জ্বালানি তেল কেনায় দরকষাকষি, এলএনজি কেনায় সরাসরি
প্রশ্ন উঠেছে স্বচ্ছতা নিয়ে
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ডিজেল, জেট এ-১ ও ফার্নেস অয়েল কেনার প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন না দিয়ে দরদাতাদের সাথে আবার দরকষাকষির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে টোটাল এনার্জিসের কাছ থেকে সরাসরি এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এলএনজির দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের জেকেএম মূল্যের সাথে প্রতি ইউনিটে দশমিক শূন্য ছয় মার্কিন ডলার যোগ করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৈঠকে টোটাল এনার্জিসের কাছ থেকে সরাসরি এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যসূচক জেকেএমের সাথে দশমিক শূন্য ছয় ডলার যোগ করে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম নির্ধারণ করা হবে।
এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সাথে কেন অতিরিক্ত মূল্য যোগ করা হচ্ছে এবং এই প্রিমিয়াম নির্ধারণের ভিত্তি কী- সেটি কতটা স্বচ্ছ? বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ওঠানামার মধ্যে নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম যুক্ত করে সরাসরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারের দরকষাকষির সুযোগ কতটা থাকছে, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
অন্যদিকে ডিজেল, জেট এ-১ ও ফার্নেস অয়েল কেনার ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি প্রস্তাবিত দর মেনে নেয়নি। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে পাঁচটি প্যাকেজে এসব জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়। পাঁচটি প্যাকেজের সম্ভাব্য মোট ক্রয়মূল্য প্রায় ১১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা।
পিজি-০১ প্যাকেজে দুই লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেল এবং ৫০ হাজার টন জেট এ-১ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য ব্যয় চার হাজার ৮০৩ কোটি দুই লাখ টাকা। এ প্যাকেজে ট্রাফিগুরা প্রাইভেট লিমিটেডকে সুপারিশ করা হয়েছে।
পিজি-০২ প্যাকেজে দুই লাখ থেকে দুই লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল এবং ৪০ হাজার টন জেট এ-১ কেনার প্রস্তাব রয়েছে। সম্ভাব্য ব্যয় চার হাজার ৩২৬ কোটি ৮৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ প্যাকেজে ভিটল এশিয়া প্রাইভেট লিমিটেডকে সুপারিশ করা হয়েছে।
পিজি-০৩ প্যাকেজে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টন ডিজেল কেনার প্রস্তাব রয়েছে। সম্ভাব্য ব্যয় ৭৯২ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডকে সুপারিশ করা হয়েছে।
পিজি-০৪ প্যাকেজে ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টন ডিজেল কেনার সম্ভাব্য ব্যয় এক হাজার ১৮৯ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এখানেও সুপারিশ করা হয়েছে ভিটল এশিয়াকে।
আর পিজি-০৫ প্যাকেজে ৭৫ হাজার থেকে এক লাখ টন ফার্নেস অয়েল কেনার প্রস্তাব রয়েছে। সম্ভাব্য ব্যয় ৮০১ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ প্যাকেজে ট্রাফিগুরা প্রাইভেট লিমিটেডকে সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে পাঁচটি প্যাকেজের কোনোটিই চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। সুপারিশকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত মূল্য ও ভিত্তিমূল্য নিয়ে আলোচনা করে দর পুনর্নির্ধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আলোচনা শেষে পাওয়া দর পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের আর্থিক গুরুত্বও কম নয়। পাঁচটি প্যাকেজে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ দর-কষাকষির মাধ্যমে প্রতি টনে সামান্য পরিমাণ অর্থও কমানো গেলে মোট ব্যয়ে বড় ধরনের সাশ্রয় হতে পারে। বিশেষ করে ডিজেল ও জেট এ-১-এর মতো বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর, প্রিমিয়াম, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য চার্জের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এলএনজির ক্ষেত্রেও কি একইভাবে একাধিক উৎসের দর তুলনা করে সর্বনি¤œ যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করা হচ্ছে?
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় এলএনজির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব না হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে এলএনজির আন্তর্জাতিক দামে সামান্য পরিবর্তনও বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।