পুঁজিবাজারের নীতি সহায়তা সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে
পুঁজিবাজারে আসতে চায় এন পলিমার গ্রুপের সুনিভার্স ফুটওয়্যার
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য যেসব নীতি সহায়তার কথা বলা হয়েছে তা কার্যকর করা গেলে পুঁজিবাজারের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, বর্তমান সরকার এবং এর অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারের প্রতি যতটা আন্তরিক তা আগে কখনো দেখা যায়নি। অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময় পুঁজিবাজারে তাৎক্ষণিক কিছু কিছু প্রণোদনা দেয়া হলেও তা পুঁজিবাজারকে টেকসই করতে পারেনি। একটি সম্ভাবনাময় পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এর গভীরতা বৃদ্ধি তথা ভালো কোম্পানি ও ইনস্ট্রুমেন্টের তালিকাভুক্তি যাতে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। এবারের বাজেটে এর প্রতিফলন ঘটেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারই প্রথম কোনো সরকার শুধু পুঁজিবাজারের সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রীর পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়েছে যিনি প্রয়োজনে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বসে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারেন। এরই মধ্যে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি ভবনে তার জন্য অফিসকক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছে।
গত ৩০ জুন পাস হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের শেয়ারবাজারকে আরো গভীর, গতিশীল ও কার্যকর করতে একগুচ্ছ কর প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর পুঁজিাবাজারে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ প্রদানের পাশাপাশি কোম্পানি ও ব্যক্তি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর করের হার কমানোর কথা বলেছেন। পাশাপাশি মিউচ্যুয়াল ফান্ডে কর রেয়াত পাওয়ার জন্য বিদ্যমান বিনিয়োগসীমা তুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে তার ঘোষিত প্রস্তাবগুলো পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী ঘোষিত বাজেটে জিরো কুপন বন্ডের আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়াতে উল্লেখযোগ্য কর ছাড়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, যেকোনো পরিমাণ শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি আড়াই শতাংশ কর হ্রাসের সুবিধা পাবে। এ ছাড়া আইপিও, ডিরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু অথবা রিপিট পাবলিক অফারের মাধ্যমে কমপক্ষে ১০ শতাংশ শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে কেনাবেচার জন্য অফলোড করলে আরো আড়াই শতাংশ কর ছাড় দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার ডিজিটাল ও স্বচ্ছ আর্থিক লেনদেনকে উৎসাহিত করতে অর্থমন্ত্রী তালিকাভুক্ত বা অ-তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানি যদি তাদের সব ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করে, তাহলে তারা অতিরিক্ত আড়াই শতাংশ কর সুবিধা পাবে। এর ফলে যেসব তালিকাভুক্ত কোম্পানি ব্যাংকিং চ্যানেলে সব লেনদেন সম্পন্ন করবে এবং শেয়ারবাজারে ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার অফলোড করবে, তাদের করহার অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় সাড়ে সাত শতাংশ কম হবে। বর্তমানে এই ব্যবধান রয়েছে ৫ শতাংশ। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের জোগান নিশ্চিত করতে ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আসতে উৎসাহিত করাই তার সরকারের লক্ষ্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঘোষিত কর প্রণোদনাগুলো নতুন কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করবে এবং শেয়ারবাজারের ভিত্তি আরো শক্তিশালী করবে।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকে আরো আকর্ষণীয় করতে এবারে বাজেটে কোম্পানি করদাতাদের ডিভিডেন্ডের আয়ের ওপর করের হার ২০ শতাংশ এবং ব্যক্তি করদাতাদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। আগে কোম্পানিগুলোকে তাদের আয়ের ওপর সাড়ে ৩৭ শতাংশ কর দিতে হতো। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর রেয়াত পাওয়ার জন্য বর্তমানে বিদ্যমান পাঁচ লাখ টাকার বিনিয়োগসীমা তুলে দেয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা সীমাহীন বিনিয়োগের সুযোগের পাশাপাশি কর সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পাস হওয়া বাজেটে যেসব নীতি সহায়তার কথা বলা হয়েছে সে সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজেটে যেসব নীতিসহায়তার কথা বলা হয়েছে তা খুবই ইতিবাচক। এসব উদ্যোগ দেখে মনে হচ্ছে সরকার পুঁজিবাজারকে একটি ভালো অবস্থানে নিতে খুবই আগ্রহী। অর্থমন্ত্রীর কথায় পুঁজিবাজার নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিকতার প্রতিফলন দেখা যায় যা অতীতে কোনো সরকারের সময় দেখা যায়নি।
তিনি মনে করেন, এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বাড়ানো যাতে মানুষ মনে করে এখানে বিনিয়োগের সুযোগ আছে। বাজারে ভালো শেয়ার না থাকলে মানুষ বিনিয়োগ করবে কোথায়- সে দেশী হোক বা বিদেশী। এ ক্ষেত্রে সরকার তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন যাতে ভালো কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহী হয়। তা ছাড়া শিল্পায়নে ব্যাংক নির্ভরতা কমিয়ে উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারমুখী করার কথাও বলেছেন অর্থমন্ত্রী, যা খুবই ইতিবাচক।
এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের উদ্যোক্তারা তাদের আরো একটি কোম্পানি সুনিভার্স ফুটওয়্যার লিমিটেডকে পুঁজিবাজারে আনতে চায়। এই কোম্পানিটি সিনথেটিকস জুতা উৎপাদন করে থাকে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে শেয়ার ছেড়ে বাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায় এ কোম্পানি।
আইপিও প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কোম্পানিটি মার্চেন্ট ব্যাংকার লঙ্কাবাংলা ইনভেস্টমেন্টকে ইস্যু ম্যানেজার নিয়োগ করেছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠান দু’টির মধ্যে এ বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। সুনিভার্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ এবং লঙ্কাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখার আলম এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রফতানিমুখী জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালে কার্যক্রম শুরু করে। ময়মনসিংহে অবস্থিত এই কোম্পানির কারখানায় মাসে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন করা হয়। দুই লাখ ৩১ হাজার ৭১৮ বর্গফুট আয়তনের এই কারখানায় দুই হাজার ৭০০-এরও বেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন। কোম্পানিটির বার্ষিক পণ্য বিক্রির পরিমাণ ৩২৭ কোটি টাকা।
বর্তমানে কোম্পানিটির উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে সিনথেটিকস স্পোর্টস সু, অ্যাথলেটিকস সু, রানিং সু, ট্রেকিং সু, ক্যাজুয়াল সুজ, লেডিস সুজ, স্যান্ডাল, চেলসিয়া বুট ইত্যাদি।