অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চুক্তি খতিয়ে দেখা দরকার

ট্রানজিশন টিম গঠনের পরামর্শ : ড. দেবপ্রিয়র

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে একটু ‘দম’ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, এই মুহূর্তে জনতুষ্টিবাদী কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নেই। সরকারের উচিত জনগণকে বলা, আগামী অর্থবছরের আগে তোমাদের কিছু দিতে পারবো না। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে আমাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কাজ শুরু করবো। এ ছাড়া তিনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশের সাথে যেসব জানা-অজানা চুক্তি করেছে সেগুলো খতিয়ে দেখা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের পরিকল্পনার সাথে সেসব সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটা যাচাই করা দরকার। তার মতে, নতুন সরকার যদি এলডিসি উত্তরণ পেছাতে উদ্যোগী হতে পারে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা সিদ্ধান্তও খতিয়ে দেখতে পারে। এজন্য নতুন সরকারকে একটি ‘ট্রানজিশন টিম’ গঠনের পরামর্শও দেন তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু : অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বিএনপি সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনি কৃচ্ছ্রতা না করেন, সংযম দেখাতে হবে। যদি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কৃচ্ছ্রতা না দেখান, সংযম না দেখান তাহলে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে অন্যান্য অসুবিধাগুলো খুবই পরিষ্কারভাবে ভাগ হয়ে যাবে।’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। আরো উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসাবে ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে দেখছে নাগরিক প্লাটফর্ম। একই সাথে কার্ড নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে তাড়াহুড়ো না করারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সরকারের একটা ট্রানজিশন টিম বা উত্তরণকালীন দল গঠন করা উচিত জানিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এক সরকার থেকে আরেক সরকারে যায়; তখন আগের সরকার কী রেখে যাচ্ছে, কী দিয়ে যাচ্ছে, কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়বে সেগুলো এ দল স্বচ্ছতার সাথে মূল্যায়ন করে। আগের সরকারের কার্যক্রমের ময়নাতদন্ত (ফরেনসিক) করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ দল প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয়ের জন্য একটা ব্রিফিং ডকুমেন্টস করতে পারে। এটা অনেকটা গাড়ির ‘ব্লু’ বুকের মতো। এখানে প্রতি মন্ত্রণালয়ের হালহলিকত জানা যাবে।’

ট্রানজিশন টিমের কাজ প্রসঙ্গে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক বলেন, ‘ডকুমেন্টসে দায়-দেনা পরিস্থিতি, বিগত সরকার যে সমস্ত ক্রয় চুক্তি করে গেছে সেগুলোকে আরো ভালো করে পর্যালোচনা করে দেখা উচিত যে এ চুক্তিতে কোনো নিয়মনীতির ব্যতয় ঘটেছে কি না। বিগত সরকার যাওয়ার আগে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করেছে। সে সমস্ত বৈদেশিক চুক্তি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হয়নি, শুধু আমাদের বন্দর দিয়ে দেয়ার জন্য হয়নি, আরো অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়েছে যেগুলো হয়তো আমরা অবহিত না।’

বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এ সমস্ত বৈদেশিক চুক্তিকেও আবার পুনরায় বিবেচনা করা উচিত, যাতে নতুন সরকারের কাছে এর কী ধরনের দায়-দায়িত্ব বর্তায়; যেহেতু এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনকে পুনঃমূল্যায়ন করতে রাজি আছেন। তাহলে সেগুলো পুনরায় বিবেচনার ভেতরে নিয়ে আসতে হবে বলে আমরা মনে করি। ট্রানজিশন দল যদি এ ময়নাতদন্তগুলো করে যেতে পারে, তাহলে অন্য অনেক কাজ সরকার করে যেতে পারবে।’

সরকারের সামনে ১০ চ্যালেঞ্জ

মূল প্রবন্ধে নতুন সরকারের ১০টি চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। যার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, গ্রামীণ পঁাঁচ মিলিয়ন পরিবারকে মাসে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পঁাঁচ মিলিয়ন পরিবারকে এ সহায়তার আওতায় আনতে বছরে আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে, যা জিডিপির প্রায় ০.১৫ থেকে ০.২০ শতাংশের সমান। এ কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে সর্বজনীন মৌলিক আয় বাস্তবায়নের একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি করতে পারে। তবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা। এর পাশাপাশি উপকারভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রচলিত প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কার্ড দেয়ার ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক সূচক রয়েছে, সেটা অনুসরণ করে এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে যদি দেয়া হয় তাহলে প্রকৃত বঞ্চিতরা সুবিধাভোগী হবে এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, নির্বাচনের আগে দিলে একদিকে কার্ড নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশঙ্কা বেশি থাকবে, অন্য দিকে কার্ড নির্ধারণের জন্য প্রকৃত ডাটার ঘাটতি থাকতে পারে। সেজন্য একটু সময় দিয়ে দিলে প্রকৃতভাবে যারা পাওয়ার যোগ্য তারা পাবেন।

অন্য দিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। এ অবস্থান থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে হলে ডলার ভিত্তিতে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হলেও এটি নির্বাচনী অঙ্গীকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান উদ্যোগের তুলনায় বেশি আগ্রাসী।

অন্য দিকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও এ লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম শর্ত। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ছয় দশমিক আট শতাংশ। ২০২৬ সালের জন্য আট দশমিক তিন শতাংশ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন করা কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্রগতি ধরলেও প্রতি বছর প্রায় ০ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট করে উন্নতি প্রয়োজন, যাতে ২০৩১ সালে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১১ দশমিক পাঁচ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে সংস্কারভিত্তিক পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে স্বল্পমেয়াদে জিডিপির অতিরিক্ত দুই শতাংশ সমপরিমাণ রাজস্ব অর্জন সম্ভব, যা ২০৩১ সালে কর-জিডিপি অনুপাতকে ১৩ দশমিক তিন শতাংশে উন্নীত করতে সহায়ক হতে পারে। সামগ্রিকভাবে আগামী পাঁচ বছরে বছরে গড়ে প্রায় এক দশমিক ২৫ শতাংশ পয়েন্ট হারে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।