টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, প্লাবিত পাহাড়ি জনপদ
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ট্রেন চলাচল বন্ধ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরী, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও মিরসরাইয়ে লাখো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন; প্রাণহানি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং শিক্ষা কার্যক্রমেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। ‘
চট্টগ্রাম মহানগরীর বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল টানা বৃষ্টিতে এখনো হাঁটু থেকে কোমরসমান পানির নিচে। নগরীর আগ্রাবাদ, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, চান্দগাঁও, হালিশহর, বাকলিয়াসহ বহু এলাকায় ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। পৃথক পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর আরো ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ধসের সতর্কতা দিয়েছে। একই সাথে রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে এবং যাত্রীদের টিকিটের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে। এ দিকে দীর্ঘ দিন ধরে চলমান ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও নগরীতে বারবার জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ সংবাদদাতা জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় ব্যক্তিগত যানবাহন ও গণপরিবহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় কর্মজীবী মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। নিচু এলাকায় জমে থাকা পানির কারণে দোকানপাট, গুদাম ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালামাল নষ্ট হয়েছে। পানিবন্দী পরিবারের অনেকেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ বাড়ির দ্বিতীয় তলা কিংবা উঁচু স্থানে অবস্থান করছেন। অনেক এলাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ায় শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এ দিকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি কমেছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক এলাকায় মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবাও বিঘিœত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নগরীর হাসপাতালগুলোতেও রোগী ও স্বজনদের যাতায়াতে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
কক্সবাজার অফিস জানিয়েছে, টানা বৃষ্টিতে জেলার অন্তত ২০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে। ভারী বর্ষণের কারণে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। পাহাড়ধসের আশঙ্কায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হচ্ছে। গত তিন দিনে পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে জেলায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলে প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বারবার অনুরোধ করছে। বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুদের কথাও জানিয়েছে প্রশাসন। দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাঘাইছড়িতে কাচালং নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে এবং সাজেকে প্রায় ৬ শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন। অন্য দিকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট একযোগে চালু হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে ১৪৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে প্রশাসন অনুরোধ জানাচ্ছে।
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানিয়েছে, টানা চার দিনের বৃষ্টিতে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহনেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। দুর্যোগের কারণে আজ বৃহস্পতিবারও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ও পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রশাসন পানিবন্দী মানুষের তালিকা তৈরি এবং ত্রাণসহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে।
এ দিকে কৃষি খাতে টানা বর্ষণের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। মাঠে জমে থাকা পানির কারণে আউশ, আমনের বীজতলা ও মৌসুমি সবজির ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।