মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে মুদ্রানীতি ঘোষণা
নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকলেও কমানো হয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে আগামী এক বছরের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করলো বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হলেও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগের গতি যাতে পুরোপুরি থেমে না যায়, এই দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। বর্তমান সরকারের আমলে এটি প্রথম মুদ্রানীতি। অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে না নামায় কঠোর মুদ্রানীতির অবস্থান পুরোপুরি শিথিল করার সুযোগ তৈরি হয়নি। তবে একই সাথে শিল্প, ব্যবসা ও উৎপাদনমুখী খাতে ঋণপ্রবাহ যাতে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় বাস্তবসম্মত সমন্বয় আনা হয়েছে।
নতুন অর্থবছরের বাজেটে সরকার গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতিও সেই লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। গত মে মাসে দেশের সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি এখনো সরকারি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় দুই শতাংশ বেশি অবস্থান করছে। অন্য দিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এই ধীরগতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এক দিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে কঠোর নীতি প্রয়োজন, অন্য দিকে অতিরিক্ত কড়াকড়ি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশই বহাল রেখেছে। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপো সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মুদ্রানীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায়। চলতি অর্থবছরের জুন পর্যন্ত এ লক্ষ্য ছিল ৮ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে মে মাস পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৫ শতাংশে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, আমদানি ব্যয় এবং ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতির কারণে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধির নতুন লক্ষ্য ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সাথে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের আর্থিক চাহিদা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সক্ষমতা বিবেচনায় এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে অতিরিক্ত ‘স্পেকুলেশন’ বা অনুমাননির্ভর আলোচনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করতে পারে। তাই সবাইকে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অনুরোধ জানান তিনি। গভর্নর বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অনেক বেশি স্পেকুলেশন হচ্ছে। আমি সবাইকে অনুরোধ করবো, একটু ধৈর্য ধরুন। পরিস্থিতি দেখুন। অপ্রয়োজনীয় কোনো আলোচনা না করাই ভালো। ব্যাংক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তার (লিকুইডিটি সাপোর্ট) তথ্য তুলে ধরে অপর এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যাংককে মোট ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই সহায়তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। মো: মোস্তাকুর রহমান বলেন, আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম চার মাস কোনো ব্যাংককে লিকুইডিটি সাপোর্ট দিতে হয়নি। এটিকে আমাদের জন্য ইতিবাচক দিক বলা যায়। তবে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে ১৩ হাজার কোটি টাকা লিকুইডিটি সাপোর্ট দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে কোনো সিদ্ধান্তই আইনের বাইরে গিয়ে নেয়া হবে না। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক একটি ব্যাংকিং কোম্পানি। এটি ব্যাংক কোম্পানি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা আইনের বাইরে কোনো কাজ করবো না।