যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত, শিশুসহ নিহত ৩
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ভবন ধ্বংস, ইসরাইলি সেনার ভিডিও প্রকাশ
- ট্রাম্প-কুশনারের পুনর্গঠন পরিকল্পনার আড়ালে গাজায় মানবিক বিপর্যয় ও স্বাস্থ্যসঙ্কট
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী। এতে দুই শিশুসহ তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ড্রোন হামলা ও গুলিবর্ষণের এসব ঘটনায় আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে চিকিৎসা সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। খবর আনাদোলু এজেন্সির ।
এক চিকিৎসা সূত্র জানায়, বেইত লাহিয়ার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের কাছে আল-জাওয়ারা পরিবারের দুই কিশোর ১৪ বছর বয়সী সালমান জাকারিয়া ও ১৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইউসুফ ইসরাইলি বোমা হামলায় নিহত হন। তারা বেইত লাহিয়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা আনাদোলুকে জানান, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইসরাইলি সেনারা যে এলাকা থেকে সরে গিয়েছিল, সেই এলাকাতেই ইসরাইলি ড্রোন হামলায় ওই দুই কিশোর প্রাণ হারায়। এর আগে উত্তর গাজার জাবালিয়া শহরের ওল্ড গাজা স্ট্রিটে ইসরাইলি হামলায় কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হন বলে অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবা বিভাগের এক সূত্র আনাদোলুকে জানিয়েছে।
অন্য এক ঘটনায় উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ার আল-সালাতিন এলাকায় ইসরাইলি গুলিতে এক ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে। এদিকে খান ইউনিসের দক্ষিণে কিজান আল-নাজ্জার এলাকায় ইসরাইলি হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ ছাড়া শনিবার সকালে দক্ষিণ গাজার মধ্যাঞ্চলীয় খান ইউনিসে ইসরাইলি গুলিতে এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তির মাথায় আঘাত লাগে বলে একটি চিকিৎসা সূত্র জানায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শহরের কেন্দ্রস্থলে জাসের বিল্ডিং মোড়ে একটি ইসরাইলি কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে গুলি চালানোর পর এই ঘটনা ঘটে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় চালানো ভয়াবহ আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। নিহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এই অভিযানে আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ এবং গাজা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরাইল এখনা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এসব হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৮১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরো এক হাজার ৩১৩ জন আহত হয়েছেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি গুলিতে ফিলিস্তিনি নিহত, আটক অন্তত ১১
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং অন্তত ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। রোববার এসব ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। খবর আনাদোলু এজেন্সির। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানায়, রামাল্লাহর উত্তরে আয়ুন আল-হারামিয়াহ এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে আম্মার হিজাজি (৩৪) নিহত হন। তিনি নাবলুসের বাসিন্দা ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গাড়ি চালানোর সময় তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়।
এদিকে হেবরনের উত্তরে আল-আররুব শরণার্থী শিবিরে অভিযান চালিয়ে চার ভাইকে আটক করে ইসরাইলি সেনারা। তুলকারেম, জেনিন ও রামাল্লাহর বিভিন্ন এলাকাতেও অভিযান চালিয়ে আরো কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরেও ইসরাইলি অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে দে-ফ্যাক্টো দখল জোরদার করা হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ভবন ধ্বংস, ইসরাইলি সেনার ভিডিও প্রকাশ
যুদ্ধবিরতির ১০০ দিনের বেশি সময় পার হলেও গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর ধ্বংসলীলা অব্যাহত রয়েছে- এমন প্রমাণ মিলেছে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে। মিডল ইস্ট আইয় এসব ভিডিও যাচাই করেছে। ভিডিওগুলো পোস্ট করেছেন ইসরাইলি এক সেনা, যেখানে উত্তর গাজার বেইত হানুন এলাকায় বাড়িঘর ধ্বংসের দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওগুলোর ক্যাপশনে ব্যবহৃত ভাষা ও প্রতীক নিয়েও সমালোচনা উঠেছে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানায়, যুদ্ধবিরতির পর থেকে অন্তত এক হাজার ৩০০ বার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে ইসরাইল। এর মধ্যে রয়েছে শতাধিক বাড়ি ধ্বংস, সাধারণ মানুষের ওপর গুলি ও অনুপ্রবেশ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন ৭১ হাজারের বেশি মানুষ এবং অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেনাদের এসব ভিডিও সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
শীতে গাজায় ১০ শিশুর মৃত্যু, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও তীব্র মানবিক সঙ্কট
গাজা উপত্যকায় শীতজনিত কারণে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ শিশু মারা গেছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ইসরাইলের আরোপিত জ্বালানি ও মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। শীতের শুরু থেকে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সর্বশেষ তিন মাস বয়সী শিশু আলি আবু জুর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় মারা গেছে। শীতের তীব্রতা, বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসরত হাজারো পরিবার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজার মানবিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। অধিকাংশ বাস্তুচ্যুত মানুষ এখনো প্লাস্টিকের তাঁবু বা আধাভাঙা ভবনের নিচে দিন কাটাচ্ছে। প্রবল বৃষ্টি ও বাতাসে বহু তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা শিশু ও বয়স্কদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, শত সহস্র মানুষ খোলা পরিবেশে শীত ও বৃষ্টির মধ্যে জীবনযাপন করছে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি, উষ্ণ পোশাক, ওষুধ ও আশ্রয় সরঞ্জাম প্রবেশে ইসরাইলের বাধার কারণে এই সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, দ্রুত সহায়তা না বাড়ালে মৃত্যুর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার ও রাফাহ খুলে দেয়ার আহ্বান মিসরের
গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে মিসর। কায়রোতে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউয়ের সাথে বৈঠকে এই দাবি তোলেন মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদুল আতি। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের। মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং গাজার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। আবতুল আতি বলেন, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন, গাজার প্রশাসনের জন্য একটি জাতীয় কমিটি গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন এখন খুবই জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গাজার মানবিক সঙ্কট মোকাবেলায় রাফাহ ক্রসিং উভয় দিক থেকে খুলে দিতে হবে এবং ইসরাইলকে গাজা থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যেতে হবে। এতে প্রাথমিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের পথ সুগম হবে। এদিকে ইসরাইলি সামরিক রেডিও জানিয়েছে, রাফাহ সীমান্ত পুনরায় চালুর বিষয়ে ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়াল্লা জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই ক্রসিংটি খুলে দেয়া হতে পারে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের আগ্রাসনে গাজায় ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও মানবিক সঙ্কট এখনো গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
ট্রাম্প-কুশনারের পুনর্গঠন পরিকল্পনার আড়ালে গাজায় মানবিক বিপর্যয় ও স্বাস্থ্য সঙ্কট
গাজা পুনর্গঠনের নামে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক এবং ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল- এমন মত উঠে এসেছে বিশ্লেষক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর ঘোষণা ও ঝকঝকে পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রকাশের দিনই গাজায় ইসরাইলি হামলায় চার ফিলিস্তিনি নিহত হন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৮০ জন। খবর আলজাজিরার।
সমালোচকদের মতে, প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় গাজাকে মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি বিনিয়োগ প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণ, অধিকার ও দীর্ঘ দিনের দখল-অবরোধের মূল সঙ্কট এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ ধরনের পরিকল্পনা গাজাকে পুনর্গঠন নয়, বরং নতুন করে নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক নজরদারির কাঠামোয় পরিণত করতে পারে। এদিকে, যুদ্ধের ফলে গাজায় ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ধ্বংস হয়ে গেছে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। গাজা সিটি কর্তৃপক্ষ জানায়, ৮৫ শতাংশ পানির কূপ ধ্বংস হয়েছে এবং সাত লাখ টনের বেশি বর্জ্য জমে রয়েছে। ফলে গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস, শ্বাসকষ্ট, হেপাটাইটিস-এসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, হাসপাতালগুলো ধারণক্ষমতার দেড়গুণ রোগীর চাপ সামলাচ্ছে এবং ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া কেবল অবকাঠামোগত পুনর্গঠন গাজার সঙ্কট কাটাতে পারবে না বলেই অভিমত সংশ্লিষ্টদের।