ডাকসুর ১ বছরে ৩০ কোটি টাকার কাজ, প্রশাসনের বরাদ্দ ৩৫ লাখ

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর এক বছরের মেয়াদ গতকাল বুধবার শেষ হয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাদিক-ফরহাদ নেতৃত্বাধীন ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতেই বিজয় অর্জন করে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে প্রায় ৩০ কোটি টাকার এক হাজার উন্নয়নমূলক কাজ ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে ডাকসু। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-পরিবহন-স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে আবাসিক হল, খেলাধুলা, ধর্মীয় অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়ন-বিভিন্ন খাতে এসব কাজ করা হয়েছে। প্রশাসনের সীমিত বরাদ্দের বাইরে ব্যক্তি, অ্যালামনাই, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্পন্সরদের সহযোগিতায় এসব প্রকল্পের বড় অংশ বাস্তবায়ন করেছে ডাকসু।

ডাকসুর নেতাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের পরিবহনসেবা উন্নয়নে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে, নতুন কয়েকটি রুটসহ কুমিল্লা পর্যন্ত বাস চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠের উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা। একই পরিমাণ অর্থায়নে সংস্কার করা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ। এ ছাড়া মুসা খাঁ মসজিদ সংস্কারে ব্যয় হচ্ছে প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা।

বিভিন্ন আবাসিক হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) স্থাপনে প্রায় ছয় কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে। মেয়েদের জিমনেশিয়ামের জন্য অর্থায়ন করা হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা।

স্বাস্থ্য খাতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে ডাকসু। মেডিক্যাল সেন্টারের অবকাঠামো সংস্কারে প্রায় তিন কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে। ফার্স্ট এইড বুটক্যাম্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ টাকা। কয়েকটি মেডিক্যাল ক্যাম্পে পাঁচ হাজারের অধিক শিক্ষার্থীকে ফ্রি মেডিক্যাল সেবা প্রদানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে আরো কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও নেয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ল্যাব স্থাপনে প্রায় ৫০ লাখ টাকার কাজ চলমান রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে দেয়া বিভিন্ন কোর্সে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। সেমিনার, সামিট ও সাংস্কৃতিক আয়োজনেও প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় করেছেন ডাকসুর সম্পাদকরা। তা ছাড়া দু’টি হলে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে।

এক বছরের কার্যক্রমে ডাকসুর অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে দুই হাজার ৮৪১ কোটি টাকার বাজেটে পাঁচটি হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সম্মতি আদায় এবং চীনা সহযোগিতায় এক হাজার ৫০০ ছাত্রী ধারণক্ষমতার নতুন ছাত্রী হল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তুর্কি কো-অপারেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন এজেন্সি (ঞওকঅ)-এর আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স, ১০টি এয়ার কন্ডিশনার, এক্স-রে, ইসিজি মেশিন, এনালাইজার ও মাইক্রোস্কোপ প্রদান করে সংস্কার করা হয়।

জব ফেয়ারের মাধ্যমে চীনের ৩১টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪৩০ শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সাতটি প্রসিদ্ধ জার্নালে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে অ্যাক্সেসের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদসংক্রান্ত এখতিয়ারবহির্ভূত রেজুলেশন বাতিল করা হয়। পাশাপাশি ২৭০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা দেয়া হয়েছে। হলভিত্তিক মোট ১৮ বার ছারপোকা নিধনে ওষুধ প্রয়োগ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

তা ছাড়া কলাভবনে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, মেয়েদের কমনরুমে এসি স্থাপন, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি সংস্কার, প্রায় এক হাজার নারী শিক্ষার্থীকে হিজাব উপহার, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ছাত্রী হলগুলোতে বিনামূল্যে ১০ হাজারের অধিক স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করেছে ডাকসু।

ডাকসুর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্প ও উদ্যোগের বড় একটি অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি, অ্যালামনাই ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়মিত বাজেটের বাইরে স্পন্সরশিপ ও বহিরাগত সহযোগিতার অর্থেই এসব কাজের বড় অংশ সম্পন্ন বা চলমান রয়েছে।

প্রশাসনের বরাদ্দ মাত্র ৩৫ লাখ টাকা

জানা যায়, চলতি বাজেটে ডাকসুর জন্য কোনো বরাদ্দ রাখেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে দায়িত্ব নেয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর ১২ সম্পাদক ও ১৩ সদস্যের জন্য ২৫ লাখ টাকা এবং ভিপি, জিএস ও এজিএসের জন্য মোট ১০ লাখ টাকাসহ মোট ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ডাকসু কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরে আয় ৩৬ লাখ টাকা

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ফি’র হিসাব মতে, ডাকসু ও হল সংসদ ব্যয় বাবদ শিক্ষার্থীরা বছরে ১২০ টাকা প্রদান করেন। সে হিসাবে প্রতি বছর প্রশাসন প্রায় ৩৬ লাখ ছয় হাজার টাকা আয় করে। ২০১৯-এর ডাকসুর পর গত ছয় বছরে ডাকসু ও হল সংসদ বাবদ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দিয়েছে প্রায় দুই কোটি ১৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উত্তোলিত এই অর্থ বর্তমান ডাকসু বুঝে পায়নি।

অন্য দিকে ২০১৯ সালের ডাকসুর বাজেটের আকার ছিল প্রায় এক কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ওই বাজেটে ভিপি, জিএসসহ ৯ জন সম্পাদক ছিলেন। নির্বাচনের পর প্রথম ৯ মাসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উদ্যোগের খরচ হিসাবে তহবিল থেকে ৮৩ লাখ ৫১ হাজার ৩০৪ টাকা উত্তোলন করেছিলেন তৎকালীন ডাকসু প্রতিনিধিরা।

ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, গত ১০৫ বছরের ইতিহাসে এবারের ডাকসু সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় সমস্যাগুলোর কোনোটি অমীমাংসিত রাখা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি ন্যূনতম সহযোগিতাটুকুও করত, তাহলে আমাদের কোনো সঙ্কট থাকত না। শুধু অসহযোগিতা নয়; বরং প্রতিটি কাজে বাধা সৃষ্টি করেছে। তবুও আমরা বিভিন্ন স্পন্সর ম্যানেজ করে অন্তত ৩০ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন করেছি।

ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ২০১৯ সালের ডাকসুকে প্রায় দুই কোটি টাকা ফান্ড দেয়া হয়েছিল। বর্তমান ডাকসু এক বছরে পেয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে বড় অঙ্কের ফান্ড নিয়ে এলেও প্রশাসন বিভিন্নভাবে আমাদের কাজ আটকে দিয়েছে। তবুও আমরা রাত-দিন এক করে শিক্ষার্থীদের মৌলিক সঙ্কটগুলো মোকাবেলা করেছি।

ডাকসু কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা গত বছরের অক্টোবরে বাজেট চেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের বাজেট দেয়নি। পরবর্তী সময়ে ডাকসুর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বরাদ্দের পরিমাণকে কার্যক্রমের তুলনায় অপ্রতুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২৮ জন নেতার জন্য ৩৫ লাখ টাকা। তারা অনেক কাজ করছে। সে হিসাবে এই টাকা কিছু না।