বিকল্প কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে অবস্থান পাকাপোক্ত করতে চাইছে ১১দল
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
Printed Edition
আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জোটে সর্বসম্মতিক্রমে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব:) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যেও এ নির্বাচনে একক প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা কেবল একটি নিয়মমাফিক অংশগ্রহণ হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে বিরোধী শক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন ও জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের নতুন রসায়নের প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১১ দলীয় জোটের সর্বসম্মতিক্রমে প্রার্থী নির্বাচন : গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে কর্নেল (অব:) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং বহুদলীয় রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা হিসেবে অলি আহমদকে বেছে নেয়ার পেছনে জোটের কৌশলগত লক্ষ্য স্পষ্ট। জামায়াতসহ জোটের ইসলামপন্থী ও সংস্কারবাদী শক্তিগুলো এমন এক ব্যক্তিত্বকে সামনে এনেছে, যিনি একই সাথে জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতিতে সুপরিচিত এবং বিরোধী বলয়ে সর্বজনগ্রাহ্য গ্রহণযোগ্যতা রাখেন।
সংসদীয় ভোটের গাণিতিক সমীকরণ : সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। চট্টগ্রাম-৪ আসনের জয়ী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় সংসদের মোট ৩৪৯ আসনের মধ্যে সরকারি দল বিএনপি জোটের আসন রয়েছে ২৪৪টি। বিপরীত দিকে বিরোধী ১১ দলীয় ঐক্যের আসন সংখ্যা রয়েছে ৯০টি। এ ছাড়া আরো কয়েকজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন। এ জন্য গাণিতিক ফলাফলের বিচারে বিরোধী প্রার্থী জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্ত রাজনীতির মাঠকে বার্তা দিচ্ছে যে, সংসদে একটি সুসংগঠিত দ্বিতীয় রাজনৈতিক শক্তি বিদ্যমান।
বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের সাম্প্রতিক রসায়ন ও নতুন মেরুকরণ : দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সম্প্রতি যে কৌশলগত দূরত্ব তৈরি হয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই ফাটলকে আরো স্পষ্ট করে তুলল।
বিকল্প বলয় প্রতিষ্ঠা : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই জামায়াত নিজেদের একক বা ইসলামপন্থী-সংস্কারবাদী অক্ষের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। বিএনপি এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত এমন ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ১১ দলীয় জোটে সর্বসম্মত প্রার্থী দিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র বিরোধী অবস্থান দৃশ্যমান করা হয়েছে।
ভোটের রাজনীতিতে দরকষাকষি : একক রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর সমর্থনে নিজেদের সংসদীয় শক্তি প্রদর্শন করে জামায়াত জাতীয় রাজনীতির মূলধারায় বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিকল্প কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে চাইছে, যা তাদের এই একক প্রার্থী বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখতে এই প্রার্থী ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জোটভুক্ত প্রতিটি দল ঐক্যবদ্ধভাবে এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমরা আনন্দিত আমাদের বিবেচনায় সবচেয়ে যোগ্য একজনকে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য মনোনীত করেছি। ১১ দলের পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে মনোনীত করেছি। তিনি জুলাইয়ের চেতনার একজন বলিষ্ঠ ধারক। আমরা আশা করব, ১১ দলের বাইরেও যারা দেশকে ভালোবাসেন তারাও তাকে বিবেচনা করবেন। আমরা প্রত্যাশা রাখি তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের সফল নেতৃত্ব দেবেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তা আমাদের কাছে মুখ্য নয়। আমরা একজন যোগ্য ও প্রবীণ প্রার্থীকে জাতির সামনে তুলে ধরেছি, যাকে দেশবাসী তাদের অভিভাবক হিসেবে দেখতে চায়। এটি আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদেরই অংশ।
রাজনৈতিক প্রভাব : রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই অংশগ্রহণ জামায়াত ও তার শরিকদের জন্য একটি দূরদর্শী রাজনৈতিক চাল। এক দিকে এটি সরকারি দলের একক আধিপত্যের মুখে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বিরোধিতার নজির স্থাপন করে, অন্য দিকে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের মধ্যকার চিরাচরিত ‘সহযোগী’ ভাবমর্যাদা ভেঙে জামায়াতকে একটি স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ সমীকরণে এই মেরুকরণের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে।