দুর্নীতি দেশে, সম্পদ বিদেশে

গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখর মণ্ডল সম্পদ গড়েছেন কলকাতায় : দুদকে অভিযোগ

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition

গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মণ্ডলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থপাচার এবং প্রভাব খাটিয়ে সরকারি কাজ বণ্টনের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ের তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ দায়ের হয়। তবে অভিযোগকারী তার পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ জানিয়ে দুদকের মহাপরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) বরাবর আবেদনটি করেন।

অভিযোগপত্রে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করার অভিযোগও তোলা হয়েছে। একই সাথে অভিযোগগুলোর বিষয়ে নতুন করে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল গঠন এবং দেশে-বিদেশে তার ও সংশ্লিষ্টদের সম্পদের অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।

মিস্টার ২০ শতাংশ নামে পরিচিতি

দুদকে দেয়া আবেদনে অভিযোগকারী দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন সরকারি দায়িত্ব পালনকালে স্বর্ণেন্দু শেখর মণ্ডল রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন পেয়েছেন। অভিযোগপত্রে তাকে ‘মিস্টার ২০ শতাংশ’ নামে পরিচিত বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, বিভিন্ন ঠিকাদারকে মৌখিকভাবে কাজ দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি কাজ শুরুর আগে ১০ শতাংশ, কাজ চলাকালে ৫ শতাংশ এবং বিল পরিশোধের সময় আরো ৫ শতাংশ অর্থ নিতেন- এমন অভিযোগ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। এসব অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।

কলকাতায় বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি

অভিযোগপত্রে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার সল্টলেক এলাকার একটি সম্পত্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সল্টলেক, বিধাননগর, সেক্টর-১-এর প্লট নম্বর ২৮৩-এ প্রায় পাঁচ কাঠা জমিসহ বাড়ি থাকার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, ওই সম্পত্তি নিয়ে এর আগে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেয়া হয়েছিল। সম্পত্তিটির প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস ও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে যাচাই করার জন্য দুদকের কাছে আবেদন করা হয়েছে।

এছাড়া আরো দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রতি মাসে বিপুল অর্থ সাংবাদিকদের পেছনে ব্যয় করতেন। একই সাথে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তার যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সময়ে তার পদায়নের ক্ষেত্রে বিদেশী পক্ষের তদবিরের অভিযোগও আনা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপিপন্থী ঠিকাদারদের যৌক্তিকভাবে পাওয়া কাজ বাতিল করার অভিযোগও রয়েছে শেখর মণ্ডলের বিরুদ্ধে।

অফিসার্স ক্লাব প্রকল্পেও দুর্নীতি

অভিযোগপত্রে গণপূর্ত অধিদফতরের অফিসার্স ক্লাব প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, ওই প্রকল্পে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর তৎকালীন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

অভিযোগকারীর দাবি, ওই অনুসন্ধান কার্যক্রমের পরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু দলিল, নথি ও অনুসন্ধানযোগ্য বিষয় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। বিশেষ করে কলকাতার সল্টলেকের কথিত সম্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট বাড়ির তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ কারণে পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের নিরপেক্ষতা, পূর্ণতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী।

নতুন করে তদন্তের দাবি

অভিযোগপত্রে দুদকের কাছে মোট কয়েকটি বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পূর্ববর্তী অনুসন্ধান প্রতিবেদন পুনর্মূল্যায়ন, নতুন ও স্বাধীন তদন্ত দল গঠন এবং অধিকতর অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়া।

এ ছাড়া ভারতের কলকাতার সল্টলেক এলাকায় অভিযোগে উল্লিখিত সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস ও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে যাচাই করার অনুরোধ করা হয়েছে। অভিযোগভুক্ত কর্মকর্তা, তার স্ত্রী, সন্তান, নিকট আত্মীয়, প্রতিনিধি অথবা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে দেশে-বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদেরও অনুসন্ধান চাওয়া হয়েছে।

ব্যাংক হিসাব ও অর্থপাচার তদন্তের দাবি

অভিযোগকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, বৈদেশিক অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন। সম্ভাব্য মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহযোগিতায় তদন্তেরও অনুরোধ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী পূর্ববর্তী অনুসন্ধানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য গোপন, অবহেলা, অসম্পূর্ণতা কিংবা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

অভিযোগকারী জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সংশ্লিষ্ট প্রমাণসহ দুদকের কাছে সরাসরি সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত রয়েছেন।

শেখর মণ্ডলের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয় তার কাছে জানতে চেয়ে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে এসএমএস এর মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো রিপ্লাই দেননি।