গাজা শান্তি বোর্ডের যাত্রা শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত বোর্ড ফর পিস গাজা পুনর্গঠন ও যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কাজ শুরু করলেও শুরু থেকেই বিতর্কের মুখে পড়েছে। ঘোষণার সময় ২৬টি দেশ সনদে যুক্ত হলেও প্রথম বৈঠকে উপস্থিত ছিল মাত্র ১৯টি দেশ। বহু মার্কিন মিত্র রাষ্ট্র এতে অংশ নেয়নি, ফলে বোর্ডটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক খবরে এ তথ্য জানিয়েছে মিডলইস্ট মনিটর।

সমালোচকদের মতে, এই বোর্ড কূটনৈতিক সংস্থা না হয়ে করপোরেট বোর্ডের মতো আচরণ করছে। বৈঠকে গাজার জন্য সাত বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি এলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বছরের যুদ্ধে বিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনে প্রয়োজন অন্তত ৭০ বিলিয়ন ডলার। অর্থ ব্যবহারের রূপরেখা, সশস্ত্র গোষ্ঠী নিরস্ত্রীকরণ কিংবা ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার- কোনো বিষয়েই স্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, জাতিসঙ্ঘের ভূমিকা খর্ব করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।

এ দিকে যুদ্ধবিরতির কয়েক মাস পর রমজান এলেও গাজায় স্বস্তি ফেরেনি সাধারণ মানুষের জীবনে। টানা সামরিক হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বসতবাড়ি, অব্যাহত অবরোধ ও মানবিক সঙ্কটের মধ্যেই পবিত্র মাসকে বরণ করছেন ফিলিস্তিনিরা। খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সঙ্কটে রমজানের প্রস্তুতিও কঠিন হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গাজার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, আর বেকারত্ব ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

ফলে ঐতিহ্যবাহী ইফতার আয়োজন অনেক ঘরেই সীমিত হয়ে এসেছে সামান্য রুটি বা ডাল-ভাতে। সবচেয়ে ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রিয়জন হারানোর শোক। যুদ্ধের ফলে হাজার হাজার শিশু এতিম হয়েছে, বহু পরিবারে ইফতারের টেবিলে ফাঁকা চেয়ার রয়ে গেছে। তবু হতাশার মাঝেও মানুষ চেষ্টা করছে রমজানের তাৎপর্য ধরে রাখতে। ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ কিংবা খোলা আকাশের নিচে তারাবির নামাজ আদায় করছেন তারা।

অন্য দিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের বেনি সুহেইলা এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়, একই সময় উপকূলে নৌবাহিনী থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়। পূর্ব গাজার তুফফাহ এলাকায় ভারী কামান থেকে গোলা নিক্ষেপ করা হয় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সাঁজোয়া যান থেকে গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় ৬১২ জন নিহত এবং এক হাজার ৬৪০ জন আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরো ৭২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামলায় গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৭০ জনে, আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ।

এ দিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজায় বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে দুই ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের কিজান আল-নাজ্জার এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় উসামা আহমেদ আল-নাজ্জার নিহত হন। উত্তর গাজার জাবালিয়ায় আরেক ড্রোন হামলায় মাজিদ আবু আল-আওফ নিহত হন।

এ ছাড়া গাজা শহরের শুজাইয়া এলাকায় গুলিবর্ষণে তিনজন আহত হন। অধিকৃত পশ্চিমতীরের হেবরনে শিশুদের একমাত্র ফুটবল মাঠ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। স্থানীয়রা আইনি ও গণমাধ্যম উদ্যোগে এ সিদ্ধান্ত ঠেকানোর চেষ্টা করছেন।

বিবিসির খবর অনুসারে, গাজা ছাড়াও অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়তে থাকায় গভীর সঙ্কটে পড়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। রামাল্লাহর উত্তর-পূর্বে আল-মুঘাইয়ির গ্রাম এখন কার্যত সঙ্ঘাতের সম্মুখভাগে। সেখানে নিয়মিত ইসরাইলি সেনা অভিযান, কৃষিজমি দখল এবং নতুন বসতি স্থাপনের ঘটনা ঘটছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক সঙ্কটে মৌলিক সেবা দিতে পারছে না।

২০২৩ সালের অক্টোবরের ঘটনার পর প্রায় এক লাখ ফিলিস্তিনি ইসরাইলে কাজের অনুমতি হারান। একই সাথে কর রাজস্ব আটকে রেখেছে ইসরাইল। ফলে কর্তৃপক্ষের পাওনা চার বিলিয়ন ডলারের বেশি। সরকারি কর্মচারীরা বেতন পাচ্ছেন মাত্র ৬০ শতাংশ, আর ছয় লাখের বেশি শিক্ষার্থীর স্কুল সপ্তাহে তিন দিন খোলা থাকে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজা উপত্যকায় জীবন ঝুঁকিতে রেখে কৃষিকাজে ফিরছেন ফিলিস্তিনি কৃষকরা। গাজা নগরীর জেইতুন এলাকায় কৃষক মোহাম্মদ আল-সালাখি ধ্বংসপ্রাপ্ত খামারে ফিরে সীমিত আকারে সবজি চাষ শুরু করেছেন। তবে খামারে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ইসরাইলি ট্যাংক ও গুলির মুখে পড়ছেন তিনি।

জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গাজায় ৮০ শতাংশের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় ৭৫ বছর বয়সী কৃষক ঈদ আল-তাবান জানান, গোলাগুলির ভয়ে তার জমির ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। সম্প্রতি একই এলাকায় কৃষক খালেদ বারাকা গোলাগুলিতে নিহত হন।

টিআরটি ওয়ার্ল্ডের খবরে বলা হয়েছে, পবিত্র রমজান মাসের তৃতীয় দিনে অধিকৃত পশ্চিমতীরে অভিযান চালিয়ে ১৪ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরাইলি সেনারা। জেনিন, তুলকারেম ও সালফিত এলাকায় বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে এসব আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে একজন কিশোরও রয়েছে। বন্দী অধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরাইলি কারাগারে ৯ হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন, যাদের মধ্যে শতাধিক শিশু ও নারী রয়েছেন। নির্যাতন, অনাহার ও চিকিৎসা অবহেলায় অনেক বন্দীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ দিকে অধিকৃত পশ্চিমতীরে এক ফিলিস্তিনি-আমেরিকান যুবক হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। নিহত ১৯ বছর বয়সী নাসরাল্লাহ আবু সিয়ামকে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা গুলি ও মারধর করে হত্যা করে। একই ঘটনায় আরও তিন ফিলিস্তিনি আহত হন। গুতেরেস ইসরাইলকে দখলদার শক্তি হিসেবে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। জাতিসঙ্ঘের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত বসতি সহিংসতায় প্রায় চার হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।