতেই সূচকের উন্নতি ঘটে ২৭ পয়েন্টের বেশি; কিন্তু মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় শুরু হয় বিক্রয়চাপ। বেলা সোয়া ১১টার দিকে ডিএসই সূচক নেমে আসে ৫ হাজার ৫৩৮ পয়েন্টে। এ সময় ডিএসই সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় ৩২ পয়েন্টের বেশি। পরবর্তী সময়ে সাময়িকভাবে বাজার কিছুটা ঊর্র্ধ্বমুখী হলেও দিনের শেষভাগে এসে বিক্রয়চাপ আরো বৃদ্ধি পায়। আর এভাবে দিনশেষে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৫১৯ দশমিক ১৩ পয়েন্টে।

গতকাল ডিএসইর লেনদেনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এ দিন মোট ৯৩৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ২৮৭ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ২২২ কোটি টাকা।

দিনের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুসা নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার মাত্র দায়িত্ব নিয়েছে। তারা এখন সার্বিক অর্থনীতির বিষয়ে নীতিনির্ধারণ করবেন। পুঁজিবাজার নিয়ে তাদের কী পরিকল্পনা তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তা ছাড়া সম্প্রতি বাজারে সূচকের যে উন্নতি ঘটেছে তাতে মূল্যস্তরে যথেষ্ট ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। তাই বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিয়ে বাজার পর্যবেক্ষণে থাকাই যৌক্তিক মনে করেছেন। এ কারণেই বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে বিনিয়োগকারীদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, নতুন সরকার নিয়ে সবার মধ্যেই একটা উচ্ছ্বাস ছিল; কিন্তু সরকার গঠন ও এর আগে-পরের কিছু বিষয় সবাইকে হতাশ করেছে। বিশেষ করে দেশের সার্বিক সংস্কার নিয়ে নবগঠিত সরকারের মনোভাব সামনের দিনগুলোতে দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের জন্য নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

এ দিকে আইপিও ফান্ডের ব্যবহার সম্পন্ন না করেই ৩২ তলাবিশিষ্ট বিল্ডিং নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সম্পর্কিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করায় এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের শেয়ারে লক-ইন সময় বাড়িয়েছে বিএসইসি। তালিকাভুক্তির আগে কোম্পানিটির প্রসপেক্টাসে উল্লিখিত খাতে ব্যয় সম্পন্ন না হওয়া, প্রকল্প মূল্যায়ন সম্ভাব্যতা যাচাই ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ব্যতিরেকে পরিকল্পনা প্রকাশ এবং সঙ্ঘস্মারকের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন বিষয় উদঘাটিত হওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিদর্শন প্রতিবেদনের সুপারিশ, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় কমিশন উদ্যোক্তাবৃন্দ, পরিচালকবৃন্দ ও প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারবৃন্দ কর্তৃক ধারণকৃত শেয়ারের ওপর লক-ইন সময় বৃদ্ধিকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

মঙ্গলবার বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে ৯৯৯তম কমিশন সভায় নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়েছে। গতকাল বিএসইসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ৩১ আগস্ট ২০২২ তারিখে অনুষ্ঠিত কমিশনের ৮৩৭তম কমিশন সভায় এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডকে প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ৯৫.০০ কোটি টাকা উত্তোলন করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। ওই ৯৫.০০ কোটি টাকা পুঁজি উত্তোলন করে কোম্পানিটি ব্যবসায় সম্প্রসারণ (যন্ত্রপাতি ক্রয় ও ইনস্টলেশন), ফ্যাক্টরি ভবন নির্মাণ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং ইস্যু ব্যবস্থাপনা খরচ খাতে ব্যয় করবে মর্মে কোম্পানিটির প্রসপেক্টাসে উল্লেখ থাকলেও কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের মাধ্যমে উত্তোলনকৃত অর্থ বা আইপিও ফান্ডের ব্যবহার সম্পন্ন করতে পারেনি।

আইপিও ফান্ডের ব্যবহার সম্পন্ন না করেই কোনো ধরনের প্রকল্প মূল্যায়ন, সম্ভাব্যতা যাচাই ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন (রাজউক কর্তৃক বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ইত্যাদি) ব্যতিরেকে এবং পূর্ব-অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ছাড়াই কোম্পানিটি ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ৩২ তলাবিশিষ্ট বিল্ডিং নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সম্পর্কিত এ মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, ৩২ তলাবিশিষ্ট বিল্ডিং নির্মাণ তথা রিয়েল এস্টেট/হোটেল ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও কোম্পানিটির সঙ্ঘস্মারকের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃক পরিচালিত পরিদর্শন প্রতিবেদনে উপরোল্লিখিত অসঙ্গতি উদঘাটিত হয়।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিদর্শন প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের উদ্যোক্তাবৃন্দ, পরিচালকবৃন্দ ও প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারবৃন্দ (প্রসপেক্টাসে উল্লেখিত ১৮৩ জন/প্রতিষ্ঠান) কর্তৃক ধারণকৃত শেয়ারগুলের ওপর বিদ্যমান লক-ইন অবমুক্তির তারিখ থেকে পরবর্তী ৩ (তিন) বছর বা প্রস্তাবিত ৩২ তলাবিশিষ্ট বিল্ডিংয়ের নির্মাণকাজের সমাপ্তি ও বাণিজ্যিক ব্যবহার চালুকরণের (রাজউকের অকুপেন্সি সার্টিফিকেটসহ) মধ্যে যেটি পরে সম্পন্ন হবে ততদিন পর্যন্ত লক-ইন বৃদ্ধিকরণের সিদ্ধান্ত কমিশন কর্তৃক গৃহীত হয়।