পুলিশের শৈথিল্যে বাড়ছে গুলি, খুন ও ছিনতাই
Printed Edition
- মে মাসে সারা দেশে মামলা ১৮ হাজার ১৪৯
- খুনের মামলা ৩১০
- নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১ হাজার ৯৫২
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সাথে পাল্লা দিয়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে খুন, জখম, অপহরণ, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, জনসমক্ষে ছিনতাই এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। এসব অপরাধ এখন শুধু পেশাদার অপরাধী বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতও অনেক ক্ষেত্রে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে খুন হয়েছেন এক হাজার ৪৪৪ জন। এর মধ্যে শুধু মে মাসেই খুনের মামলা হয়েছে ৩১০টি। একই মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে এক হাজার ৯৫২টি এবং সারা দেশের থানাগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে মোট ১৮ হাজার ১৪৯টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, প্রায় সব ধরনের অপরাধীই এখন আগের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। প্রকাশ্যে হত্যা বা গুরুতর জখম করতেও তারা দ্বিধা করছে না। এমনকি আসামি গ্রেফতারে গিয়ে পুলিশ সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। ফলে রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, মাঠপর্যায়ে কিছু আসামি গ্রেফতার হলেও পেশাদার অপরাধী চক্রের অনেক সদস্য পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আবার জামিনে মুক্ত হয়ে অনেক আসামি পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, পুলিশের মধ্যে এক ধরনের শৈথিল্য ও নিষ্ক্রিয়তা দেখা দেয়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাটতি রয়েছে।
সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ঘটনা গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত না হলে অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তা চোখে পড়ে না। ফলে তালিকাভুক্ত অপরাধী চক্রগুলো ধারাবাহিকভাবে অপরাধ সংঘটনের সুযোগ পাচ্ছে। অনেক ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। কারণ, তারা প্রায়ই দেশের বাইরে অবস্থান করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আদালতে উপস্থাপনের মতো পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা যায় না। ফলে মাঠপর্যায়ের অপরাধীরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যায় আড়ালে।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৪৩৭টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে সাত হাজার ৯১০টি। একই সময়ে দায়িত্ব পালনকালে ২৬৮ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫৫ জন এবং আহত হয়েছেন দুই হাজার ৬৩৬ জন। একই সময়ে নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩৯ জন। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৬৮ জন। এ ছাড়া ধর্ষণের ২৭১টি, ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট হত্যার ২৮টি এবং ধর্ষণ চেষ্টার ৮৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, সমাজে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্য বা দুর্বল তৎপরতার বিষয়টি সামনে এলেও এর সাথে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারও সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অপরাধীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এ সময় পুলিশও একটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব পালন করেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব তাদের কার্যক্রমে পড়েছে।
তিনি আরো বলেন, দেশে এখন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তাই অপরাধ দমনে পুলিশকে আরো দৃঢ় ও পেশাদার ভূমিকা নিতে হবে। আইনের সীমার মধ্যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, তদারকি বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিত এবং মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব জোরদার করতে হবে। পেশাদার অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দেশে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনিতে হত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। একটি নির্দিষ্ট প্রান্তিক সময়ে সারা দেশে ৮৯টি মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে নিরপরাধ পথচারী ও মানসিক প্রতিবন্ধীরাও রেহাই পাননি। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ধর্ষণের ৪৪১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটির (বিসিআরএস) অপরাধ পর্যবেক্ষণ সেল এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর যৌথ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে এক হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ৩৪৭টি অপহরণ, ৫৯১টি সশস্ত্র ডাকাতি এবং ২৯৪টি ছিনতাইয়ের ঘটনা থানায় নথিভুক্ত হয়েছে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একই সময়ে চুরির ঘটনা ঘটেছে দুই হাজার ২১৪টি। তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশি হয়রানি ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার আশঙ্কায় চুরি ও ছিনতাইয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ভুক্তভোগী থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন না। ফলে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ভুয়া আইডি থেকে গুজব ও উসকানিমূলক পোস্ট মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বাস্তবে সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে। পাশাপাশি নারীদের লক্ষ্য করে আপত্তিকর ছবি ছড়িয়ে দেয়া, ব্ল্যাকমেইল এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উসকানিমূলক প্রচারণাও বেড়েছে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করতেও দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে থাকায় বড় ধরনের অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে।
তাদের ভাষ্য, পুলিশের চেইন অব কমান্ড এবং মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যেও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও নিষ্ক্রিয়তা কাজ করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের খবর পেয়েও সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না, যা অপরাধীদের আরো উৎসাহিত করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, জনগণের বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অপরাধ দমনে ঢাকাসহ সব বিভাগের রেঞ্জ ডিআইজি ও মহানগর পুলিশ কমিশনারদের কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যাতে কোনো অবস্থাতেই অপরাধ বৃদ্ধি না পায়। তিনি বলেন, ‘পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবন দিয়েও দায়িত্ব পালন করবে।’