বাংলাদেশের বহুমাত্রিক পরিবেশগত সঙ্কট (বায়ু, শব্দ, পানি ও আলোদূষণ), জনস্বাস্থ্য ও দারিদ্র্যের ওপর এর প্রভাব এবং তা মোকাবেলায় টেকসই সমাধানের কোনো রূপরেখা কোনো সরকারের ছিল বলে কেউ জানে না। বিগত হাসিনা সরকারের প্রচারণা ছিল, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক এবং অবকাঠামোগত দিক থেকে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রকৃতপক্ষে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল কিংবা এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগা প্রকল্পগুলো ছিল দেশের অর্থ লুটপাটের অকল্পনীয় প্রকল্প। উন্নয়নের সমান্তরালে দেশকে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন এবং অপরিকল্পিত শিল্পে দেশে আজ বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১৭.৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। সঙ্কট কেবল পরিবেশগত নয়, এটি এখন দেশের অস্তিত্ব ও টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
বায়ুদূষণ : বাংলাদেশ এবং বিশেষ করে এর রাজধানী ঢাকা বছরের পর বছর ধরে বৈশ্বিক বায়ুদূষণের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আসছে। আইকিউ এয়ার-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালেও ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত বাতাসসমৃদ্ধ শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম কণার উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি। বায়ু মানের এমন অবনতি প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বায়ুদূষণের প্রধান উৎস : নির্মাণকাজ অবশ্যই উন্নয়নের অংশ; কিন্তু অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ ইতিবাচক নয়। শহরজুড়ে মেগা প্রজেক্ট, আবাসন খাতের অপরিকল্পিত খননকাজ বাতাসে বিপুল পরিমাণ ধুলাবালি ছড়াচ্ছে। প্রতিদিন রাস্তায় চলছে হাজার হাজার পুরনো বাস, ট্রাক এবং অন্যান্য ইঞ্জিনযুক্ত যানবাহন। এসব থেকে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড বাতাস বিষাক্ত করে তুলছে। শত শত সনাতন পদ্ধতির ইটভাটা থেকে নির্গত হচ্ছে ক্ষতিকর ধোঁয়া। যত্রতত্র শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে বাতাসে ডাই-অক্সিনের মতো বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে।
শব্দদূষণ : শব্দদূষণ বাংলাদেশের বিশেষ করে শহরাঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের যন্ত্রণার নাম। পরিবেশ আইন অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা দিনের বেলায় ৫৫ ডেসিবল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবল। অথচ ঢাকার প্রধান সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে শব্দের গড় মাত্রা প্রায়ই ৯০ থেকে ১১০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যায়, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কংক্রিট মিক্সার মেশিন, পাইলিং এবং ইট ভাঙার যন্ত্র কোনো প্রকার শব্দনিরোধক ব্যবস্থা ছাড়াই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের নামে গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চৈঃশব্দে মাইক বাজানো প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সুপেয় পানির সঙ্কট, নদী ও ভূগর্ভের পানির করুণ দশা : বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও আজ এ দেশে নিরাপদ বা সুপেয় পানি পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে। এক দিকে ভূগর্ভের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে, অন্য দিকে ভূপৃষ্ঠের পানির উৎসগুলো শিল্প বর্জ্যরে কারণে বিষাক্ত হচ্ছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানির স্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের প্রায় ৩২% উপকূলীয় এলাকার ভূগর্ভের ও ভূপৃষ্ঠের পানিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে লাখ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অভাবে ভুগছে। দেশের বহু অঞ্চলের পানিতে প্রাকৃতিকভাবে আর্সেনিক এবং মাটিতে ক্ষতিকর সিসার উপস্থিতি বেড়েছে। রান্নার মাধ্যমে এগুলো মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
শহরে অত্যুজ্জ্বল আলো এক নতুন উপদ্রব : উন্নয়ন ও আধুনিকতার নামে বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে, ‘আলোদূষণ; বা লাইট পলিউশন নীরব মহামারী হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অতিরিক্ত আলোর কারণে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক ‘মেলাটোনিন’ হরমোন নিঃসরণ ব্যাহত হয়, যা অনিদ্রা, অবসাদ, তীব্র মাথাব্যথা এবং মানসিক বিষণ্নতার জন্ম দেয়। রাতের বেলা সক্রিয় থাকা বিভিন্ন পাখি, কীটপতঙ্গ এবং নিশাচর প্রাণী তীব্র আলোর কারণে তাদের দিক হারায় এবং প্রজনন ক্ষমতা হারায়, যা শহুরে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে।
স্বাস্থ্য সমস্যা : দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের আপামর জনসাধারণের স্বাস্থ্যের ওপর। হাসপাতালে দিন দিন রোগীর ভিড় বাড়ছে এবং চিকিৎসার পেছনে মানুষের সঞ্চিত অর্থ শেষ হয়ে যাচ্ছে। বায়ুদূষণজনিত কারণে, বড় শহরগুলোতে ফুসফুসের ক্যান্সার, দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি, স্ট্রোক এবং হৃরোগ, শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শব্দদূষণজনিত কারণে মানুষের স্থায়ী হিয়ারিং লস (বধিরতা), উচ্চ রক্তচাপ, হৃদকম্পন বৃদ্ধি, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি।
পানি দূষিত হওয়ায় ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, আর্সেনিকোসিস এবং কিডনি বিকল হয়। ক্রোমিয়াম ও সিসার কারণে ক্যান্সারের বিস্তার ঘটে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাতাসে সিসা দূষণের কারণে বাংলাদেশের শিশুদের গড় আইকিউ হ্রাস পাচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধার ওপর এক অপূরণীয় আঘাত।
দারিদ্র্য ও পরিবেশের দুষ্টচক্র : পরিবেশ দূষণ ও দারিদ্র্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশে এই দূষণগুলো দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে এবং তাদের দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে রাখে।
বাস্তুচ্যুতি ও পরিবেশগত শরণার্থী : সুপেয় পানির অভাব এবং উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততার কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের কৃষিজমি ও পৈতৃক ভিটা ছেড়ে শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে, যা শহরে দরিদ্র জনসংখ্যার চাপ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ এসবের প্রতিকারে যথেষ্ট আইন ছিল; কিন্তু আইনের প্রয়োগ ছিল না। বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ে সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের (জীবনের অধিকার) অংশ হিসেবে ‘সুস্থ পরিবেশে বাঁচার অধিকার’কে মৌলিক অধিকারের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এই শক্তিশালী সাংবিধানিক ভিত্তি এবং প্রায় দুই শতাধিক পরিবেশসংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। এই উপেক্ষার চিত্রটি মূলত কয়েকটি প্রধান খাতের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ।
নদী ও জলাভূমি দখল এবং দূষণ : সংবিধানে ‘জলাভূমি’ রক্ষার স্পষ্ট তাগিদ রয়েছে এবং উচ্চ আদালত দেশের সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করেছেন। অথচ বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদসহ দেশের অধিকাংশ নদ-নদী এখন শিল্পবর্জ্য, কেমিক্যাল ও প্লাস্টিকে মৃতপ্রায়। ঢাকাসহ বড় শহরের প্রায় সব খাল ও জলাশয় ভরাট করে আবাসন ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়েছে।
বনাঞ্চল ধ্বংস ও পাহাড় কাটা : জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিতে থাকা দেশ হওয়া সত্ত্বেও বনাঞ্চল রক্ষায় তীব্র উদাসীনতা দেখা যায়। অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি-বেসরকারি নানা প্রকল্প এবং রোহিঙ্গা সঙ্কটের মতো মানবিক কারণে উখিয়া-টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলে প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রতিনিয়ত আইন অমান্য করে পাহাড় কাটা হচ্ছে।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা উপেক্ষিত কেন
পরিবেশ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর জনবল ও প্রযুক্তির অভাব রয়েছে। অনেকসময় রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্নীতির কারণে
দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। সংবিধানের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও এ ক্ষেত্রে বড় বাধা। সংবিধানের ‘দ্বিতীয় ভাগে’ (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) পরিবেশসংক্রান্ত ১৮এ অনুচ্ছেদ অবস্থিত। এই মূলনীতিগুলো আদালতে সরাসরি কার্যকর নয়। ফলে কোনো নাগরিক পরিবেশ ধ্বংসের জন্য রাষ্ট্রকে সরাসরি কাঠামোগতভাবে বাধ্য করতে পারেন না, যতক্ষণ না তা ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে ‘জীবনের অধিকার’ হরণের আওতায় আনা হচ্ছে।
উন্নয়ন বনাম পরিবেশের দ্বন্দ্ব : টেকসই উন্নয়নের পরিবর্তে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকে কেবল কাগজে-কলমে বা ‘প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা’ হিসেবে না দেখে, একে একটি সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আইনের কঠোর ও নির্মোহ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত