গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল খায়েরের অনিয়মের ব্যবচ্ছেদ
রাজনৈতিক রূপবদল ও টেন্ডার জালিয়াতি
Printed Edition
গণপূর্ত অধিদফতরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার, টেন্ডার জালিয়াতি, ঠিকাদার সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে নজিরবিহীন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
অভিযোগ পর্যালোচনায় দেখা যায়, চাকরিজীবনে বিভিন্ন সরকারের মেয়াদে রাজনৈতিক পরিচয়ের রূপবদল ঘটিয়েছেন আবুল খায়ের। গোপালগঞ্জে প্রায় তিন বছর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকাকালে নিজেকে ‘বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা’ ও ‘শেখ পরিবারের অত্যন্ত আস্থাভাজন’ হিসেবে উপস্থাপন করতেন। নিয়ম ভেঙে সেখানে ‘মুজিব কর্নার’ উদ্বোধন করা এবং দাফতরিক কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে ‘বঞ্চিত ও বিএনপি-পন্থী’ হিসেবে দাবি করলেও অতীতে বিরোধী দল বা মতের স্বপক্ষে কোনো ভূমিকার প্রমাণ নথিতে পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহে মন্ত্রীর ‘প্রতিনিধি’ ও ফাইল নিয়ন্ত্রণ
ময়মনসিংহ অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের সময় সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন আবুল খায়ের। ওই সময়ে তিনি নিজেকে মন্ত্রীর ‘প্রতিনিধি’ পরিচয়ে প্রকল্পের আর্থিক বিষয়াদিতে প্রভাব বিস্তার এবং মন্ত্রণালয়ে ফাইল অনুমোদন করানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করতেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
রংপুরে সিন্ডিকেট ও বিতর্কিতদের দৌরাত্ম্য
রংপুর জোনে দায়িত্ব পালনকালে উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার বড় বড় প্রকল্পের টেন্ডার পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে বণ্টন করার নজির মেলে। অভিযোগ অনুযায়ী, ই-জিপি (ব-এচ) ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ওই অঞ্চলে সাজ্জাদ আলী কনস্ট্রাকশনের প্রোপ্রাইটর এবং আন্দোলনের মামলার আসামি শাহনেওয়াজ আলী টিটু, বাড়ি মিঠু, আকবর আলী, বাবুল আকতারসহ সাবেক যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেট ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
সরকারি খরচে প্রটোকল ও পারিবারিক মিলনমেলা
সরকারি সফরে পরিবারকে সাথে রেখে সরকারি প্রটোকল নেয়া এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর উপহার ও উন্নত খাবারের তালিকা চাপিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ জুন রংপুরের একটি অভিজাত হোটেলে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে পারিবারিক মিলনমেলা ও সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়, যার অর্থ সংস্থান হয়েছিল স্থানীয় ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত চাঁদা থেকে।
সুনির্দিষ্ট টেন্ডারে জালিয়াতির প্রমাণ
ভুরুঙ্গামারী মডেল মসজিদ (কুড়িগ্রাম) : ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রাক্কলন থেকে জেনারেটর ও সাব-স্টেশনের প্রায় ৭০ লাখ টাকা বাদ না দিয়ে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বাড়তি প্রাক্কলনের ৬০% ঠিকাদার ও ৪০% কর্মকর্তা পর্যায়ে ভাগবাটোয়ারা করা। পছন্দের ঠিকাদার সর্বনিম্ন দরদাতা হতে না পারায় পরবর্তী সময়ে মনগড়া অজুহাতে বিজয়ী ঠিকাদারের দরপত্র বাতিল করা হয়।
বিটাক বাউন্ডারি ওয়াল : প্রতিযোগিতা সীমিত করতে প্রাক্কলনে নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনটি এনালাইসিস আইটেম যুক্ত করে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেয়া হয়। মাত্র ৬৪ টাকার ব্যবধানে পছন্দের দরদাতাকে প্রথম সর্বনিম্ন দেখানো হয় এবং কাজ চলমান থাকা অবস্থাতেই ভুয়া ‘কার্য-সম্পাদন সনদ’ যুক্ত করে কাজটি দেয়া হয়। এ ঘটনায় নির্বাহী প্রকৌশলী আল মামুন হককে বদলি করা হলেও প্রধান অভিযুক্ত আবুল খায়ের অধরাই থেকে যান।
বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, এই সরকার ব্যর্থ হওয়া মানে পুরো দেশ ও জাতি ব্যর্থ হওয়া। আমরা কোনোভাবে চাই না এই সরকার ব্যর্থ হোক। তাই সরকারের উচিত স্বৈরাচার আমলের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তা না হলে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে না। আর দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হলে সরকার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সেই ক্ষতি সামাল দিয়ে ওঠা সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিয়োগের বিষয় তার বক্তব্য জানতে চেয়ে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।