এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ২৮৫ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়
আল-আরাফাহ ব্যাংকের এমডি ডিএমডিসহ ৮ জনকে বাধ্যতামূলক ছুটি
Printed Edition
- অধিকতর তদন্তের জন্য দুদককে অবহিত করার নির্দেশ
- বিমানবন্দরগুলোতে পাঠানো হয়েছে অভিযুক্তদের নাম
এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবসার মাধ্যমে ২৮৫ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়ের অভিযোগে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এমডি, ডিএমডিসহ আট শীর্ষ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামলূক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ গতকাল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সাথে তাদের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে এ বিষয়ে অবহিত করতে পর্ষদকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি অভিযুক্তরা যাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য বিমান বন্দরগুলোতেও অবহিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আল-আরাফাহ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
বাধ্যতামূলক ছুটি প্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরমান আর চৌধুরী, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ নাদিম, ডিএমডি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া ও ট্রেজারি বিভাগের প্রধান মো: আব্দুল মবিন। এ নিয়ে সাত ব্যাংকের এমডিকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আল-আরাফাহ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ নয়-ছয় করার অভিযোগ ছিল অনেক দিন যাবৎ। ২০১৫ সাল থেকে এ অভিযোগ থাকলেও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের কিছু দোসরদের কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছিল না। সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট দশ বছরের ব্যাংকটির এজেন্ট ব্যাংকের ওপর বিশদ পরিদর্শন পরিচালনা করে। এতেই বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার প্রমাণ মেলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কমিশনের ওপর সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও এজেন্ট কমিশন আত্মসাৎসহ বিবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং ডিভিশন ২০১৫ সাল থেকে শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ৩৬১ কোটি ১১ লাখ টাকা এজেন্ট কমিশন প্রদান করে। এ কমিশনের ওপর ২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০% হারে ৩৬.১১ কোটি টাকার মতো বিশাল অঙ্কের কর সরকারকে প্রদান করা হয়নি, যা গুরুতর অপরাধ ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের শামিল বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আবার এজেন্ট ব্যাংকিং গাইডলাইন অনুযায়ী এর মূল লক্ষ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমানত সংগ্রহের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসা। পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, আল-আরাফাহ ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং ডিভিশন সে লক্ষ্যে কাজ না করে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দ্বারা সংগৃহীত করপোরেট ডিপোজিট চাতুরি বিন্যাসের মাধ্যমে ব্যাংকের বিশেষ এজেন্টদের মাধ্যমে সংগ্রহ দেখিয়েছেন এবং ১২ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশ মুনাফা দিয়েছেন। আবার তা থেকে দেড় থেকে দুই শতাংশ কমিশনও নিশ্চিত করেছেন। পরিদর্শনে দেখা যায়, ওই কমিশনের মধ্যে করপোরেট ডিপোজিটের এজেন্ট আউটলেটকে দেয়া হয় মোট ১০৯ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা এজেন্ট ব্যাংকিং ডিভিশনের কর্মকর্তারা যোগসাজশে নিজস্ব আউটলেটের মাধ্যমে বের করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। আর এ কাজের সাথে এফএডি, এইচআরডি, ট্রেজারি ও আইসিটি ডিভিশনেরও সহযোগিতা রয়েছে এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মদদ রয়েছে। করপোরেট ডিপোজিট এজেন্ট আউটলেটে নেয়ার জন্য ডিভিশনগুলো তথা এফএডি, ট্রেজারি ও আইসিটি কর্তৃক ডিপোজিটের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করা হয়। এবং এজেন্ট কমিশন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাংকের প্রেসক্রাইব রেটের থেকে উচ্চ রেটে ডিপোজিট সংগ্রহ করে ব্যাংকের ২৮৫ কোটি ২৫ লাখ কোটি টাকার মতো অতিরিক্ত খরচে বাধ্য করে ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি সাধন করেন।
এ দিকে এমডি, ডিএমডি ও এফএডি এবং এজেন্ট ব্যাংকিং ডিভিশনের কর্মকর্তারা সরকারি কর ফাঁকি ও হিসাব বহির্ভূত আয় আড়াল করার লক্ষ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং ডিভিশনের জিএল হেড ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের ব্যক্তিগত অর্থ লেনদেন করেন যা অনৈতিক। এ ধরনের কর্মকাণ্ড এফএডি ও আইসিটি বিভাগের সহযোগিতা নিয়ে করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকের এমডি ফরমান আর চৌধুরীর অনুকূলে ৫১ লাখ ৯০ হাজার টাকার এবং এফএডি বিভাগের প্রধান ও সিএফও মোহাম্মদ নাদিমের অনুকূলে এক লাখ ৯০ হাজার টাকার দু’টি সমন্বয় ভাউচার করা হয়, যেখানে কারণ হিসেবে বলা হয়- অতিরিক্ত ইনসেন্টিভ বোনাস গ্রহণ বাবদ। একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিএফও প্রাপ্যতার অতিরিক্ত ইনসেন্টিভ গ্রহণ করার বিষয়টি অনৈতিক ও ব্যাংকের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ এবং বিশ্বস্ততার বরখেলাপ। এ ধরনের অনৈতিক কর্মে লিপ্ত ব্যক্তিরা ব্যাংকের জন্যও ক্ষতিকর।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরমান আর চৌধুরীর নিয়োগপত্র পরীক্ষান্তে দেখা যায়, তিনি কেবল ব্যাংকের ক্যামেল রেটিং উন্নীত হলে ১০ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্য হবেন; কিন্তু ক্যামেল রেটিংয়ে উন্নীত না হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট গ্রহণ করেছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বোর্ডকে আড়ালে রেখে করা হয়েছে অর্থাৎ এ ধরনের অনৈতিক কাজে এফএডি সরাসরি সহযোগিতা করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টি অনুসন্ধানে এফএডি, এজেন্ট ব্যাংকিং ডিভিশন, ট্রেজারি ডিভিশন ও এইচআর এবং আইসিটিতে কর্মরত লোকবলের তালিকা চাওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, এফএডি-এ ২১ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৬ জন কর্মকর্তাই পাঁচ থেকে ২০ বছরের অধিক পর্যন্ত কর্মরত, অনুরূপ এজেন্ট ব্যাংকিং ডিভিশনে ৩০ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১১ জন কর্মকর্তা পাঁচ বছরের অধিক, ট্রেজারি ডিভিশনে ২০ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন কর্মকর্তা পাঁচ থেকে ১৪ বছরের অধিক, এইচআরডি-এ ২০ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৯ জন কর্মকর্তা পাঁচ থেকে ২১ বছর পর্যন্ত এবং আইসিটিতে ১২০ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৭৮ জন কর্মকর্তা পাঁচ থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত কর্মরত আছেন। ফলে দেখা যায়, সব বিভাগেই একাধিক কর্মকর্তা দীর্ঘ দিন যাবৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার নং ১৫/১৮-এর বিধান লঙ্ঘন করে কর্মরত আছেন যা সন্দেহজনক। এসব বিভাগের কর্মকর্তাদের বদলি ও বহাল সরাসরি এমডির নির্দেশেই হতো, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি বছরের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তা পরিপালিত হয়নি। এমনকি এসব কর্মকর্তার কখনোই ব্যাংকের কোনো শাখায় কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল না।
এমনি পরিস্থিতিতে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে এমডি, ডিএমডি ও সিএফওসহ আট কর্মকর্তাকে তিন মাসের বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়ার জন্য গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের কাছে সুপারিশ করা হয়। গভর্নর এ বিষয়ে অনুমোদন করার পর ব্যাংকের পর্ষদ গতকালই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা পরিপালন করে। গতকাল ব্যাংকটির পর্ষদ থেকে আটজনকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর বিষয়ে প্রত্যেককে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে।