গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরাইলি হামলায় ৫ শিশুসহ নিহত ১৪

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • চিকিৎসার অভাবে গাজায় ক্যান্সার রোগীদের নীরব মৃত্যু

  • গাজায় যুদ্ধপরবর্তী শান্তিপ্রক্রিয়ায় নতুন বোর্ড

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার তিন মাস পরও গাজা উপত্যকাজুড়ে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচটি শিশু রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো গাজার বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর, স্কুল ও বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে হামলা চালানো হয়। উত্তর গাজায় আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তরিত স্কুল এবং মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবির ও গাজা সিটির আবাসিক এলাকাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়েছে।

ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান এবং অবরোধ শিথিল করা। তবে ফিলিস্তিনি সূত্র জানায়, গত তিন মাসে ইসরাইল প্রায় এক হাজারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে, যাতে অন্তত ৪২৫ জন নিহত হয়েছেন। একই সাথে সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ রেখে মানবিক সহায়তা প্রবেশেও কড়াকড়ি বজায় রাখা হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা আনরওয়ার প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বলেন, গাজায় সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তার ভাষায়, মানুষ এখনো অস্থায়ী ও অনিরাপদ আশ্রয়ে বসবাস করছে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মারাত্মক সঙ্কট রয়েছে।

হামাস বৃহস্পতিবারের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের জন্য দায়ী করেছে এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, গাজা থেকে ছোড়া একটি প্রজেক্টাইল ব্যর্থ হয়ে ভেতরেই পড়ে যায়, এর প্রতিক্রিয়ায় তারা হামলা চালিয়েছে।

হামলায় নিহতদের মধ্যে ১১ বছর বয়সী হামসা নিদাল হাওসোর মৃত্যু গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। তার এক স্বজন প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি থাকলে কেন শিশুরা নিরাপদ নয়?’

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৭১ হাজার ৩৯৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি শিশু।

ক্যান্সার রোগীদের নীরব মৃত্যু : ইসরাইলি অবরোধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধার কারণে গাজায় ক্যান্সার রোগীরা চিকিৎসা ছাড়াই মৃত্যুর মুখে পড়ছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর হার তিনগুণ বেড়েছে।

ছয় বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হানি নাইম চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমোদন পেলেও গাজা ছাড়তে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আগে পশ্চিমতীর ও জেরুসালেমে চিকিৎসা নিতাম। এখন গাজায় কোনো চিকিৎসাই নেই। রেডিওথেরাপি পুরোপুরি বন্ধ।’

বর্তমানে গাজায় অন্তত ১১ হাজার ক্যান্সার রোগী আটকে আছেন। একসময় ক্যান্সার চিকিৎসার একমাত্র কেন্দ্র তুর্কি-ফিলিস্তিনি ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালটি যুদ্ধের সময় সামরিক স্থাপনায় পরিণত করে পরে ধ্বংস করা হয় বলে জানানো হয়েছে।

গাজা ক্যান্সার সেন্টারের মেডিক্যাল ডিরেক্টর মোহাম্মদ আবু নাদা বলেন, ‘আমরা সবকিছু হারিয়েছি, যন্ত্রপাতি নেই, কেমোথেরাপি নেই, রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থাও নেই।’

তিনি জানান, যুদ্ধবিরতির পর কিছু বাণিজ্যিক পণ্য ঢুকলেও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ঢোকেনি। ‘চকোলেট এসেছে, কিন্তু ক্যান্সারের ওষুধ আসেনি,’ বলেন তিনি।

খান ইউনিস এলাকায় প্রতিদিন দুই থেকে তিনজন ক্যান্সার রোগী মারা যাচ্ছেন বলে জানান আবু নাদা। তার ভাষায়, ‘ডাক্তারদের হাতে কিছু নেই। আমরা শুধু বসে রোগীর পাশে কাঁদি।’

মিসরীয় নৌযানে ইসরাইলি গুলি : গাজা উপকূলবর্তী জলসীমায় প্রবেশের পর একটি মিসরীয় নৌযানের দিকে গুলি চালিয়েছে ইসরাইলের নৌবাহিনী। ইসরাইলের হিব্রু ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল ১৩ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজা সংলগ্ন যে সামুদ্রিক এলাকা ইসরাইল নিষিদ্ধ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে, সেখানে মিসরীয় যুদ্ধজাহাজটি প্রবেশ করলে এই ঘটনা ঘটে।

চ্যানেল ১৩-এর তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি সিনাই উপদ্বীপ থেকে যাত্রা করে ইসরাইলি নৌ অবরোধাধীন এলাকায় ঢুকে পড়ে। বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর আশদোদ নৌঘাঁটি থেকে ইসরাইলি যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয় এবং মিসরীয় নৌযানটিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে জাহাজটি গাজার দিকে অগ্রসর হতে থাকলে ইসরাইলি নৌবাহিনী সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে।

গুলির পর মিসরীয় নৌযানটি দিক পরিবর্তন করে মিসরের আঞ্চলিক জলসীমায় ফিরে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরাইলি সেনা সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় মিসর দায় স্বীকার করেছে এবং ঘটনার জন্য তারা দায়িত্ব নিয়েছে।

গাজা যুদ্ধ ও চলমান নৌ অবরোধের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবু সীমান্ত ও জলসীমা ঘিরে পরিস্থিতি আরো সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।

শান্তিপ্রক্রিয়ায় নতুন বোর্ড : গাজায় চলমান যুদ্ধ ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনায় নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, সাবেক জাতিসঙ্ঘ মধ্যপ্রাচ্য দূত ও বুলগেরীয় কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভকে ‘বোর্ড অব পিস’-এর মহাপরিচালক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। এই বোর্ডের দায়িত্ব হবে গাজায় শান্তিপ্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন তদারক করা।

জেরুসালেমে ম্লাদেনভের সাথে বৈঠকের পর নেতানিয়াহু এ ঘোষণা দেন। যদিও এখনো ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন আসেনি, তবে একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে বোর্ডের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ম্লাদেনভই ট্রাম্প প্রশাসনের পছন্দ।

এই বোর্ডের আওতায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, একটি প্রযুক্তিনির্ভর ফিলিস্তিনি সরকার গঠন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার পুনর্গঠন অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা। ম্লাদেনভ ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি দূত ছিলেন এবং সে সময় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

এদিকে অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি হামলায় শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মানবিক সঙ্কট ও শান্তিপ্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।