প্রধানমন্ত্রীকে ট্রাম্পের অভিনন্দন বার্তা

বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়ন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চিঠিতে তিনি দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে এ চিঠি পাঠানো হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশ করে।

চিঠিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের বিজয়কে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প তার সফল মেয়াদকাল কামনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অংশীদারত্ব পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং একটি মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাম্প লেখেন, ‘আমাদের পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের গতি আরো জোরদার করতে আপনার সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি। এই চুক্তির ফলে আমাদের কৃষক ও শ্রমিকরা সরাসরি উপকৃত হবেন।’ তিনি আরো বলেন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার হলে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়বে এবং মার্কিন প্রযুক্তির আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। ‘প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে আপনার সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এমন প্রত্যাশা করছি,’ যোগ করেন তিনি। চিঠিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, দুই দেশ একসাথে কাজ করলে অর্থনীতি ও নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই লাভবান হবে।

বাণিজ্যচুক্তির কাঠামো ও বাধ্যবাধকতা : সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ শীর্ষক বাণিজ্যচুক্তি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এতে বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক সংস্কার ও নীতিগত পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শুল্ক, শ্রম আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা, কৃষি আমদানি, বিনিয়োগ কাঠামো এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা উল্লেখ আছে।

চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হলেও, অন্য শুল্ক কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ সীমিত সুবিধার বিপরীতে বড় ধরনের নীতিগত ছাড় দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

যেসব পণ্য ও খাতে কেনাকাটার প্রতিশ্রুতি : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে মার্কিন উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশ কেনা বৃদ্ধি; প্রাথমিকভাবে ইড়বরহম-এর ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার আগ্রহ; ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি, বিশেষত এলএনজি আমদানি; গম, সয়াবিন, তুলাসহ বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানি ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বৃদ্ধি।

নীতিগত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে- আমদানি শুল্ক ধাপে ধাপে প্রত্যাহার; যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোটা বা অশুল্ক বাধা না দেয়া; শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা; ইপিজেড এলাকায়ও শ্রম আইন প্রয়োগ; পরিবেশ সুরক্ষা আইন কার্যকর বাস্তবায়ন; ভর্তুকি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় জমা দেয়া এবং অর্থনীতি ও নিরাপত্তার নতুন মাত্রা।

চুক্তিপত্রে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, রফতানি নিয়ন্ত্রণ, তথ্য সুরক্ষা এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় কঠোর মানদণ্ড আরোপের কথা বলা হয়েছে। বন্দর, লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম ও বাণিজ্যিক জাহাজের তথ্য নিরাপদ রাখতে উন্নত সাইবার ব্যবস্থার বাধ্যবাধকতা থাকছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন ঠেকাতে বাংলাদেশকে নিজস্ব আইন ও প্রয়োগ কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। প্রয়োজনে দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত নজরদারির ব্যবস্থাও থাকবে।

কূটনৈতিক তাৎপর্য : বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের চিঠি নতুন সরকারের সাথে দ্রুত কৌশলগত সমন্বয় গড়ে তোলার ইঙ্গিত। এতে অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা- দুই খাতেই অংশীদারত্ব গভীর করার চেষ্টা স্পষ্ট। তবে চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা, স্থানীয় শিল্প ও কৃষিখাতের ওপর কী প্রভাব পড়বে- সে প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো- একদিকে কৌশলগত অংশীদারত্ব বজায় রাখা, অন্য দিকে জাতীয় স্বার্থ, স্থানীয় শিল্প ও শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। দুই দেশের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তা নির্ভর করবে এই ভারসাম্য রক্ষার ওপরই।