জনবল সঙ্কটে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ রেলপথের ৪ স্টেশন অচল
নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ দখল-চুরির ঝুঁকিতে রেলওয়ের জমি ও স্থাপনা
Printed Edition
মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ
এক সময় যাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকত ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ রেলপথের স্টেশনগুলো। কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের কম খরচে যাতায়াতের পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও মালামাল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল রেল। তবে জনবল সঙ্কট, দীর্ঘ দিনের অব্যবস্থাপনা ও লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকায় এখন ঈশ্বরগঞ্জ, সোহাগী, বিসকা ও বোকাইনগর স্টেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ দিন অচল থাকায় স্টেশনগুলোর ভবন ও অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে। কোথাও দরজা-জানালা ভেঙে গেছে, কোথাও যাত্রীদের আসন, রেলের সিøপার ও অন্যান্য সরঞ্জাম চুরি হয়েছে। পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আড্ডা বসার অভিযোগও রয়েছে। একই সাথে রেলওয়ের জমি দখলের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া লোকাল ট্রেন চলাচল পরে বিভিন্ন রুটে স্বাভাবিক হলেও এ রুটের কয়েকটি স্টেশনে আগের যাত্রীসেবা আর ফেরেনি। ফলে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের মধ্যবর্তী এলাকার মানুষকে বাস, সিএনজি ও অন্যান্য সড়কযানে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে যাতায়াত ব্যয় ও সময় দু’টিই বাড়ছে।
ঈশ্বরগঞ্জের বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, এক সময় ঈশ্বরগঞ্জ স্টেশনে আন্তঃনগর ও লোকাল ট্রেন থামত। এখন স্টেশন থাকলেও আগের কর্মচাঞ্চল্য নেই। দ্রুত স্টেশনটি চালু ও নিয়মিত ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষকরাও পড়েছেন সমস্যায়। ঈশ্বরগঞ্জের কৃষক সোহরাব মিয়া বলেন, উৎপাদিত সবজি সড়কপথে পরিবহন করতে গিয়ে খরচ বেড়ে যায়। অনেক সময় বেশি পরিবহন ব্যয়ের কারণে কৃষককে কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয়।
বিসকা স্টেশনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো ভিন্ন। জনবল না থাকায় দাফতরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, কয়েকটি লোকাল ট্রেন এখানে যাত্রাবিরতি দেয়। টিকিট কাউন্টার বন্ধ থাকায় অনেক যাত্রীকে টিকিট ছাড়াই ট্রেনে উঠতে হয়। ফলে যাত্রীসেবা ও রাজস্ব আদায়, দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ।
১৯১৮ সালে চালু হওয়া বোকাইনগর স্টেশনও ২০০৪ সাল থেকে জনবল সঙ্কটে দাফতরিকভাবে অচল। করোনার আগে লোকাল ট্রেন থামলেও বর্তমানে সেখানে যাত্রীবাহী ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, স্টেশনটি এক সময় কৃষিপণ্য ও ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
সরেজমিন দেখা যায়, বিভিন্ন স্টেশনের পুরনো অফিস ও আবাসিক ভবন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। বোকাইনগর স্টেশনের টিনশেড ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্থাপনার সামগ্রী চুরি হচ্ছে এবং সন্ধ্যার পর নিরাপত্তাহীন পরিবেশ তৈরি হয়।
রেলওয়ের জমি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নজরদারির অভাবে প্রভাবশালী একটি অংশ রেলওয়ের জমি দখলের চেষ্টা করছে। জমি ও স্থাপনা রক্ষায় নিয়মিত তদারকি এবং সীমানা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ময়মনসিংহ রেল বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী স্টেশন দীর্ঘ দিন বন্ধ রয়েছে। অবকাঠামোর অবস্থা, প্রয়োজনীয় জনবলসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে এগুলো আবার চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে।
গৌরীপুর জংশনের স্টেশন মাস্টার সফিকুল ইসলাম বলেন, করোনাকালে লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করলেও বোকাইনগরে যাত্রাবিরতি নেই। জনবল নিয়োগ ও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হলে স্টেশন চালুর ব্যবস্থা করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত স্টেশনগুলোর অবকাঠামো সংস্কার, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, টিকিট ও পণ্য বুকিং ব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা হোক। তাদের মতে, রেল যোগাযোগ সচল হলে যাত্রীদের পাশাপাশি কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও কম খরচে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাবেন। অন্য দিকে অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে নষ্ট হবে সরকারি সম্পদ, বাড়বে জনদুর্ভোগ।