ভারতের ড্রোন উৎপাদন আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাকেও উসকে দেবে

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ড্রোন প্রযুক্তিতে নয়াদিল্লির ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ কেবল বিদ্যমান অসাম্যকে আরো গভীর করার ঝুঁকিই তৈরি করছে না বরং এটি একটি আঞ্চলিক ড্রোন অস্ত্র প্রতিযোগিতাকেও উসকে দেবে। ভারতীয় ড্রোন শিল্প ইসরাইলি শিল্পের পরিপক্ব বাণিজ্যিক-প্রতিক্রিয়া চক্রের সাথে ইউক্রেনীয় ড্রোন শিল্পের যুদ্ধকালীন উদ্ভাবন এবং প্রসারণযোগ্যতাকে একত্র করতে চাইছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে ড্রোন প্রযুক্তি আমদানি করে আসছে। ১৯৯৯ সালের কারগিল সঙ্ঘাতের সময় ভারতের সামরিক বাহিনী প্রথমবারের মতো ইসরাইলি-নির্মিত আইএআই হেরন এবং সার্চার ড্রোন মোতায়েন করে। ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সাথে সামরিক সঙ্ঘাতের পর ড্রোন উৎপাদক হওয়ার ভারতের উচ্চাকাক্সক্ষা সত্যিকার অর্থে সামনে আসে। এখন ভারতে তা নিরাপত্তাকেন্দ্রিক একটি প্রযুক্তিগত অস্ত্র প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। অবশ্য রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ধারাবাহিক কাঠামোগত নীতিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই রূপান্তরটি আগে থেকেই চলছিল।

সামগ্রিকভাবে, ভারতে ৬০০-এরও বেশি ড্রোন এবং ড্রোনের যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী সংস্থা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে ১০০-এরও বেশি সংস্থা বিশেষভাবে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এগুলোর প্রয়োগে পারদর্শী। তবে ২০২৫ সালের সঙ্ঘাতের পর ভারতে ড্রোনের চাহিদা বেড়েছে। শুধু ২০২৫ সালের মে মাসেই জুপ্পা জিও নেভিগেশন টেকনোলজিসের অর্ডার পাইপলাইনে ১০ গুণ বৃদ্ধি ঘটেছিল। এরপর থেকে সংস্থাটি আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তাদের ভৌগোলিক উপস্থিতি প্রসারিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা এবং নিজেদেরকে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ-প্রতিরোধী সিস্টেমের রফতানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

একই সময়ে, বেসরকারি সংস্থাগুলোও ড্রোন উৎপাদন ত্বরান্বিত করার জন্য ডিএপির অধীনে প্রদত্ত জরুরি সংগ্রহ ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে, ভারত-পাকিস্তান সঙ্ঘাতের ঠিক পরেই, আইডিয়াফোর্জ টেকনোলজি লিমিটেড সামরিক মানের ছোট মনুষ্যবিহীন আকাশযানের জন্য ১৬ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার পায়। পরে ভারতের সামরিক বাহিনী প্রায় এক কোটি ১৩ লাখ ডলার মূল্যের জোল্ট ট্যাকটিক্যাল ড্রোন ও ভার্টিক্যাল টেকঅফ লং-রেঞ্জ সুইচ দুই ড্রোনের জন্য আরো একটি জরুরি অর্ডার দেয়। এর পাশাপাশি, ভারত সরকার আদানি গ্রুপ, টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস এবং লারসেন অ্যান্ড টুব্রোর মতো প্রধান সংস্থা এবং আইডিয়াফোর্জ ও অ্যাস্টেরিয়া অ্যারোস্পেসের মতো স্টার্টআপসহ দেশীয় নির্মাতাদের কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের সামরিক ড্রোনের অর্ডার দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ভারতে ড্রোন উৎপাদনের এই উল্লম্ফনের সাথে সাথে ড্রোন পরীক্ষাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসরাইলের একটি যথেষ্ট পরিপক্ব এবং সুপ্রতিষ্ঠিত ড্রোন উৎপাদন পরিকাঠামো রয়েছে, যা বিভিন্ন ইকোসিস্টেমের মধ্যে গভীর সমন্বয় দ্বারা চিহ্নিত। রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস, ইসরাইল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি এবং এলবিট সিস্টেমসের মতো ইসরাইলি প্রতিরক্ষা উৎপাদকরা ভারতে (রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয়ই) একই সাথে প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, বাণিজ্যিক রফতানিকারক এবং তাদের নিজস্ব যুদ্ধব্যবস্থার জীবন্ত-পরীক্ষাগার ব্যবহারকারী হিসাবে কাজ করে। ভারতও বাণিজ্যিক-সামরিক ফিডব্যাক লুপ তৈরির একই কৌশল অনুসরণ করছে বলে মনে হচ্ছে। যুদ্ধকালীন উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণযোগ্যতার ক্ষেত্রে, দৃশ্যত নয়াদিল্লি ইউক্রেনের মডেলটিই প্রয়োগ করতে চাইছে। শুধু ২০২৪ সালেই ইউক্রেনীয় নির্মাতারা ২০ লাখেরও বেশি ড্রোন উৎপাদন করেছে। তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জন্য ৪৫ লাখ ইউনিট উৎপাদনের একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন কোম্পানির সংখ্যা ২০২২ সালে ৪১টি থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ১৩২টি এবং ২০২৪ সালে ১৮৩টিতে দাঁড়িয়েছে। এগুলো সরকারি অর্থায়ন এবং পশ্চিমা মিত্র উভয়ের দ্বারাই সমর্থিত ছিল। বর্তমানে ইউক্রেনীয় বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত ৯৬ শতাংশেরও বেশি ড্রোন দেশীয়ভাবে উৎপাদিত। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে, নয়াদিল্লি একটি ত্রিবিধ পন্থা অনুসরণ করছে বলে মনে হচ্ছে। এটি তার পশ্চিমা প্রতিবেশী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ড্রোন ব্যবহার করতে, বিদেশী সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং গ্লোবাল সাউথের জন্য নিজেকে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প ড্রোন সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে, যে বাজারটি মূলত চীনের দখলে।

আঞ্চলিক পর্যায়ে, এটি ড্রোন অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে ত্বরান্বিত করছে, কারণ এটি পাকিস্তানকে ড্রোন স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে একটি মূল নিরাপত্তা অপরিহার্য বিষয় হিসেবে দেখতে বাধ্য করছে অতএব, উদ্ভাবনী এবং সম্প্রসারণযোগ্য ড্রোন উৎপাদনে নয়াদিল্লির ধারাবাহিক বিনিয়োগ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আকাশযুদ্ধে অর্থবহ পরিবর্তন আনার সম্ভাবনাও রাখে।

ড্রোনের ব্যবহার শক্তি প্রয়োগের সীমাও কমিয়ে দেয়, যা সঙ্ঘাত বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। এই বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ ভারত ও পাকিস্তান দু’টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশী দেশ এবং তাদের মধ্যে সঙ্কট ও সঙ্ঘাত ক্রমেই পুনরাবৃত্ত ও অনিয়মিত হয়ে উঠছে।

সরবরাহকারী হিসেবে নয়াদিল্লির ভূমিকা গ্রহণ এবং সম্ভাব্যভাবে গ্লোবাল সাউথের বাজারে প্রবেশ করার বিষয়টি একটি কঠিন কাজ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। কাঠামোগতভাবে, বৈশ্বিক ড্রোন সরবরাহ শৃঙ্খল এখনো চীনের দ্বারা ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রিত। চীনের এই আধিপত্য কেবল তৈরি পণ্যের রফতানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব আরো গভীর, কারণ চীন ড্রোন যন্ত্রাংশ সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোও নিয়ন্ত্রণ করে, যার মধ্যে মোটর, ইলেকট্রনিক্স ও ব্যাটারি অন্যতম। চীনের বৃহত্তম ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডিজেআই একাই বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ড্রোন বাজারের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বলে অনুমান করা হয়। চীনা সংস্থাগুলো দুর্লভ মৃত্তিকা প্রক্রিয়াকরণ, ব্যাটারি রসায়ন এবং মূল ইলেকট্রনিক্স উপকরণের ক্ষেত্রেও আধিপত্য বিস্তার করে। পরিহাসের বিষয় হলো, ভারতীয় ড্রোন উৎপাদন খাতও কালোবাজারের মাধ্যমে চীনা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং, নয়াদিল্লির পক্ষে চীন-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রবেশ করতে হলে কেবল প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের তৈরি পণ্যই নয় বরং চীনের ব্যয় কাঠামো, উৎপাদনের পরিধি এবং বছরের পর বছর ধরে অর্জিত শিল্প অভিজ্ঞতার সাথে পাল্লা দেয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন হবে।

নয়াদিল্লির ড্রোন প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ কেবল বিদ্যমান অসাম্যকে আরো গভীর করার ঝুঁকিই সৃষ্টি করছে না বরং এটি একটি আঞ্চলিক ড্রোন অস্ত্র প্রতিযোগিতাকেও উসকে দেবে, যা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। (সংক্ষেপিত)