দীপু মনি চান না মুক্তি, তৌফিক চান গৃহবন্দিত্ব

আলমগীর কবির
Printed Edition

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ একই মামলায় হাজিরা দিতে এসে তারা প্রকাশ করলেন বিপরীতমুখী অবস্থান। দীর্ঘদিন বন্দী থাকার পর শারীরিক অবস্থা ও আইনি যুক্তি দেখিয়ে জামিন বা গৃহবন্দিত্ব চাইলেন তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। বিপরীতে, স্বামী হারানোর শোকে আচ্ছন্ন দীপু মনি ট্রাইব্যুনালকে জানিয়ে দিলেন তিনি আর মুক্ত হতে চান না, তুলে নিতে চান তার জামিন আবেদন।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১২টায় বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বেঞ্চে কার্যক্রম শুরু হয়। বেঞ্চের অন্য দুই বিচারক ছিলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

কার্যক্রমের শুরুতেই আইনি নথিপত্রের অনুলিপি (কপি) সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয় তীব্র তর্ক-বিতর্ক। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তদন্তের সময় বাড়ানোর আবেদনের অনুলিপি দাবি করলে প্রসিকিউটর গাজী এইচএম তামীম বিরোধিতা করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ১২ নম্বর ধারা উদ্ধৃত করে বলেন, এটি বিবিধ মামলার বিষয়বস্তু, যা তদন্ত ত্বরান্বিত করার স্বার্থে গোপন রাখা হয়েছে। এসব নথি দিতে প্রসিকিউশন বাধ্য নয়।

তবে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের এই যুক্তিতে দ্বিমত পোষণ করেন। আদালত বলেন, ‘নথিতে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, তাই আসামিপক্ষকে আবেদনের অনুলিপি সরবরাহ করতে হবে।’ এরপর প্রসিকিউটর জানান, ১৩ জন আসামির বিষয়ে একত্রে তদন্ত শেষ করতে আরো ১৫ দিন সময় প্রয়োজন। জবাবে আসামিপক্ষের আইনজীবী অভিযোগ তোলেন, প্রসিকিউশন বিবিধ মামলাকে আসামিদের আটকে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

আইনজীবীদের যুক্তিতর্কের একপর্যায়ে কাঠগড়া থেকে কথা বলার অনুমতি চান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। আদালত অনুমতি দিলে তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, আপনারা শেষবার এক মাসের সময় দিয়ে বলেছিলেন এটাই শেষ সময়। এখন আর বারবার সময় না দিয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলে কৃতজ্ঞ হব।

তৌফিক-ই-ইলাহীর আইনজীবী আদালতে জামিনের আইনি ভিত্তি ও তার বিরুদ্ধে আনা অপরাধের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মক্কেল কোনো নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন পদে ছিলেন না; তিনি কেবল সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে উপদেশ দিতেন, যা বাস্তবায়ন করা সরকারের ইচ্ছাধীন ছিল। তা ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে ১৪ দলীয় জোটে বা আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো নীতিনির্ধারণী বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। আইনজীবী যুক্তি দেন, তৌফিক-ই-ইলাহী ৮৪ বছরের এক প্রবীণ ব্যক্তি, তার স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে এবং তিনি ইতোমধ্যেই প্রায় এক বছর সাত মাস ধরে কারারুদ্ধ। ট্রাইব্যুনাল আইনের বিধি অনুযায়ী তদন্ত শেষ না হলে জামিনের সুযোগ রয়েছে। তা বিবেচনায় নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে জামিন অথবা অন্তত গৃহবন্দী রাখার অনুরোধ জানান তিনি।

এর বিপরীতে প্রসিকিউটর তৌফিক-ই-ইলাহীর অপরাধের আইনি দিক তুলে ধরে জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে নীতিগত ও কৌশলগত পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে।

এরপরের ঘটনা এজলাসে তৈরি করে চরম এক থমথমে ও আবেগঘন পরিবেশ। এজলাসের কাঠগড়ায় থাকা মাইক্রোফোনে কথা বলার অনুমতি চান ডা: দীপু মনি। অনুমতি পেয়ে তিনি সরাসরি জামিন আবেদন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বলেন, মাই লর্ড, আমার জামিনের আবেদন গত এপ্রিলে করা হয়েছিল। দুই বছর ধরে কারাগারে আছি। গত শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, ‘বাসায় গিয়ে কী করবেন?’ সত্যি তো, এখন আমি বাসায় গিয়ে কী করব?’

এ সময় অশ্রুসজল চোখে ৩৯ বছরের জীবনসঙ্গী পরলোকগত ড. তৌফীক নাওয়াজের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমার বয়স এখন ৬২ বছর। আমার স্বামী সাত বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। তিনি কথা বলতে পারতেন না, চোখের পলক ফেলে উত্তর দিতেন। পাঁচ বছর মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়েও আমি নিজ হাতে তার সেবা করেছি। কিন্তু আমি গ্রেফতার হওয়ার পর গত দুই বছর তাকে আশ্রিত হিসেবে অন্যের দয়ায় থাকতে হয়েছে। চার মাস আগে যখন তার অবস্থার অবনতি হয় এবং তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়, তখন তার পাশে থাকার জন্য জামিন চেয়েছিলাম আপনারা দেননি। জীবনসঙ্গীর শেষ সময়ে আমি পাশে থাকতে পারিনি। গত ১৮ আগস্ট তিনি মারা গেছেন। এখন আর আমার বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই। সন্তানরা জামিন চায়, কিন্তু আমি আর জামিন চাই না। আমি আবেদন প্রত্যাহার করতে চাই।

দীপু মনির বক্তব্য শোনার পর ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘উই আর সাডেন্ড (আমরা মর্মাহত)। হোয়াটএভার ইউ সেইড, বাট মেনি আদার রিজন হ্যাড টু কনসিডার্ড অ্যান্ড উই থট বোথ সাইডস (আপনি যাই বলুন না কেন, আরো অনেক কিছু বিবেচনায় নিতে হয়, উভয় পক্ষের কথা ভাবতে হয়)।’

উভয় পক্ষের আইনি যুক্তিতর্ক শেষে আদালত চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন। দীপু মনি জামিন তুলে নিতে চাইলেও তার আইনজীবীদের সম্মতিতে ট্রাইব্যুনাল জামিন আবেদনটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য মুলতবি রাখার নির্দেশ দেন।

এদিন এই মামলার আসামি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, সাবেক এমপি সোলাইমান সেলিম, সাবেক সচিব জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।