৭ হাজার কোটি টাকার সৌর মেগা প্রকল্প
কৃষিতে জ্বালানি সাশ্রয় ও সবুজ রূপান্তরের নতুন সম্ভাবনা
Printed Edition
ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষির সেচ ব্যবস্থাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সারা দেশে পর্যায়ক্রমে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের পরিবর্তে সৌরচালিত পাম্প স্থাপন এবং অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের মাধ্যমে কৃষি, জ্বালানি ও পরিবেশ- তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মেগা প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছয় হাজার ৯৯৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। পাঁচ বছরে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি বছর অনুমোদন পেলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে ২৬ হাজার ৭১১ মেট্রিক টন ডিজেল সাশ্রয়, ৩৬১ কোটি ৪১ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ বিক্রি থেকে প্রায় ১৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় এবং কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, এটি কেবল সেচ পাম্প পরিবর্তনের প্রকল্প নয়; বরং কৃষির জ্বালানি ব্যবস্থাকে ডিজেলনির্ভরতা থেকে সৌরশক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তরের একটি বড় উদ্যোগ।
দেশে ১২ লাখের বেশি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে সেচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেচ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনো ডিজেলনির্ভর। সরকারি প্রকল্প প্রস্তাবের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ৮০৭টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র রয়েছে।
গ্রিড বিদ্যুতের সীমিত বিস্তার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে বহু কৃষককে ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সরাসরি সেচ ব্যয়ে পড়ে।
সেচের ডিজেলনির্ভরতা কমাতে সৌরশক্তি ব্যবহার তাই একই সাথে কৃষকের ব্যয় কমানো, জ্বালানি আমদানির চাপ হ্রাস এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
৫০ হাজারের বেশি সেচযন্ত্রে সৌরশক্তি
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৫০ হাজার ০.৫ কিউসেক ক্ষমতার সোলার শ্যালো টিউবওয়েল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ২৫০টি ২ কিউসেক এবং ৫৫০টি ১ কিউসেক ক্ষমতার সোলার লো লিফট পাম্প (এলএলপি) স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎচালিত ১০০টি গভীর নলকূপে নেট মিটারিং ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির পরিধি হবে ব্যাপক। দেশের ৮টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা ও ৩৪১টি উপজেলা এলাকায় এর কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে থাকা কৃষি অঞ্চলগুলোতেও সৌরশক্তিকে সেচের প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
বছরে সাশ্রয় হবে ২৬ হাজার টনের বেশি ডিজেল
প্রকল্পটির অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সুবিধা হচ্ছে ডিজেল সাশ্রয়। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার ৯০০টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র পর্যায়ক্রমে সৌরচালিত ব্যবস্থায় প্রতিস্থাপন করা হবে। এতে বছরে প্রায় ২৬ হাজার ৭১১ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন ডিজেল সাশ্রয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএডিসির হিসাব অনুযায়ী, শুধু ডিজেল সাশ্রয় থেকেই বছরে প্রায় ৩৬১ কোটি ৪১ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে। এই সাশ্রয়ের গুরুত্ব আরো বাড়ে যখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ডলারের বিনিময় হার এবং জ্বালানি আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়।
সৌরশক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- পাম্প স্থাপনের পর সূর্যালোককে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রতি মৌসুমে আমদানি করা ডিজেলের প্রয়োজন হয় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সেচ ব্যয়ের একটি বড় অংশকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল করা সম্ভব হতে পারে।
শুধু জ্বালানি সাশ্রয় নয়, বাড়তে পারে কৃষি উৎপাদন
প্রকল্পটির সুফল জ্বালানি সাশ্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেচের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোরও লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেয়া সম্ভব হবে। এর ফলে অতিরিক্ত প্রায় চার লাখ ৫৯ হাজার ৩৭৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সেচের নিরবচ্ছিন্নতা বাড়লে কৃষক সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারবেন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা কিংবা ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেচ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যাবে জাতীয় গ্রিডে
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর উৎপাদন সময়। দিনের বেলায় সৌর প্যানেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, অথচ সব সময় সেচের প্রয়োজন থাকে না। ফলে সেচের চাহিদার বাইরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কাজে লাগানোর ব্যবস্থা না থাকলে একটি অংশ অব্যবহৃত থাকার সম্ভাবনা থাকে। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পে নেট মিটারিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৫ হাজার সৌর সেচযন্ত্রে নেট মিটারিং যুক্ত করা হবে। সেচের প্রয়োজন না থাকলে কিংবা উৎপাদিত বিদ্যুৎ অতিরিক্ত হলে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে।
বিএডিসির হিসাব অনুযায়ী, এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, সৌর পাম্প শুধু কৃষিজমিতে পানি দেয়ার যন্ত্র হিসেবে কাজ করবে না; নির্দিষ্ট সময়ে এটি ক্ষুদ্র আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারবে।
বছরে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা ৫৩৭ কোটি টাকার বেশি
প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা হলেও এর বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধার হিসাবও দেয়া হয়েছে।
প্রস্তাবনায় ডিজেল সাশ্রয় এবং নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে বছরে মোট প্রায় ৫৩৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা অর্থনৈতিক সুবিধার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। এর বাইরে রয়েছে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ কমানো, গ্রামীণ অর্থনীতিতে জ্বালানি ব্যয় হ্রাস এবং আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর মতো পরোক্ষ সুবিধা।
ফলে প্রকল্পটির মূল্যায়ন শুধু ‘কত টাকা খরচ হচ্ছে’- এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘দীর্ঘমেয়াদে কতটা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুফল পাওয়া যাবে’- এই বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকেও করা প্রয়োজন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির জাতীয় লক্ষ্যের সাথে সংযোগ
প্রস্তাবিত সৌর সেচ প্রকল্পের সাথে সরকারের বৃহত্তর নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)-এর আলোকে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র পর্যায়ক্রমে সৌরচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সাথে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য সামনে রেখে সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কৃষি খাতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশের মোট জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বাড়ানোর লক্ষ্য অর্জনেও তা সহায়ক হতে পারে।
কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ
ডিজেলচালিত লাখ লাখ সেচযন্ত্র কৃষিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। এগুলো সৌরচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তর করা গেলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তাই কৃষির মতো বড় একটি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো শুধু জ্বালানি নীতির বিষয় নয়; এটি জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন কৌশলেরও অংশ।
প্রকল্প প্রস্তাবনায়ও কৃষিতে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রকল্পটির ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য প্রকল্প প্রস্তাবনায় তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট; কিন্তু সর্বোচ্চ উৎপাদন প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হয়েছে।
সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। সৌরচালিত পাম্পের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দিনের বেলায় সেচের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এতে এক দিকে গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্য দিকে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আবার গ্রিডে ফিরিয়ে দেয়া যাবে।
৮টি গুদাম, কৃষকদের প্রশিক্ষণ
প্রকল্পে শুধু পাম্প ও সৌর প্যানেল স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি; এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
সৌর প্যানেল ও অন্যান্য সরঞ্জাম সংরক্ষণের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় আটটি সংরক্ষণাগার ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। কৃষক-কৃষাণীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে। প্রতি ব্যাচে ৩০ জন করে মোট ৪৮০টি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া উপসহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদের জন্য পৃথক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ধরনের প্রশিক্ষণ প্রকল্পটির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ সৌর সেচ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে স্থানীয় পর্যায়ে পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দ্রুত মেরামতের সক্ষমতার ওপর।
সামনে বাস্তবায়নের বড় সুযোগ
প্রকল্পটি পাঁচ বছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিবেশগত দিক থেকেও এটিকে ‘সবুজ’ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না এবং পরিবেশগতভাবে সঙ্কটাপন্ন এলাকায় সরাসরি বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও নেই।
তবে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার এই বড় বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ নজর প্রয়োজন।
সৌর প্যানেলের মান ও স্থায়িত্ব, পাম্পের কার্যক্ষমতা, যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরি জনবল, নেট মিটারিংয়ের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কৃষকদের অংশগ্রহণ- এসব নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সাথে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সাফল্য শুধু বরাদ্দ বা স্থাপিত যন্ত্রের সংখ্যায় নয়, বরং সেগুলো কত বছর কার্যকরভাবে কৃষকের কাজে থাকে তার ওপর নির্ভর করে।
কৃষির জ্বালানি ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বড় পরিবর্তন
প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প বাংলাদেশের কৃষিতে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। ডিজেল আমদানির চাপ কমিয়ে, সেচ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখে, কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে এবং অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের মাধ্যমে একই বিনিয়োগ থেকে একাধিক অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো- এটি কৃষি, জ্বালানি ও পরিবেশকে একটি অভিন্ন পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসছে।
প্রতি বছর ২৬ হাজার ৭১১ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সাশ্রয়, প্রায় ৩৬১ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, নেট মিটারিং থেকে প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা সম্ভাব্য আয় এবং অতিরিক্ত চার লাখ ৫৯ হাজার টনের বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদনের সম্ভাবনা- সব মিলিয়ে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এর সুফল শুধু কৃষকের মাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জাতীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ যখন জ্বালানি আমদানির চাপ কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে, তখন কৃষিতে সৌরশক্তির বিস্তার সেই রূপান্তরের একটি কার্যকর ক্ষেত্র হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তবায়নের মান। সঠিক প্রযুক্তি, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ এবং কৃষকের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের সেচ ব্যবস্থাকে শুধু সবুজই করবে না, বরং আরো জ্বালানি সাশ্রয়ী, স্থিতিশীল ও টেকসই কৃষি অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।