ঠুনকো ঘটনায় চিকিৎসকের ওপর হামলা কর্মস্থলে নিরাপত্তা নেই
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঠুকনো ঘটনায় চিকিৎসকের ওপর হামলা চলছেই। চিকিৎসকদের সুরক্ষায় কর্মস্থলে নিরাপত্তাও নেই আবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও নেই। চিকিৎসক পেটালে বাংলাদেশের আইনে বিশেষ কোনো শাস্তির বিধান নেই। যা আছে, তাও আইনের মারপ্যাঁচে এবং দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে আক্রমণকারীরা জামিন পেয়ে যায়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ১৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে এক ডজনের বেশি চিকিৎসক মারধরের ঘটনা ঘটেছে। তবে চিকিৎসককে মারধরের বড় ঘটনা না ঘটলে সংবাদপত্রে সব সময় খবরও প্রকাশিত হয় না। অনেকে সামাজিক অবস্থানের কারণে মারধরের ঘটনা চেপেও যান, কাউকে কিছু বলেন না। ফলে সেসব প্রকাশিত হয় না।
হামলার পর চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে সরকারের সংশ্লিষ্টরা দেখতেও যান। একই সাথে চিকিৎসক সংগঠনের নেতারাও দেখতে যান। প্রতিবারই চিকিৎসককে হামলা করা হলে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টরা সহানুভূতি দেখান কিন্তু হামলাকারীদের কি শাস্তি হয়, সেগুলো জানা যায় না। চিকিৎসকরা বলছেন, এসব কারণেই কিছু দুর্বৃত্ত চিকিৎসকদের ওপর হামলার সাহস পায়।
সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট ঢাকা মেডিক্যালি কলেজ হাসপাতালের নাক-কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের অধ্যাপক ডা: আসাদুর রহমান রাজধানীর শান্তিনগর পপুলার কনসালটেশন সেন্টারের সামনে একদল দুর্বৃত্তের হামলার শিকার হন। তাকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াৎ হোসেন দেখতে যান। একই সাথে চিকিৎসক সংগঠনের নেতারাও দেখতে যান।
রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে শয্যা না পাওয়া এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনরা দায়িত্বরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালান। গত ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখ রাত দেড়টার দিকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে এই অপ্রীতিকর ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং ডা: মোশাররফ হোসেন ও এক ওয়ার্ড বয়কে টেনে-হিচড়ে মাটিতে ফেলে আহত করে। এ বছরের ৮ জুলাই সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরে ৯ জুলাই একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় একাধিক ইন্টার্ন চিকিৎসক আহত হন। ৫ জুলাই নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক স্বাস্থ্যকর্মীকে মারধরের অভিযোগে চিকিৎসকেরা কর্মবিরতিতে যান। জরুরি বিভাগ চালু রেখে বহির্বিভাগসহ অন্যান্য সেবা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়।
২৩ জুন রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালে হাসপাতালে একদল রাজনৈতিক কর্মী চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালায়। সেই হামলায় সহকারী রেজিস্ট্রার, ট্রেইনি ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হন। প্রতিবাদে ইন্টার্নরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করেন।
১৩ জুন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের বিরুদ্ধে তিন চিকিৎসককে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে চিকিৎসকরা জরুরি সেবা বন্ধ করে দেন এবং আন্দোলন করেন। ১৫ মে শরীয়তপুর জেলা হাসপাতালে ডা: নাসির ইসলামকে হামলা করে গুরুতর আহত করে। একটি মুমূর্ষু রোগীকে অন্য হাসপাতালে নেয়ার জন্য চিকিৎসকরা অনুরোধ করলেও স্বজনরা অন্য কোথাও নেয়নি। পরে রোগী মারা গেলে ডা: নাসিরকে গুরুতর আহত করে। সেই ঘটনায় অবশ্য পুলিশ হামলাকারীদের ৬ জনকে গ্রেফতার করে। ২০ এপ্রিল রাজধানীর মহাখালী জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: আহমেদ হোসেনকে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা। তাকে পরে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হয়। চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের সাথে বিরোধের জেরে এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকের ওপর হামলা হয়। পরে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা কর্মবিরতিতে যান।
বিএমডিসি বলছে, বাংলাদেশে চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় আলাদা করে কোনো বিশেষ শাস্তির ধারা নেই। ঘটনার ধরন ও আঘাতের মাত্রা অনুযায়ী দণ্ডবিধি ১৮৬০’র বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ করা হয়। সাধারণ মারধর/আঘাতে দণ্ডবিধি ৩২৩ ধারায় ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে আঘাত করলে এই ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয়ই দণ্ড দেয়া হয়। অপরদিকে গুরুতর জখমে দণ্ডবিধি ৩২৫ ধারা প্রয়োগ করা হয় এবং সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানা করা হয়। অস্ত্র বা বিপজ্জনক উপায়ে গুরুতর জখম করা হলে দণ্ডবিধি ৩২৬ ধারা প্রয়োগ করা হয়। এই বিধিতে বলা হয়েছে, ছুরি, ধারালো অস্ত্র বা অন্য বিপজ্জনক অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখম করলে শাস্তি যাবজ্জীবন অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানাও করা হয়।