রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ধীরগতি খরচের পাহাড়, প্রাপ্তি শূন্যদ

এস এম মিন্টু
Printed Edition

মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘটিত সহিংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পর দেখতে দেখতে ৯ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশ সরকার সমন্বিতভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও একজন রোহিঙ্গাকেও স্বদেশে টেকসইভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের নতুন কমিটিকে ঘিরে আবারো প্রশ্ন উঠছে- এবার কি প্রত্যাবাসনে ইতিবাচক কোনো অগ্রগতি সম্ভব, নাকি অতীতে গঠিত নানা উদ্যোগের মতোই এটি নিষ্ফল প্রমাণিত হবে?

তহবিলের চিত্র ও মানবিক সঙ্কট : জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) প্রতি বছর যৌথভাবে ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ (জেআরপি) প্রকাশ করে আসছে। সম্প্রতি অতিবর্ষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানবিক খাতগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্থান রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি সেবা রক্ষণাবেক্ষণ করা ও দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে জেআরপির আওতায় আর্থিক ঘাটতি আরো প্রকট রূপ নিয়েছে।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা, শিশু সুরক্ষা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (জিবিভি) রোধ, খাদ্য নিরাপত্তা, ওয়াশ, পুষ্টি এবং ভাসানচর প্রকল্পের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় চলতি ২০২৬ সালের জেআরপি লক্ষ্যমাত্রায় প্রায় ৪৪ শতাংশ ঘাটতি দেখা দেয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিপুল ব্যয়ের খতিয়ান

জেআরপির গত ৫ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক অর্থ আহ্বানের পরিমাণ প্রতি বছরই ছিল প্রায় ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। ২০২২ সালে এই চাহিদার পরিমাণ ছিল ৮৮১ মিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে ৮৭৬ মিলিয়ন, ২০২৪ সালে ৮৫২ মিলিয়ন এবং ২০২৫ সালে তা রেকর্ড ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

চলতি ২০২৬ সালে এ আহ্বানের পরিমাণ কমিয়ে ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে- যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম। গত ৫ বছরের হিসাব এক করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আহ্বানের সামগ্রিক অংক দাঁড়ায় প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার (বা ৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি)। এটি বর্তমান মুদ্রাবিনিময় হারে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার সমান।

যদিও আহ্বান করা এই সহায়তার পুরোটা পাওয়া যায়নি। জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, মৌলিক মানবিক সহায়তায় ঘাটতির পাশাপাশি সহনশীলতাসংক্রান্ত কর্মসূচিসহ সার্বিক হিসাব কষলে গড় তহবিল ঘাটতি ৭২.৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা শরণার্থী শিবিরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

এর বাইরে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিলের তহবিল ব্যয়ও কম নয়। শরণার্থী খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবেশজনিত ক্ষতি সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব কোষাগার থেকে প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। হিসাব অনুযায়ী, বিগত বছরে কেবল সরকারি কোষাগার থেকেই ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে- যা শেষ পর্যন্ত দেশের করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নতুন কমিটি

মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় গত ১৩ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ‘রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন কমিটি’ নামে ১১ সদস্যের একটি নতুন প্যানেল গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

কমিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত আছেন- স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা।

প্রশাসনিক ও মাঠপর্যায়ের সহায়তায় রয়েছেন শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি), স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত আইজিপি, বিজিবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক, এনএসআইয়ের সীমান্ত পরিচালক এবং সোশ্যাল স্ট্যাবিলিটি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক।

এই কমিটির মূল দায়িত্ব হলো : প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বিভিন্ন সংস্থার কাজের মধ্যে আন্তঃসমন্বয় বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যপরিধি নির্দিষ্ট করা। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার এ সঙ্কটের একটি টেকসই ও দ্রুত সমাধানের ব্যাপারে আন্তরিক এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে জোরালো বিশ্বজনমত তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বেশ কয়েকটি পর্যালোচনামূলক বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। কৌশলগত গুছানোর কাজ শেষ করার পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই কমিটির অগ্রগতি গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

অচলাবস্থার নেপথ্য কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যাবাসন থমকে থাকার প্রধান কারণ মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও রাখাইনের ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন। বর্তমানে রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’ (এএ), যাদের সাথে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর সংঘাত চলমান। ফলে সেখানকার সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে পরিচয়ের তথ্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে চরম ধীরগতি। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো প্রায় আট লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকার মধ্যে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত মাত্র চার লাখ ৫০ হাজারজনের তথ্য যাচাই করেছে। যার মধ্যে মাত্র তিন লাখ আট হাজারজনকে রাখাইনের নিবন্ধিত বাসিন্দা হিসেবে তারা স্বীকার করে নিয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও শরণার্থীবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিতভাবে নাগরিকত্বহীন করে রাখা মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ। এই পরিচয় অস্বীকারের রাজনীতিকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় মোকাবেলা না করে শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনা দিয়ে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।’

এদিকে রেশন ও মানবিক সাহায্য সঙ্কুচিত হওয়ায় শরণার্থী শিবিরের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার কারণে চলতি বছরই বিপজ্জনক সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে গিয়ে আন্দামান ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।

ভবিষ্যৎ পথরেখা

বিশ্লেষকদের অভিমত-শুধু ত্রাণ সহায়তা দিয়ে এ সঙ্কট জিইয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রয়োজন মিয়ানমার জান্তা ও অন্য সক্রিয় গোষ্ঠীগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক মহলের প্রত্যক্ষ কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা। বিশেষ করে চীন, ভারত এবং আসিয়ানভুক্ত আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। নতুন গঠিত জাতীয় কর্মকৌশল কমিটি এই কূটনৈতিক গতিশীলতা কতটা তৈরি করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে প্রত্যাবাসনের ভাগ্য।