ভারতে বেসরকারি খাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ
আলজাজিরার বিশ্লেষণ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে দ্রুত স্বাবলম্বী হতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বেসরকারি খাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ভারতের সরকারি গবেষণা সংস্থা ডিআরডিওর উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বেসরকারি সংস্থাগুলোকে হস্তান্তর করা হবে, যা এতদিন একচেটিয়া সরকারি নিয়ন্ত্রণে ছিল। মোদি সরকারের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির অংশ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা থেকে শুরু করে বড় আকারের গণউৎপাদন দ্রুততর করা এবং বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এর মূল লক্ষ্য।
এই ব্যবস্থার আওতায় আকাশ থেকে আকাশ, ভূমি থেকে আকাশ, যুদ্ধট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ভারী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো প্রযুক্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভূরাজনৈতিক চাপ
পাকিস্তান ও চীনের সাথে চলমান সীমান্ত উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক যুদ্ধের (ইউক্রেন যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত) অভিজ্ঞতা থেকে ভারত আধুনিক যুদ্ধে দ্রুত অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে পর্যাপ্ত মজুদ বা ‘ম্যাগাজিন ডেপথ’ তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে চাপে রাখতে এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
রফতানি বৃদ্ধি
ভারত ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের কাছে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র রফতানি করছে। তবে বেসরকারি খাতে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিয়োগের রিটার্ন পেতে মোদি সরকারের তরফ থেকে বড় বড় অর্ডারের প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেয়ায় তথ্য ফাঁসের কোনো ঝুঁকি থাকে কি না- এমন প্রশ্ন উঠলেও, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে ভারতের পুরনো ও বিশ্বস্ত শিল্পগোষ্ঠীগুলো গোপনীয়তা বজায় রাখতে অভ্যস্ত এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোগত নিয়মের প্রতি ভারত কঠোরভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
নতুন যুগের সূচনা
ভারতের বেসরকারি সংস্থাগুলো এখন শুধু যন্ত্রাংশ বা খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তারা পুরো ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেমের ‘প্রাইম ইন্টিগ্রেটর’ বা মূল প্রস্তুতকারক হিসেবে কাজ করতে পারবে। ফলে সরকারি একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হলো। ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ চীনের সামরিক শক্তি এবং পাকিস্তানের সাথে সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বিশাল চাহিদা একা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর পক্ষে পূরণ করা অসম্ভব, যার জন্য বেসরকারি খাতের বড় মাপের অংশগ্রহণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস, টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস এবং লারসেন অ্যান্ড টুব্রোর মতো বড় বড় ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যেই প্রতিরক্ষা উৎপাদনে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। উদাহরণস্বরূপ, আদানি গ্রুপ উত্তরপ্রদেশে ক্ষেপণাস্ত্র এবং গোলাবারুদ তৈরির সুবিধার জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো তখনই এই খাতে সফল হবে যখন সরকার তাদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বড় অর্ডার নিশ্চিত করবে। কারণ এই শিল্পে গবেষণা, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল পরিমাণ মূলধন প্রয়োজন হয়।
ভারতের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা রফতানি ২০১৪-১৫ সালে সামান্য হলেও বর্তমানে তা লাফিয়ে বহুগুণ বেড়েছে। এমএসএমই এবং ডিফেন্স টেক স্টার্টআপগুলোর উদ্ভাবনী ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে বলে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা), ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং উন্নত উপকরণ নিয়ে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত গবেষণা ও নতুন সমাধান নিয়ে আসতে পারে। ভারত সরকার আইডিইএক্স স্কিমের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে এই ছোট ও নতুন কোম্পানিগুলোকে আর্থিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। বড় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার তুলনায় ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলো অনেক বেশি নমনীয় হয়। তারা কম খরচে ও দ্রুততম সময়ে নির্দিষ্ট যন্ত্রাংশ বা প্রযুক্তি সরবরাহ করতে পারে। ফলে সামগ্রিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনের খরচ কমে আসে এবং ভারত বিশ্ববাজারে আরো প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ
এমএসএমই খাতের বিস্তৃতি মানেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া। এতে করে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার, কারিগর ও প্রযুক্তিবিদদের জন্য কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। বেঙ্গালুরুভিত্তিক তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের রিসার্চ ফেলো আদিত্য রমানাথন বলেছেন, এই ঘোষণাটি একটি ‘বড় পরিবর্তন’, কারণ এটি সেই একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটাচ্ছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ধরে ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরি করে আসছে, কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ফলে তারা ভ্যালু চেইনে আরো ওপরের দিকে উঠতে পারবে এবং এই সিস্টেমগুলোর প্রধান ইন্টিগ্রেটর হয়ে উঠতে পারবে। মোদির শাসনামলে প্রতিরক্ষা বাজেট দ্বিগুণেরও বেশি, যা ২০১৪ সালের ৩৮ বিলিয়ন ডলার থেকে চলতি অর্থবছরে ৮৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ বছরের প্রতিরক্ষা বাজেট গত বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। রমানাথন আরো বলেন, ভারত বিশ্বাস করে, চীনকে প্রতিহত করতে, তাকে প্রমাণ করতে হবে যে সে কয়েক সপ্তাহের কঠিন যুদ্ধে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে এবং তা সহ্যও করতে পারে।
গত জুনে ভারত ঘোষণা করে যে তারা দেশীয় নির্মাতাদের কাছ থেকে সামরিক ড্রোনের জন্য দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভারতের ড্রোন শিল্পে ৬০০-এর বেশি সংস্থা জড়িত, যার মধ্যে আদানি, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের মতো প্রধান গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি স্টার্টআপও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এরপর জুলাই মাসে, ভারত তার প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য ৫.৪৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনুমোদনও দেয়, যার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং কামিকাজে ড্রোন রয়েছে। নয়াদিল্লি অন্তত ৭৫টি জাহাজ ও সাবমেরিন সংগ্রহের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যার বেশির ভাগই দেশীয়ভাবে নির্মিত হবে। ভারত তার অস্ত্রের বিদেশী উৎসগুলোতে বৈচিত্র্য আনতে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ইসরাইলের মতো দেশগুলোর সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক প্রসারিত করেছে।
ভারতের কাছে কী কী ক্ষেপণাস্ত্র আছে?
ভারতের কাছে বিভিন্ন ধরনের ক্রুজ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনেও সক্ষম। গত মে মাসে, পাকিস্তানের সাথে ২০২৫ সালের যুদ্ধের বার্ষিকীতে, ভারত সফলভাবে অগ্নি-৫ এর পরীক্ষা চালায়। এটি তার সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা ৫,৫০০ কিলোমিটার (৩,৪১৮ মাইল) দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই পাল্লা সমগ্র চীন, মধ্যপ্রাচ্য এবং এমনকি ইউরোপের কিছু অংশকেও আওতায় আনে। এর অন্যান্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা সর্বনিম্ন পৃথ্বী-১ (১৫০ কিমি. বা ৯৩ মাইল) থেকে সর্বোচ্চ অগ্নি-৪ (৪,০০০ কিমি. বা ২,৪৮৫ মাইল) পর্যন্ত, যা পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত সংঘর্ষ থেকে শুরু করে ভারতের বৃহত্তর প্রতিবেশী অঞ্চল পর্যন্ত সবকিছুকে আওতায় আনে। এ ছাড়া রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোসের মতো শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ভারতের রয়েছে, যার পাল্লা ৫০০ কিলোমিটার (৩১১ মাইল) পর্যন্ত এবং যা গত বছর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল।
ভারতের অস্ত্র রফতানি
ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার সামরিক রফতানি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে, যা ২০১৪-১৫ সালে যখন মোদি ক্ষমতায় আসেন তখন ৭২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫-২০১৬ সালে ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আদানি ডিফেন্স, ইসরায়েলের বৃহত্তম অস্ত্র প্রস্তুতকারক এলবিট সিস্টেমসের সাথে অংশীদারিত্বে, বৃহৎ হার্মিস ৯০০ সশস্ত্র ড্রোন সিস্টেম তৈরি করে। আল জাজিরার একটি অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয় যে, মোদি সরকার যখন গাজায় যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রকাশ্যে কূটনীতির আহ্বান জানাচ্ছিল, তখনো ভারত ইসরাইলে রকেটের যন্ত্রাংশ এবং গোলাবারুদ রফতানি করছিল। গত জুনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি প্রতিবেদনে বলে যে, ইসরাইলে ভারতের অস্ত্র রফতানি গাজার গণহত্যায় দেশটিকে সহযোগী করে তুলেছে।