আমানতদারিতার গুরুত্ব
Printed Edition
মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
আমানত আরবি শব্দ-এর অর্থ বিশ^স্ততা, নিরাপত্তা, গচ্ছিত রাখা, জমা রাখা ইত্যাদি। এর বিপরীত শব্দ খিয়ানত, যার অর্থ- বিশ্বাসঘাতকতা। যিনি গচ্ছিত বস্তু যথাযথভাবে হিফাজত করেন এবং প্রকৃত মালিক চাওয়া মাত্র তা ফেরত দেন, তাকে আমিন বা বিশ্বস্ত বলা হয়।
আমানতের বিষয়বস্তু : আমানত শুধু অর্থ-সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর বিষয়বস্তু ব্যাপক। ব্যবসায়-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, সরকারি-বেসরকারি দাফতরিক কাজকর্ম, শিক্ষকতা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব, মজুরি ইত্যাদি সবই আমানতের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ মানুষের সুস্থ বিবেক, হাত-পা, চক্ষু-কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা-ঠোঁট ইত্যাদি প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যক্তির কাছে আমানতস্বরূপ। এগুলোর ব্যবহার প্রসঙ্গে বিচার দিবসে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘চোখের খিয়ানত এবং অন্তর যা গোপন রাখে তা তিনি (আল্লাহ) জানেন।’ (সূরা আল মুমিন-১৯) তদ্রƒপ শরিয়তের ফরজ কর্ম, সতিত্বের হিফাজত, অপবিত্রতার গোসল, নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ ইত্যাদি আমানত। এ কারণে অধিকাংশ মনীষী বলেন, দ্বীনের যাবতীয় কর্তব্য আমানতের অন্তর্ভুক্ত। (তাফসিরে কুরতুবি, ১৪তম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৭৯) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: বলেন, আল্লাহ তায়ালা আমানতকে সৃষ্টি করে একটি পাথরের আকৃতি দিয়ে যেখানে ইচ্ছা রাখতে চাইলেন। এরপর আকাশ, জমিন ও পাহাড়কে তা গ্রহণ করতে বললেন। আর এ কথাও বলে দেন, তার মর্যাদা রক্ষা করতে পারলে পুরস্কৃত হবে, আর মর্যাদা রক্ষা করতে না পারলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। তারা বলল, হে প্রভু! আমাদের তা বহন করার সাধ্য নেই। এরপর হজরত আদম আ:-কে তা গ্রহণ করতে বলা হলে তিনি তা গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করে আমানতের খিয়ানত করেন। এরপর জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হন। (তাফসিরে কুরতুবি, ১৪তম খণ্ড, পৃষ্ঠা : ১৭৯-১৮০)
আমানতের বিধান : আমানতের খিয়ানত করা কবিরা গুনাহ ও মুনাফিকের পরিচায়ক, আর আমানত রক্ষা করা ঈমানদারের পরিচায়ক। মহানবী সা: বলেছেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই, আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না তার দ্বীন নেই।’ (সুনানে বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান, মিশকাত, পৃষ্ঠা-১৫) রাসূলুল্লাহ সা: অন্যত্র বলেছেন, ‘মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি- ১. কথা বললে মিথ্যা বলে; ২. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে; ৩. আমানত রাখলে খিয়ানত করে।’ (বুখারি, বাবু আলামাতিল মুনাফিকি-৩২, মুসলিম-বাবু বায়ানি খিচালিল মুনাফিক-৮৯) সুতরাং আমানতের খিয়ানতকারী মুনাফিক।
আমানতদারিতার গুরুত্ব : আমানতদারিতা এমন এক মহৎ গুণ যার ওপর জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি নির্ভরশীল। আল্লাহর বাণী- নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে- ‘তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সূরা আন নিসা-৫৮)
অন্যত্র ইরশাদ করেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তোমাদের ওপর ন্যস্ত আমানতের খিয়ানত করো না। অথচ তোমরা এর গুরুত্ব জানো।’ (সূরা আনফাল-২৭) রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন- যখন দু’পক্ষ মিলে যৌথ কোনো কাজ করে, আমি তখন তাদের (সাথে) তৃতীয় পক্ষ হই। যে পর্যন্ত তারা পরস্পরের সাথে খিয়ানত তথা বিশ্বাসঘাতকতা না করে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাকেম) রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে তোমাকে বিশ্বাস করে তার বিশ্বাস রক্ষা করো, আর যে তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না।’ রাসূল সা: অনত্র বলেছেন, ‘মুমিনের মধ্যে আর যত দোষই থাক, খিয়ানত তথা বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যাচার থাকতে পারে না।’ (মুসনাদে আহমাদ) হজরত ইবনে মাসুদ রা: বলেন, আমানতের খিয়ানতকারীকে কিয়ামতের দিন হাজির করা হবে এবং বলা হবে, তোমার আমানত ফেরত দাও। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেমন করে ফেরত দেবো? দুনিয়া তো ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন তার কাছে যে জিনিসটি আমানত রাখা হয়েছিল, সে জিনিসটিকে জাহান্নামের সর্বনি¤œ স্থলে হুবহু দেখানো হবে। এরপর বলা হবে, তুমি সেখানে নেমে পড়ো এবং একে নিয়ে আসো। এরপর সে নেমে যাবে এবং জিনিসটি ঘাড়ে করে নিয়ে আসবে। জিনিসটি তার কাছে দুনিয়ার সব পাহাড়ের চেয়ে ভারী মনে হবে। সে মনে করবে, জিনিসটি নিয়ে এলে জাহান্নামের আজাব থেকে নিষ্কৃৃতি পাবে। কিন্তু জাহান্নামের মুখের কাছে আসা মাত্র আবার আমানতের জিনিসহ জাহান্নামের সর্বনি¤œ স্তরে পতিত হবে এবং সেখানে চিরকাল থাকবে। মহানবী সা: বলেন, ‘মানুষের চারিত্রিক গুণাবলির মধ্য থেকে যে গুণটি সবচেয়ে আগে অদৃশ্য হয়ে যাবে, তা হলো আমানতদারিতা তথা বিশ্বস্ততা। আর শেষ অবধি যা রয়ে যাবে, তা হচ্ছে নামাজ। তবে এমন অনেক নামাজি আছে, যারা কোনো কল্যাণই অর্জন করতে পারে না। হজরত আবু হুরায়রা রা: বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমরা খিয়ানত করো না, কেননা খিয়ানত কতই না শাস্তি ও তিরস্কারযোগ্য অপরাধ।’ (আবু দাউদ ও তিরমিজি) মহানবী সা: বলেন, ‘তোমার সাথে চারটি জিনিস থাকলে পৃথিবীর সব হারিয়ে ফেললেও তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না- ১. আমানতের সংরক্ষণ; ২. সত্যবাদিতা; ৩. উত্তম চরিত্র ও ৪. পবিত্র রিজিক।’ (আল মুসতাদরাক লিল হাকিম-৭৯৮৯) আমাদের প্রিয় নবী সা: ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ আমানতদার। তাঁর জাতি খুব অল্প বয়সেই তাঁকে ‘আল-আমিন’ তথা অতিবিশ্বাসী উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর সাহাবিরাও ছিলেন আমানতদারিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে তারা আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা: রাষ্ট্রের অর্থ-সম্পদকে এক বিরাট আমানতরূপে গণ্য করতেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রথমত তিনি ব্যবসায়-বাণিজ্য করতেন। রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে কোনো বেতন-ভাতা গ্রহণ করতেন না। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় কাজে সর্বদা ব্যস্ত থাকায় ব্যবসায়-বাণিজ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে মজলিসে শূরার পরামর্শক্রমে একজন সাধারণ নাগরিকের সমপরিমাণ ভাতা গ্রহণ করতে সম্মতি জানান। এতে তার পরিবারের ভরণ-পোষণের কাজ কোনো রকমে চলে যেত। একদিন তার স্ত্রী এই বরাদ্দ ভাতা থেকে কিছু অর্থ জমিয়ে একটি মিষ্টি খাবার তৈরি করেন। খলিফা আশ্চর্য হয়ে স্ত্রীকে মিষ্টি খাবার সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। স্ত্রী প্রত্যুত্তরে বললেন, নিয়মিত বরাদ্দ থেকে কিছু অর্থ জমিয়ে তা তৈরি করেছি। এ কথা শুনে তিনি মন্তব্য করেন, যে পরিমাণ খাদ্য জমিয়ে এ মিষ্টি দ্রব্য তৈরি করা হয়েছে, তা আমাদের না হলেও চলত। কাজেই ভবিষ্যতে বায়তুল মাল (সরকারি কোষাগার) থেকে এ পরিমাণ খাদ্য কম আনা হবে। রাষ্ট্রীয় তহবিলের আমানতদারির ব্যাপারে তিনি কতখানি সতর্ক ছিলেন, এই ঘটনা থেকে তা প্রমাণিত হয়। হজরত উমর রা: অর্ধ পৃথিবীর খলিফা হয়েও তালি দেয়া জামা পরিধান করতেন। হিমসের গভর্নর হজরত সাঈদ রা: ছিলেন রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে গরিব ব্যক্তি। ইসলামের পঞ্চম খলিফা হজরত ওমর ইবন আবদুল আজিজ রা:-এর স্ত্রীর হাত পোড়া গেলে তিনি নিজে রান্না করেছেন। রাজকোষ থেকে অর্থ দিয়ে চাকরানি রাখেননি। কারণ, তিনি মনে করতেন- রাষ্ট্রের সম্পদ তার কাছে আমানতস্বরূপ মাত্র। আল্লামা ইকবাল বলেছেন, ‘চবক ফের পর চাদাকাত কা আদালত কা শুযাআত কা লিয়া যায়েগা তুম ছে কাম দুনিয়াকি ইমামত কা।’ (তোমরা যদি গ্রহণ করতে পার সততা, বিশস্ততা এবং বীরত্বের পাঠ, তোমাদের থেকেই নেয়া হবে দুনিয়ার নেতৃত্বের কাজ)। অর্থাৎ- তোমাদের মধ্যে তিনটি গুণ তথা সততা, বিশ্বস্ততা ও বীরত্ব থাকলে পরো পৃথিবীর নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। মুমিনের কাছে সর্বাপেক্ষা উত্তম সম্পদ হলো আমানতদারিতা। তাই মুমিন আমানতদারিতা রক্ষা করতে সদা সচেষ্ট থাকে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে আমানতদারিতার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদানের তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : প্রধান মুফতি, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী