নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা
সেপ্টেম্বরে সংলাপসহ ২৪ গুরুত্বপূর্ণ কাজকে প্রাধান্য
২৪টি গুরুত্বপূর্ণ কাজকে প্রাধান্য দিয়ে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সম্মেলন কক্ষে গতকাল নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ এ রোডম্যাপ ঘোষণা করেন।
Printed Edition
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সেপ্টেম্বর থেকে সুশীলসমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ, নির্বাচনী বিভিন্ন আইন সংশোধনসহ ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ কাজকে প্রাধান্য দিয়ে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে আরো আছে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন ও দেশী পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন চূড়ান্ত করা। এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আমাদের সামনে যে পরিস্থিতি আসবে সেটা আমরা মোকাবেলা করব, সেটিই হলো চ্যালেঞ্জ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে প্রতি মুহূর্তে কী কী চ্যালেঞ্জ আসবে, তা আমরা জানি না। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভোট, সে থেকে ৬০ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে।
আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সম্মেলন কক্ষে গতকাল নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ এ রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। এ সময় পরিচালক (জনসংযোগ) শরিফুল আলম ও সহকারী পরিচালক আসাদুল হক উপস্থিত ছিলেন। ইসি আগেই জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে। আর তফসিল ঘোষণা করা হবে চলতি বছরের ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে।
কর্মপরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ যত বিষয় : অংশীজনের সাথে সংলাপ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, নির্বাচনী আইনবিধি সংস্কার, দল নিবন্ধন, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, ভোটকেন্দ্র স্থাপন, পোস্টাল ভোটিং, পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন, দেশী-বিদেশী সাংবাদিক অনুমোদন, নির্বাচনের জন্য জনবল ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, নির্বাচনী দ্রব্যাদি সংগ্রহ, আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক কার্যক্রম, অন্যান্য আইনবিধি সংস্কার একীভূতকরণ, ম্যানুয়েল নির্দেশিকা পোস্টার পরিচয়পত্র মুদ্রণ; প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স উপযোগীকরণ, নির্বাচনী বাজেট বরাদ্দ, প্রচারণা ও উদ্বুদ্ধকরণ, টেলিযোগাযোগব্যবস্থা সুসংহতকরণ, ডিজিটাল মনিটর স্থাপন ও যন্ত্রপাতি সংযোজন, বেসরকারি প্রাথমিক ফলাফল প্রচার, ফলাফল প্রদর্শন, প্রকাশ ও প্রচার (বিভিন্ন মাধ্যমে) এবং বিবিধ।
অংশীজনদের সাথে সংলাপ : সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে সংলাপ শুরু হবে। শেষ হতে সময় লাগবে দেড় মাস। শুরু হবে সুশীলসমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে। এ ছাড়া নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নারী সমাজের প্রতিনিধি, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পর্যবেক্ষক বা পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধি, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সাথে আলোচনা হবে।
ভোটার তালিকা হালনাগাদ : এরই মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের সম্পূরক খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে; যা চূড়ান্ত করা হবে ৩১ আগস্ট। আর ৩১ অক্টোবরের সম্পূরক তালিকা শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ৩০ নভেম্বর।
ছবিসহ ভোটার তালিকা : তফসিল ঘোষণার ন্যূনতম সাত দিন আগে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ থেকে আসনভিত্তিক ছবিসহ ও ছবি ছাড়া ভোটার তালিকার সিডি বা পিডিএফ লিংক যাচাই বাছাইয়ের জন্য রেজিস্ট্রেশন অফিসারের কাছে প্রেরণ করবেন। আর তফসিল ঘোষণার ন্যূনতম তিন দিন আগে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ থেকে আসনভিত্তিক যাচাই-বাছাইকৃত ছবিসহ ও ছবি ছাড়া চূড়ান্ত ভোটার তালিকার সিডি অথবা পিডিএফের লিংক রেজিস্ট্রেশন অফিসারকে প্রেরণ করবেন। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সংখ্যক ছবিসহ ভোটার তালিকার কপি মুদ্রণের নির্দেশনা প্রদান। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক ছবিসহ ভোটার তালিকার প্রয়োজনীয় সংখ্যক কপি মুদ্রণ কাজ সম্পন্ন করা হবে।
নির্বাচনী আইনবিধি : গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), অন্যান্য আইনবিধি ৩১ আগস্টের মধ্যে সংশোধনের প্রস্তাব ও প্রণয়ন হবে। এ ছাড়া সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ আইন সংশোধন, ভোটার তালিকা আইন সংশোধন, সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা চূড়ান্ত, দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক নীতিমালা চূড়ান্ত, নির্বাচন পরিচালনা (সংশোধন) ২০২৫ প্রতীকসহ, নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ এগুলো আইন মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন; যা ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করার আশা রয়েছে।
রাজনৈতিক দল নিবন্ধন : মধ্য সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক নিবন্ধন ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন।
আসনের সীমানা নির্ধারণ : ১৫ সেপ্টেম্বর ৩০০টি আসনের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হবে আর ৩০ সেপ্টেম্বর জিআইএস ম্যাপ প্রস্তুত ও প্রকাশ।
ভোটকেন্দ্র ও ভোট কক্ষ : নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গড়ে তিন হাজার ভোটারের জন্য একটি ভোটকেন্দ্র থাকবে। গড়ে ৬০০ জন পুরুষ ভোটারের জন্য ও গড়ে ৫০০ জন মহিলা ভোটারের জন্য একটি করে কক্ষ নির্ধারণ করতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র স্থাপন নীতিমালা ২০২৫ এর ৩(১) দ্রুততম সময়ে সংশোধন করা হবে।
পোস্টাল ভোটিং ও ব্যালট : প্রকল্প অনুমোদন, সফটওয়্যার চূড়ান্ত, মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, নিবন্ধন ও ট্র্যাকিং মডিউল, প্রচারণা অক্টোবরে সম্পন্ন করা হবে। প্রবাসে নভেম্বরে ব্যালট পেপার পাঠানো শুরু হবে। কারাবন্দীদের ভোটের দুই সপ্তাহ আগে পাঠানোর পরিকল্পনা।
আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম : সেপ্টেম্বরে ও তফসিল ঘোষণার ১৫ দিন আগে এবং তফসিল ঘোষণার পরও বৈঠক।
বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশিক্ষণ : ৩০ আগস্ট থেকে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু। জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে (ঞড়ঞ) ট্রেইনারদের (নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ ও নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সকল কর্মকর্তাগণ, সিনিয়র জেলা/জেলা নির্বাচন অফিসার, উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসার, সহকারী উপজেলা/সহকারী থানা নির্বাচন কর্মকর্তা, প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও অন্য বিভাগের কর্মকর্তাসহ) প্রশিক্ষণ। পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে মাস্টার ট্রেইনারদের প্রশিক্ষণ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ। মাঠ প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তা (বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার) ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের প্রশিক্ষণ/ব্রিফিংয়ে যোগদানের অনুমতি প্রদানের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ। বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারদের প্রশিক্ষণ/ব্রিফিং। মাঠপর্যায়ে আচরণবিধি প্রতিপালনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে অনলাইনে প্রশিক্ষণ/ব্রিফিং।
নির্বাচনী প্রচারনা : তফসিল ঘোষণার পর বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রচারণা এবং দলীয় প্রধানের বক্তৃতা প্রদানের লক্ষ্যে পত্র প্রেরণ। প্রতীক বরাদ্দের পর জাতীয় সংসদের নির্বাচনী আসনভিত্তিক রিটার্নিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে একই প্লাটফর্মে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে ভোটার ও অংশীজনের উপস্থিতিতে নির্বাচনি ইশতেহার বা ঘোষণাপত্র পাঠ।
প্রসঙ্গত, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে রোজার আগে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এ-সংক্রান্ত চিঠিও দেয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনে। সিইসিও বলেছেন, ভোটের তারিখের প্রায় দুই মাস আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন কমিশন সভায় আলোচনা শেষে জানানো হয়, ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল দেবে ইসি।
এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, বডি সিসি ক্যামেরার বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের, আমাদের বিষয় না। এমনকি কেন্দ্রগুলোতে যদি প্রয়োজন হয় আমরা জানাবো। সচিব বলেন, নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে বিষয়টি নিয়ে বসব। তাদেরকে দিয়ে কাজ করব। সব কিছু সামাল দেয়া কি সম্ভব? তবুও চেষ্টা করব। তিনি বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশ আনতে চাই, যাতে মানুষ ভোট দিতে পারে।