সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে বিরোধীদলীয় নেতা
সংসদে সংবিধান সংস্কার না হলে জনগণের কাছেই যাবো
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, সংসদে সংবিধান সংস্কার না হলে জনগণের কাছেই যাবেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে যে সংস্কার সনদ (চার্টার) তৈরি হয়েছিল, তার ভিত্তিতে জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কারে সংসদে সুযোগ না পেলে জনগণের কাছেই যাবেন এবং জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলেও জানান তিনি। ৮৫ হাজার টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর প্রস্তাবে সিন্ডিকেট খেপে গিয়ে হুমকি দিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাস পরবর্তী সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে জামায়াত আমির এ কথা বলেন। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি ও অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মো: সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ও ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি এবং ড. নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান ও হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এমপি সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা প্রমুখ।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার পরিষদ
বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ পরিচালনার জন্য একটি ন্যাশনাল কনসেন্সাস কমিশন গঠন করা হয়। সেখানে মাসের পর মাস ৩১টি কার্যকর রাজনৈতিক সংগঠন ডায়ালগ করার পর একটি চার্টার তৈরি করে, যেখানে প্রায় সব দল স্বাক্ষর করেছিল।
তিনি বলেন, আমাদের অঙ্গীকার ছিল এই সংসদ ও নির্বাচনকে অর্থবহ করা। সেই অনুযায়ী একই দিনে প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে এবং পরে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে একই সাথে শপথ নেয়ার কথা ছিল। আমরা বিরোধী দল দু’টি শপথই নিয়েছি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সরকারি দল রাতারাতি নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিল, কিন্তু সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করল। তারা দোহাই দিলো যে এটি সংবিধানে নেই। অথচ সংবিধানে এই নির্বাচন বা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের সরকারের কথাও উল্লেখ নেই। জাতির প্রয়োজনেই এগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। জনগণের এই রায়কে অগ্রাহ্য করা মানে মানুষকে অপমান করা। আমরা সংসদে এই কথাটি তুলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সংসদকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে আমাদের দাবি তোলার সুযোগটি বার বার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যেহেতু সংসদ আমাদেরকে সুযোগ দিলো না, তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা জনগণের পার্লামেন্টে (রাজপথে) চলে যাব। সংসদে কথা বলতে স্পিকারের পারমিশন লাগে, কিন্তু জনগণের পার্লামেন্টে কোনো পারমিশন লাগবে না। আমরা জনগণের ওয়াদার সাথেই থাকব।
তিনি আরো বলেন, সরকারি দল মেজরিটির জোরে সংবিধান সংশোধন কমিশন গঠনের প্রস্তাব এনেছে। আমরা বলেছি, জনগণ সংবিধান সংশোধনের জন্য নয়, সংস্কারের জন্য রায় দিয়েছে। হাইকোর্ট সংশোধনী বাতিল করতে পারে কিন্তু সংস্কারে হাত দিতে পারে না। এর আগে হাইকোর্টের বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণ ও কেয়ারটেকার ব্যবস্থা যেভাবে কোর্টের রায়ে বাতিল হয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসবে না।
ওয়ান ইলেভেনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার নির্মমতার মাধ্যমে দেশে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করা হয়, যেখানে দুই দিনে ৩৪ জন মানুষ নিহত হন। এর ফলে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলেও আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের অসহযোগিতা এবং বিশৃঙ্খলার কারণে তারা নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে সেনাসমর্থিত মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকার গঠিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত, তারা দু’জনই এখন দেশের বাইরে আছেন, কিন্তু দেশ দেশের জায়গায় রয়ে গেছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ মতায় এসে আইনি মারপ্যাঁচে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধান থেকে মুছে ফেলে। সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে এটি আবার ফিরে এসেছে, তবে এর পূর্ণাঙ্গ রূপ কী হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রবাসীদের প্রসঙ্গে
প্রবাসীদের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ৮৫ হাজার টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে হবে এমন দাবি তুলেছিলাম সংসদে। এই কারণে অনেক সিন্ডিকেট আমার বিরুদ্ধে খেপে গিয়ে হুমকি দিচ্ছে। জনগণের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে সিন্ডিকেটের কোনো হুমকির তোয়াক্কা করব না, ইনশা আল্লাহ।
প্রবাসীদের পক্ষে সব সময় জোরালো বক্তব্য রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা এই দাবি ইনশা আল্লাহ জোরালোভাবে উত্থাপন করব সংসদে। প্রবাসীদের ভোগান্তি নিয়ে আমরা কথা বলেছি, আপনারা দেখেছেন। আজকে খবর পেলাম যে একদল আমার বিরুদ্ধে খেপে গেছে। আমি কেন বললাম মালয়েশিয়ায় ৮৫ হাজার টাকায় লোক পাঠাতে হবে। দালালদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আমি কি দালালের কোনো তালিকা দিয়েছি?
তিনি আরো বলেন, এই সিন্ডিকেট শুধু মালয়েশিয়ায় নয়। সারা বিশ্বেই আমাদের এই গরিব লোকগুলোকে নিঃস্ব করে দেয়া হয়। এরপরে তারা প্রতারিত হয়। সেখানে গিয়ে আবার দেখা যায় যে তার ওই ভ্যালিডিটিটাও নাই। জেলে থাকে। তা আমরা কি এগুলো নীরবে হজম করব? দেখতে থাকব? না। এগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে।
বাজেট প্রস্তাবনা ও জামায়াতের ‘ছায়া বাজেট’
বিরোধীদলীয় নেতা বাজেট প্রসঙ্গে বলেন, বাজেট পেশ করার আগেই আমরা একটি ছায়া বাজেট পেশ করেছিলাম। এবারের মূল বাজেটটি আমাদের ছায়া বাজেটের কাছাকাছি হয়েছে।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও বড়, ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রাও বড়। অতীতের ধারাবাহিকতায় এই বাজেটেও ঘাটতি আছে এবং ঋণ নিতে হবে। ঋণ নেয়ার উৎস মূলত তিনটি- অভ্যন্তরীণ খাত, বৈদেশিক ঋণ এবং বৈদেশিক অনুদান। এর বাইরে থেকে আর টাকা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরো বলেন, একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ৫৫ বছরেও আমরা আমাদের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে পারিনি। এর কারণ এটি নয় যে আমাদের সম্পদের অভাব রয়েছে; এর মূল কারণ হচ্ছে আমাদের ভিশন এবং সততার অভাব। একটি জাতি কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব তাদেরই, যাদেরকে জনগণ দেশ পরিচালনার ম্যান্ডেট দেয়।
বাজেট প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বিলুপ্ত করায় আমরা ধন্যবাদ জানাই। গরিব মানুষ ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে উৎসে কর বা অগ্রিম কর প্রত্যাহারের যে দাবি আমরা জানিয়েছিলাম, অর্থমন্ত্রী তা গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া সাইকেলের ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করেছি, কারণ এটি স্বল্প আয়ের মানুষের বাহন এবং পরিবেশবান্ধব। অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে এসআরওর মাধ্যমে এটি সমন্বয় করা হবে।
অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার প্রস্তাব
তিনি অর্থবছর পরিবর্তনের বিষয়ে বলেন, আমাদের দেশে জুলাই-জুন অর্থবছর হওয়ায় উন্নয়নের একটি ‘দানব’ তৈরি হয়েছে। ৯ মাস হাত-পা গুটিয়ে ঘুমিয়ে শেষ ৩ মাসে তাড়াহুড়ো করে কাজ করা হয়। ফলে ৯ মাসে ৪২% কাজ হলে শেষ তিন মাসে ৫০% কাজ দেখিয়ে জনগণের টাকা পানিতে ভাসিয়ে অপচয় করা হয়। আমরা প্রস্তাব করেছি অর্থবছর যেন জানুয়ারি ১ থেকে ডিসেম্বর ৩১ পর্যন্ত করা হয়, যাতে শুষ্ক মৌসুমে কাজগুলো সঠিকভাবে শেষ করা যায়।
শুল্কমুক্ত গাড়ি বর্জন
তিনি গুল্কমুক্ত গাড়ির বিষয়ে বলেন, আমরা নির্বাচনের সময় ওয়াদা করেছিলাম যে আমাদের কোনো সদস্য এমপি বা মন্ত্রী হলে বিনা ট্যাক্সের গাড়ি কিনবেন না বা সরকারি অতিরিক্ত কোনো সুযোগ-সুবিধা নেবেন না। আমরা সেই ওয়াদা রক্ষা করে চলার চেষ্টা করছি। কিন্তু এমপিদের জন্য যে ফ্যাট দেয়া হয়, তা কেবল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য। যতদিন সংসদ কার্যকর থাকবে, ততদিনই শুধু এটি ব্যবহার করা যাবে। সংসদ বিলুপ্ত হলে এক সেকেন্ডও সেখানে থাকার নৈতিক অধিকার নেই। এটা নিয়ে জলঘোলা করার কিছু নেই।
বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের সমতা এবং দুর্নীতি- এই দুই জায়গায় যদি বড় সংস্কার আনা না যায়, তবে বাজেট যতই বড় হোক, তার সুফল পাওয়া যাবে না। গত সাড়ে ১৫ বছরে যে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, দুর্নীতির সংস্কার না হলে এই বাজেট থেকেও টাকা পাচার হয়ে যাবে।
জুলাই বিপ্লব
জুলাই বিপ্লব প্রসঙ্গে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদ ও সরকার সবকিছুই জুলাই বিপ্লবের অবদান। কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় ‘জুলাই জাদুঘর’ ও ‘জুলাই ফাউন্ডেশন’ নিয়ে কোনো উল্লেখ নেই। জুলাই না থাকলে আমরা আজ কোথায় থাকতাম? আমরা সংসদে এই দাবি জোরালোভাবে তুলব।