বাপা-বেন সম্মেলন শুরু

পরিবেশ সুরক্ষায় নাগরিক সংস্কার কমিশন গঠন করুন : পরিবেশ উপদেষ্টা

Printed Edition
first-2
রাজধানীতে পরিবেশ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন পরিবেশ ও তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : নয়া দিগন্ত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

পরিবেশ সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে বেসরকারি উদ্যোগে নাগরিক সংস্কার কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, সরকারের স্বল্প মেয়াদের কারণে নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য বিষয়গুলো সংস্কারের জন্য ৬টি কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করেছে। পরিবেশ ইস্যুতে নাগরিকদের নিয়ে এ ধরনের কমিশন গঠন করা যেতে পারে। বেসরকারি উদ্যোগে সেটা করা যেতে পারে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দু’দিনের বাপা-বেন জাতীয় পরিবেশ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ সব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)-এর উদ্যোগে এবং দেশের ৫৪টি পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং করণীয়’ শীর্ষক ওই সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাপা সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার। সম্মেলনের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন বাপা সহসভাপতি ও বেন-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. নজরুল ইসলাম। বাপা’র সাধারণ সম্পাদক মো: আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ এবং বেন-এর বৈশ্বিক সমন্বয়কারী ড. মো: খালেকুজ্জামান প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকারের কাজ শুরু করতে প্রথম চার মাস পার হয়ে গেছে। আর এখন তো নির্বাচনী জোয়ার শুরু হয়েছে। ফলে এ সরকার কাজের জন্য মাত্র এক বছর সময় পেয়েছে। তাও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনের জন্য প্রাসঙ্গিক কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। নাগরিক প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কমিশনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে; কিন্তু পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি অগ্রাধিকার দিচ্ছে না, এ অভিযোগ সঠিক নয়। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পৃথক পরিবেশ ক্যাডার প্রবর্তনের সুপারিশ করেছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন পরিবেশকে মৌলিক অধিকারের তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে; কিন্তু এ সব সুপারিশ বর্তমান সরকারের স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

সরকার যেকোনো বিষয়ে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত আছে উল্লেখ করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমরা জবাবদিহি করতে ভয় পাই না; বরং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি; কিন্তু ৫৪ বছরের যে জঞ্জাল, তা পরিষ্কারের দায়িত্ব এ সরকারকে দিলে কিভাবে হবে? তবে পরিবেশ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা সংস্কার, নদ-নদী ও জলাশয় সুরক্ষা এবং শব্দ ও বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

বেন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও বাপার সহসভাপতি ড. নজরুল ইসলাম বলেন, এ সরকারের আমলে অনেক সংস্কার কমিশন করা হলেও পরিবেশ ইস্যুতে কোনো কমিশন হয়নি। পরিবেশ সংস্কারের বিষয়টি জুলাই সনদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি মনে করি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁঁকি মোকাবেলা ও পরিবেশ সুরক্ষায় খণ্ডকালীন ও সীমিত প্রকল্প থেকে সরে এসে কৃষি, পানি, জীববৈচিত্য ও উপকূলীয় ব্যবস্থাপনাসহ সব খাতে সমন্বিত ও পদ্ধতিগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য জলবায়ুবান্ধব প্রযুক্তি প্রকৃতিনির্ভর সমাধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বেন-এর বৈশ্বিক সমন্বয়কারী ড. খালেকুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন সময় সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে সুবিভোগীরা পরিবেশ বিনষ্ট করছে। আমরা চাই না দেশের পরিবেশ নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়ুক; কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া দেশের পরিবেশ সুরক্ষিত হবে না। পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ বলেন, অনেক চেষ্টা হলেও পরিবেশের কোন উন্নয়ন হয়নি। আমাদের রিসোর্স কম; কিন্তু জনসংখ্যা বেশি। পরিবেশ উন্নত করতে হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা রিসোর্স বাড়াতে হবে। পরিবেশ নীতি পরিবর্তনের পাশাপাশি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সংস্কারের আহ্বান জানান তিনি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বিশেষজ্ঞ অধিবেশন শুরু হয়। এর আগে ‘রেজুলেশন অফ বাপা-বেন কনফারেন্স : ২০০০-২০২৫’, ‘সাসটেনেবল আরবানাইজেশন : চ্যালেঞ্জেস এ- সলিউশন’ এবং ‘২৫ ইয়ারস অফ বাপা : সাকসেস এ- চ্যালেঞ্জেস ইন এনভায়রণমেন্টাল মুভমেন্টস’ শীর্ষক তিনটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। দুই দিনের সম্মেলনে পানি উন্নয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, নগরায়ন ও ভৌত পরিকল্পনা, যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষি, মৃত্তিকা ও খাদ্য দূষণ, বায়ু, শব্দ ও পানি দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন, পাহাড়, টিলা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং উপকূল, বন্দর, ও সমুদ্র পরিবেশ সুরক্ষা ইস্যুতে সাতটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া সম্মেলনে বিশ্বের ১১৭ জন বিশেষজ্ঞ পরিবেশ-বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। সম্মেলন শেষে সুপারিশমালা তুলে ধরা হবে। দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞসহ ছয় শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন এ সম্মেলনে।

বাপা’র সাধারণ সম্পাদক মো: আলমগীর কবির বলেন, দেশের পরিবেশ রক্ষায় বাপা দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা পরিবেশ সংস্কার বিষয়ে এ বছরের সম্মেলনের আয়োজন করেছি। এ সম্মেলনে যেসব প্রস্তাব আসবে, সেটা আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে দেবো, যাতে তারা ইশতেহারে সেগুলোকে জায়গা দেয়।