শূন্য ফিতে ডিজিটাল লেনদেনে বড় ঝুঁকি
বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়লেও ভুয়া লেনদেনের আশঙ্কা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
ডিজিটাল লেনদেনকে আরো জনপ্রিয় ও সহজ করতে দেশে চালু করা হয়েছে ‘বাংলা কিউআর’। গ্রাহকের হাতে থাকা ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাপ দিয়ে দোকানির কিউআর কোড স্ক্যান করে সরাসরি অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এ ব্যবস্থাকে টেকসই করার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যে আন্তঃবিনিময় ফি বা আইআরএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, সেটি শূন্য করে দেয়ার সিদ্ধান্তে পুরো ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা গত ১০ আগস্টের সার্কুলার লেটার নং-০৬ অনুযায়ী, বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনে আইআরএফের হার শূন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহক যে প্রতিষ্ঠান বা অ্যাপ ব্যবহার করে লেনদেন করবেন এবং যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা কিউআর স্থাপন করেছে- এই দুই পক্ষের মধ্যে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান লেনদেনের ক্ষেত্রে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে লেনদেন বাবদ কোনো ফি দিতে পারবে না। নির্দেশনাটি আগামী ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তাদের দাবি, এ সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়বে ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। কারণ একটি কিউআর লেনদেনের পেছনে প্রযুক্তি, এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউশন, মোবাইল নেটওয়ার্ক, গ্রাহকসেবা ও লেনদেন নিষ্পত্তিসহ একাধিক ব্যয় রয়েছে। আইআরএফ পুরোপুরি তুলে দিলে এসব ব্যয়ের একটি অংশ বহন করার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
ক্যাশ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের খরচ কে দেবে?
বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের বড় অংশই এমএফএস-নির্ভর। নগদ টাকা ডিজিটাল ব্যালান্সে রূপান্তর, অর্থাৎ ক্যাশ ইন, আবার ডিজিটাল টাকা নগদে রূপান্তর, অর্থাৎ ক্যাশ আউট- এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক জড়িত। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনার খরচ বিভিন্ন ফি, কমিশন ও মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেটের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়।
শূন্য আইআরএফ ব্যবস্থায় এই আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। খাতসংশ্লিষ্টদের একটি হিসাব অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার টাকার লেনদেনে সরকারের ভ্যাট বাবদ রাজস্বের একটি অংশ কমে যেতে পারে। একই সাথে ক্যাশ ইন সেবায় এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর, মোবাইল অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর খরচ বহন করতে এমএফএস প্ল্যাটফর্মকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতে পারে। তাদের হিসাবে, প্রতি এক হাজার টাকা ক্যাশ ইন-এর ক্ষেত্রে ভর্তুকির পরিমাণ ৬.৪০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে- ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করতে গিয়ে যদি বিদ্যমান সেবা কাঠামোর আর্থিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর খরচ শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে?
ভুয়া ডিজিটাল লেনদেনের ঝুঁকি
শুধু ব্যয়ের বিষয় নয়, বাংলা কিউআর ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে এমএফএস এজেন্টরা গ্রাহককে বৈধ ক্যাশ আউট না দিয়ে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে অর্থ নেয়ার সুযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু ওই লেনদেনের বিপরীতে প্রকৃত কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি হচ্ছে না। অর্থাৎ কাগজে-কলমে এটি একটি ডিজিটাল পেমেন্ট হলেও বাস্তবে তা নগদ অর্থ উত্তোলনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে দেশের ডিজিটাল লেনদেনের পরিসংখ্যান ফুলে উঠলেও প্রকৃত অর্থে পণ্য ও সেবার বিপরীতে ডিজিটাল পেমেন্টের পরিমাণ সঠিকভাবে প্রতিফলিত না-ও হতে পারে। আইআরএফ শূন্য হলে এ ধরনের প্রবণতা আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কারণ প্রকৃত ব্যবসায়িক লেনদেন ছাড়াই কিউআর ব্যবহারের মাধ্যমে নগদ অর্থের প্রয়োজন মেটানোর প্রবণতা তৈরি হলে বাংলা কিউআর তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হতে পারে।
ঝুঁকিতে ২৪ লাখ এজেন্ট
এমএফএস ইকোসিস্টেমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দেশব্যাপী বিস্তৃত এজেন্ট নেটওয়ার্ক। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউটসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবা দিতে প্রায় ২৪ লাখ এজেন্ট সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। এই নেটওয়ার্ক শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ব্যাংকিংয়ের বিকল্প সেবা পৌঁছে দিয়েছে। অন্য দিকে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ স্মার্টফোনের পরিবর্তে সাধারণ ফিচার ফোন ব্যবহার করেন এবং ইউএসএসডি ও এজেন্ট-নির্ভর সেবা গ্রহণ করেন। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এ ধরনের গ্রাহকের অংশ প্রায় ৩৫ শতাংশ। ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের নতুন মডেল তৈরি করতে গিয়ে এজেন্টভিত্তিক পুরনো কিন্তু কার্যকর ইকোসিস্টেম দুর্বল হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত চাপ পড়তে পারে গ্রাহকের ওপর
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, পরিচালন ব্যয় সমন্বয় করতে গিয়ে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে ক্যাশ ইন সেবায় নতুন চার্জ আরোপের পথে যেতে পারে। এতে এক দিকে সরকারের রাজস্ব কমবে, অন্য দিকে সাধারণ গ্রাহকের লেনদেনের খরচ বাড়তে পারে। গত দেড় দশকে এমএফএস দেশের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের অংশ হয়ে উঠেছে। বেতন, রেমিট্যান্স, বিল পরিশোধ, কেনাকাটা, টাকা পাঠানো থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসার লেনদেন- সব ক্ষেত্রেই এ ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। তাই বাংলা কিউআর সম্প্রসারণের নামে যদি এমএফএসের ভিত্তিগত ইকোসিস্টেমে চাপ তৈরি হয়, তার প্রভাব শুধু একটি সেবায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতেও পড়তে পারে।
প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি
ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে কোনো সেবাকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি সেটিকে আর্থিকভাবে টেকসই রাখাও জরুরি। বাংলা কিউআর পুরো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সাথে আন্তঃসংযুক্ত হওয়ায় এখানে একতরফাভাবে ফি শূন্য করার পরিবর্তে বাস্তব পরিচালন ব্যয়, এজেন্ট কমিশন, প্রযুক্তি ব্যয়, ভ্যাট ও গ্রাহকের সক্ষমতা বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। একই সাথে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে প্রকৃত পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই লেনদেন দেখানোর প্রবণতা বন্ধে কঠোর নজরদারি দরকার। অন্যথায় ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার প্রতিফলন কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাশ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও বিকল্পহীন না হওয়া পর্যন্ত এমএফএস এজেন্ট নেটওয়ার্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে কোনো নতুন পেমেন্ট মডেল টেকসই করা যাবে না। তাই ওজঋ শূন্য করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগে এর আর্থিক প্রভাব, রাজস্ব ক্ষতি, এজেন্ট নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। অন্যথায় ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগই উল্টো দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত আর্থিক সেবা ইকোসিস্টেমকে দুর্বল করে দিতে পারে।