হামাসকে নিরস্ত্র না করে ইয়েলো লাইন থেকে সরতে চায় না ইসরাইলি বাহিনী
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ মঙ্গলবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজার তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখা থেকে ইসরাইলি বাহিনী এক মিলিমিটারও সরবে না। খবর ডেইলি সাবাহ্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ সমাপ্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলেও ইসরাইল তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। উল্লেখ্য, এই ইয়েলো লাইন বলতে গাজার পূর্ব দিকের সেই সীমানাকে বোঝায়, যেখানে ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ইসরাইলি বাহিনী পিছু হটেছিল। এক সংবাদ সম্মেলনে ভাষণ দেয়ার সময় কাটজ জোর দিয়ে বলেন, হামাসকে কোনোভাবেই অস্ত্র বা টানেলসহ গাজায় টিকে থাকতে দেয়া হবে না। তিনি দাবি করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত শেষ টানেলটি ধ্বংস না হচ্ছে এবং হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইসরাইল গাজা থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে না।
এর আগে গত সোমবার ইসরাইলি মন্ত্রিসভার সচিব ইয়োসি ফুচস ঘোষণা করেছিলেন, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণের জন্য ৬০ দিন সময় দেয়া হবে, অন্যথায় আবার যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দেন তিনি। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ফিলিস্তিনের গাজায় অন্তত ৭২ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তবে ইসরাইল বারবার তা লঙ্ঘন করে বিমান হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ট্রাম্পের পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে গাজার পুনর্গঠন এবং মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির কথা থাকলেও নিরস্ত্রীকরণের শর্তটি বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাশাপাশি, ইসরাইলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালী করতে ‘শিল্ড অব ইসরাইল’ নামে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প চালুর ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এই প্রকল্পের আওতায় আগামী এক দশকে প্রতিরক্ষা বাজেটে আরো ৩৫০ বিলিয়ন শেকেল বা প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার যোগ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কাটজ জানান, মিত্রদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য, যাতে যুদ্ধের সময় স্বাধীনভাবে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
গাজায় ইসরাইলের হত্যার টার্গেট নির্ধারণ করে দিচ্ছে এআই-অ্যালগরিদম
ইসরাইলি বামঘেঁষা ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’ এবং ‘লোকাল কল’ গাজায় পরিচালিত ইসরাইলি গণহত্যামূলক যুদ্ধের আরেকটি অন্ধকার দিক তুলে এনেছে। এই দুই সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যগুলো গাজার সমসাময়িক যুদ্ধের অন্ধকারতম দিকগুলোর একটি উন্মোচন করেছে। এখানে গণহত্যা কেবল বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে নয়, বরং ডাটা, অ্যালগরিদম এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের খবরে উল্লিখিত দুই ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইসরাইলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সিস্টেম ‘ল্যাভেন্ডার’ সেই সত্যটিই নিশ্চিত করেছে, যা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধা, লেবানন এবং ইরান বছরের পর বছর ধরে বলে আসছে-প্রযুক্তি এখন জায়নবাদী যুদ্ধযন্ত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং গণনিধনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘ডিজিটাল গোপনীয়তা’ বা ‘ডিজিটাল প্রাইভেসি’র উদারপন্থী বুলি বাস্তব তথ্যের সামনে ধসে পড়েছে। হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলো ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’-এর প্রতিশ্রুতি দিলেও একটি জরুরি সত্য গোপন করে, এখানে বার্তার চেয়ে ‘মেটাডেটা’র মূল্য অনেক বেশি।
ল্যাভেন্ডার গাজা উপত্যকার প্রায় পুরো জনসংখ্যাকে (২৩ লাখের বেশি মানুষ) মূল্যায়ন করেছে এবং তাদের ওপর স্বয়ংক্রিয় ‘ঝুঁকি স্কোর’ আরোপ করেছে। কেবল একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে থাকা, চিহ্নিত কারো সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, বা ‘সন্দেহজনক’ কোনো ডিজিটাল প্যাটার্ন প্রদর্শন করাই মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় নাম ওঠার জন্য যথেষ্ট। এই পুরো কাজটি করেছে এআই ‘ল্যাভেন্ডার।’
এখানে মানুষের তত্ত্বাবধান ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ন্যূনতম মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। উচ্চমাত্রার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা জেনেও এই মূল্যায়ন সচেতনভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। পুরো পরিবারকে তাদের নিজ ঘরে হত্যা করা হয়েছে এবং একটি অ্যালগরিদমিক সমীকরণে তাদের ‘গ্রহণযোগ্য আনুষঙ্গিক ক্ষতি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা মূলত এই হত্যাকাণ্ডকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।
এটি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়; বরং এটি নির্মূল করার একটি নীতি। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন নির্বিচার হামলা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করে এবং বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধাদের মধ্যে পার্থক্য করার নির্দেশ দেয়। প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যে সিস্টেমগুলো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করে এবং নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুকে আগে থেকেই মেনে নেয়, সেগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এটি প্রমাণ করে, গাজায় ইসরাইলি এই গণহত্যা প্রযুক্তিগতভাবে সংগঠিত ও যুক্তিভিত্তিক প্রক্রিয়া।
এই মডেলটি যে যন্ত্রের ওপর টিকে আছে তা বৈশ্বিক। একবিংশ শতাব্দীর গোয়েন্দাগিরি এখন আর শুধু বার্তা আড়িপাতার ওপর নির্ভর করে না, বরং পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেম নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে। বেসরকারি প্ল্যাটফর্মগুলো গ্রহজুড়ে সামাজিক জীবনের স্থায়ী সেন্সর হিসেবে কাজ করছে। তারা এমন ডাটাবেইস তৈরি করছে যা মোসাদ ও সিআইএর মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য উন্মুক্ত কখনো আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা, কখনো আইনি চাপ, আবার কখনো নিরাপত্তার দুর্বলতা ব্যবহারের মাধ্যমে। এটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স এবং সাম্রাজ্যবাদী নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে একটি কাঠামোগত মেলবন্ধনকে প্রতিনিধিত্ব করে।
অসলো চুক্তি বাতিল ও পশ্চিমতীরে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব আরোপের ঘোষণা ইসরাইলি মন্ত্রীর
ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেছেন, তার পরবর্তী রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোর একটি হলো অসলো চুক্তি বাতিল করা এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বিলুপ্ত করা। পশ্চিমতীরের বসতি নেতাদের সাথে এক সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। স্মোট্রিচ বলেন, অসলো চুক্তি বাতিল হলেই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অবসান ঘটবে এবং সেটিই তার মতে ‘দীর্ঘমেয়াদি সমাধান’। তিনি পশ্চিমতীর ও গাজায় পূর্ণ ইসরাইলি সার্বভৌমত্ব আরোপের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
১৯৯০-এর দশকে স্বাক্ষরিত অসলো চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠিত হয় এবং পশ্চিমতীরকে এ, বি ও সি-এই তিন এলাকায় ভাগ করা হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই কাঠামোকেই দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভিত্তি হিসেবে দেখে।
স্মোট্রিচের বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইন ও বিদ্যমান শান্তিপ্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব একে দখলদারিত্ব স্থায়ী করার ঘোষণা হিসেবে দেখছে। এই মন্তব্য পশ্চিমতীরে নতুন করে উত্তেজনা ও সহিংসতা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পশ্চিমতীরের ভূমি নিবন্ধন পরিকল্পনা যুদ্ধাপরাধের শামিল : মানবাধিকার সংগঠন
অধিকৃত পশ্চিমতীরে ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত ইসরাইলি সিদ্ধান্ত যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে বলে সতর্ক করেছে মানবাধিকার সংগঠন আদালাহ সেন্টার। সংগঠনটি এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্দেশনায় পশ্চিমতীরের এরিয়া সি-তে ভূমি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া চালু এবং প্রায় ১৫ শতাংশ অনিবন্ধিত জমি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নথিভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আদালাহর আইনি পরিচালক সুহাদ বিশারা বলেন, এটি বসতি সম্প্রসারণ ও কার্যত সংযুক্তীকরণকে বৈধতা দেবে। তিনি বলেন, ভূমি নিবন্ধন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় কাজ, যা অধিকৃত ভূখণ্ডে করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। আদালাহ সতর্ক করে বলেছে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এখনো এই অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
রমজান শুরুর সাথে সাথে পশ্চিমতীরে হাজারো ইসরাইলি সেনা মোতায়েন
রমজান মাসের প্রথম দিনে অধিকৃত পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছে ইসরাইল। ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাতে টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়, সম্ভাব্য উত্তেজনার আশঙ্কায় হাজারো পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে আল-আকসা মসজিদ ও পুরনো শহর এলাকায় কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। শুক্রবারে পশ্চিমতীর থেকে পূর্ব জেরুসালেমে প্রবেশের বিষয়ে সীমিত অনুমতির আলোচনা চলছে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১০ হাজার ফিলিস্তিনিকে নামাজে অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়ার ঘোষণা আসে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানায়, রমজানের আগে পূর্ব জেরুসালেমে গ্রেফতার অভিযান ও বহিষ্কার আদেশ বেড়েছে। বিশেষ করে ইসলামিক ওয়াকফ বিভাগের কর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীরা এর লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন।
১৯৬৭ সাল থেকে দখলকৃত পূর্ব জেরুসালেমকে ফিলিস্তিনিরা তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দাবি করে। তবে চলমান কড়াকড়ি ও সামরিক উপস্থিতিকে তারা ফিলিস্তিনি উপস্থিতি কমানোর পরিকল্পিত নীতি হিসেবে দেখছে।