কওমি মাদরাসার সর্বস্তরের সনদের স্বীকৃতি দেয়া হবে : ডা: শফিক
যাদের ৩৯ প্রার্থী ঋণখেলাপি তারা কিভাবে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করবে?
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি- ‘না’ মানে গোলামি
- দেশকে নারী-পুরুষের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হবে
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, যাদের ৩৯ জন এমপি প্রার্থী ঋণখেলাপি তারা দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবে না। অন্তত ওই দলের মুখে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা মানায় না। চোর-ডাকাতদের সংসদে নিয়ে চোর-ডাকাত মুক্ত করা যায় না। দুর্নীতিবাজ আর চাঁদাবাজদের দিয়ে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধ করা যায় না।
গতকাল রোববার রাজধানীর তিনটি নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। জামায়াত আমির গতকাল ঢাকা-৪, ৫, ৬ ও ৭ আসনে জনসভায় বক্তৃতা করেন। ন্যায় ও ইনসাফের নতুন বাংলাদেশ গড়তে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সাধারণ একজন নাগরিক অপরাধের জন্য যেই শাস্তি পাবে প্রেসিডেন্টও অপরাধ করলে একই শাস্তি পাবে। বিচারের ক্ষেত্রে শুধু অপরাধ বিবেচ্য বিষয় হবে। অপরাধ করলে কেউ ছাড় পাবে না। তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে প্রতি ছয় মাস পরপর জনপ্রতিনিধিদের জনগণের মুখোমুখি হতে হবে’। বিগত ছয় মাসে জনগণের জন্য কী কী কাজ করেছে এবং পরবর্তী ছয় মাসে জনগণের জন্য কী কী কাজ করবে তার হিসাব জনগণকে দিতে হবে। জনগণের টাকায় দেশ চললে অবশ্যই জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। জনপ্রতিনিধির নামে জনগণকে শোষণ করার দিন শেষ। জনপ্রতিনিধিদের শাসক নয় সেবক হতে হবে। দেশের সব নদী, খাল-বিল রক্ষায় জনপ্রতিনিধিদের বছরে চারবার নদী ও খাল-বিলে গোসল করানো হবে। কোনো এমপি, মেয়র, কমিশনার, চেয়ারম্যান বা মেম্বার ক্ষমতার প্রভাবে নদী, খাল-বিল দখল করতে পারবে না এবং ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করতে হবে না। যদি করে তাকে ময়লার ভাগাড়েই গোসল করতে হবে।
কওমি মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, কওমি মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিটি সরকার চরম অবহেলা করেছে। কওমি মাদরাসার সিনিয়র লেভেলের সনদের স্বীকৃতি দেয়া হলেও নিচের দিকের কোনো সনদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। কেউ তাদের স্বীকৃতি না দিলেও জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে কওমি মাদরাসার সর্বস্তরের সনদের স্বীকৃতি দেয়া হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা ভাষার পাশাপাশি আরবি ও ইংরেজি ভাষার ওপর গুরত্বারোপ করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সারা বিশ্বে আমাদের আগামী প্রজন্ম দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। জামায়াতে ইসলামী সেই সুযোগ সৃষ্টি করবে। যুবকদের বেকার ভাতার নয় দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, বেকারত্ব জাতির অভিশাপ। যারা জাতিকে নিয়ে ভাবে না, জাতির জন্য যাদের পরিকল্পনা নেই; তারাই যুবকদের বেকার ভাতা দেয়ার ঘোষণা দেয়। জামায়াতে ইসলামী যুবসমাজকে দক্ষ জাতি হিসেবে গড়ে তুলবে।
জামায়াত আমির বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যজোট সরকার গঠনের সুযোগ পেলে সামাজিক দায়িত্বগুলো রাষ্ট্রকর্তৃক পালন করা হবে। আমাদের আগামীর পরিচয় হবে ‘আমিই বাংলাদেশ’। যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, কর্মের অধিকার নিশ্চিত হবে।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, পরিবারের মতোই দেশকে নারী-পুরুষের সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতিতে সমানভাবে নারীরা অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে, নারী সমাজের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় মহিলাদের জন্য বড় শহরে ইভেনিং বাস সার্ভিস চালু করা হবে। নারী সমাজের অধিকার, স্বাধীনতা, মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নেয়া হবে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না, সহ্য করা হবে না।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সব দেশের সাথে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী কিন্তু কাউকে আমাদের প্রভু হতে দেবো না। কেউ যদি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে চেষ্টা করে তবে তার উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে।
দেশের জনগণ এক জালিমকে বিদায় করে আরেক জালিমের হাতে দেশ তুলে দিতে চায় না উল্লেখ করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দেশের জনগণ দীর্ঘদিন ভোট দিতে পারেনি। বিশেষ করে তরুণ যুবসমাজ জীবনে একটিবারও ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে আর কাউকে জনগণের ভোট নিয়ে ছিনিমিনি করতে দেয়া হবে না। কেউ ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করলে কিংবা ভোট চুরির চেষ্টা করলে তাদের প্রতিহত করতে হবে। জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে জনগণকে সজাগ থাকতে তিনি আহ্বান জানান।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ হবে, অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে, বাংলাদেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য আজও পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, দেশবাসী আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শাসনব্যবস্থা দেখেছে। বিএনপি সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে কেবল তিনিসহ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ দুর্নীতির দায়ে জেলে যেতে হয়নি। যারা ক্ষমতায় থেকে এক পয়সাও দুর্নীতি করেনি তাদের এবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিতে হবে। তা হলেই দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন সম্ভব হবে। তিনি উপস্থিত জনসাধারণকে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি- ‘না’ মানে গোলামি।
জনসভাগুলোতে আরো বক্তৃতা করেন, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, জাগপার সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আব্দুর রব, ১১ দলীয় জোট সমর্থিত ঢাকা-৪ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, ঢাকা-৫ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান, ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হাফেজ হাজী মো: এনায়েত উল্লাহ, ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারী, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার এস এম শাহরিয়ার, খেলাফত মজলিস ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি মুফতি সানাউল্লাহ আমিনী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা জহিরুল ইসলাম, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির উদ্দিন, খেলাফত আন্দোলন যাত্রাবাড়ী থানা সভাপতি মাওলানা আব্দুর রহমান, ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জিএস মাজহারুল ইসলাম প্রমুখ।