বায়তুল মোকাররমের ইফতার : ঐতিহ্য ইতিহাস ও ভ্রাতৃত্বের অনন্য মিলনমেলা

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

যখন আকাশছোঁয়া মিনারের চূড়া থেকে মুয়াজ্জিনের মায়াবী কণ্ঠে মাগরিবের আজান ধ্বনিত হয়, তখন রাজধানীর ব্যস্ততম মোড় পল্টনের সব শোরগোল যেন এক অপার্থিব শান্তিতে থমকে দাঁড়ায়। এই সেই বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ রাজধানীর মুসলমানদের আধ্যাত্মিক হৃৎপিণ্ড। গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই মসজিদের বিশাল চত্বর কেবল সিজদাহর সাী নয়, বরং রমজানের তপ্ত দুপুরে ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য পাঠশালা হিসেবেও পরিচিত। একই দস্তরখানায় যখন একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আর শহরের এক রিক্ত পথশিশু কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসে ইফতারের অপোয় মুনাজাত করেন, তখন ধুলোবালির এই পৃথিবীতে ইসলামের চিরকালীন সাম্য আর ‘উম্মাহর’ অটুট বন্ধন জীবন্ত হয়ে ওঠে। এটি কেবল একবেলা আহারের আয়োজন নয়; এটি ভালোবাসা, ত্যাগ এবং তৌহিদী জনতাকে এক সুতায় বাঁধার এক ঐতিহাসিক মহোৎসব।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ১৯৫৯ সালে। বিশিষ্ট শিল্পপতি লতিফ বাওয়ানি ও তার পরিবারের উদ্যোগে ‘বায়তুল মোকাররম মসজিদ সোসাইটি’ গঠনের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু। ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৬৩ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রথম জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কাবার আদলে নির্মিত এই মসজিদটি বর্তমানে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু।

ইফতারের বিবর্তন

মসজিদ চালুর প্রথম দিক থেকেই স্থানীয় মুসল্লি ও ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে ছোট পরিসরে প্রতি রমজানে ইফতারের প্রচলন শুরু হয়। শুরুর দিকে এটি কেবল সাধারণ খেজুর ও পানি বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আশির দশকের পর থেকে এটি বিশাল এক উৎসবে রূপ নিতে শুরু করে। বর্তমানে এটি কেবল ঢাকা নয়, বরং সারা বিশ্বের অন্যতম বড় ‘গণ-ইফতার’ হিসেবে পরিচিত।

বায়তুল মোকাররমে সরকারিভাবে ইফতারের আয়োজন ও বাজেট বরাদ্দ শুরু হয় মূলত ১৯৭৫ সাল থেকে। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৫ সালের ২৮ মার্চ ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ গঠিত হয়। এর পর থেকেই মসজিদের ব্যবস্থাপনা ও ইফতার কার্যক্রম সরকারি কাঠামোর অধীনে আসে।

পরবর্তিতে ১৯৮২ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে বায়তুল মোকাররমকে ‘জাতীয় মসজিদ’ হিসেবে ঘোষণা করা হলে ইফতারের বাজেট ও পরিধি আরো বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতি বছর রমজান মাসে একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করে। এই বাজেট থেকে মূলত মৌলিক ইফতার সামগ্রী (খেজুর, মুড়ি, ছোলা, শরবত) এবং প্যান্ডেল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

রমজান মাসের বিশেষ কর্মসূচি

রমজান মাসজুড়ে বায়তুল মোকাররমে বহুমুখী ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয় এই মসজিদে।

তাফসিরুল কুরআন: প্রতিদিন বাদ জোহর দেশবরেণ্য আলেমদের মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের তাফসির।

ইসলামী বইমেলা: মসজিদের দণি চত্বরে মাসব্যাপী বিশাল ইসলামী বইয়ের আয়োজন।

কিয়ামুল লাইল ও ইতিকাফ: রমজানের শেষ দশকে শত শত মুসল্লির জন্য রাতভর ইবাদত ও ইতিকাফের বিশেষ ব্যবস্থা।

খতম তারাবি: হাফেজদের সুমধুর কণ্ঠে মাসব্যাপী কুরআনের তিলাওয়াত। বর্তমানে প্রতিদিন এখানে গড়ে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ মানুষ এক সাথে ইফতার করেন। এর মধ্যে একটি অংশ সরকারি বাজেটে (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) এবং একটি বড় অংশ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ মুসল্লি কমিটি ও বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়। ফলে মেনুতে সাধারণ সামগ্রীর পাশাপাশি উন্নত খাবারও যোগ হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ-মার্কেট বিভাগের সহকারী পরিচালক শাহাবুদ্দীন জানান, প্রতিদিন গড়ে ১৫০০ থেকে ২০০০ জন রোজাদারের ইফতার সরাসরি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প থেকে সরবরাহ করা হয়। এর জন্য ফাউন্ডেশন থেকে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, একটি বড় প্লেটে পাঁচজন রোজাদারের ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। এই আয়োজনের বাইরে আরো ১৫শ’ থেকে দুই হাজার জনের ইফতারের দায়িত্ব পালন করে মসজিদ কমিটি এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা। মূলত সরকারি ও বেসরকারি এই সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রতিদিন প্রায় চার-পাঁচ হাজার মানুষের মেজবানি সম্পন্ন হয়।

দস্তরখানার মেনু

পাঁচজন মানুষের জন্য একটি প্লেটে পরিবেশন করা হয় সুষম ও ঐতিহ্যবাহী খাবার। পাঁচটি করে আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু ও জিলাপি। সাথে মৌলিক সামগ্রী ৮-১০টি খেজুর, ছোলাবুট ও মুড়ি এবং পাঁচটি আধালিটার পানির বোতল।

বায়তুল মোকাররমের ইফতারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সাম্য। এখানে কোনো ধনী-দরিদ্রের দেয়াল নেই। একজন দিনমজুর ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একই দস্তরখানায় বসে ইফতার করেন। কয়েক হাজার মানুষের একযোগে মুনাজাত এবং আজানের ধ্বনিতে ইফতার গ্রহণ করার দৃশ্যটি ঢাকার মুসলিম ঐতিহ্যের এক পরম নিদর্শন। এই আয়োজন কেবল ক্ষুধা নিবারণ নয়, বরং মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার বন্ধন দৃঢ় করে। বায়তুল মোকাররমের ইফতার এখন কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংহতির প্রতীক। সরকারি সহায়তা এবং বেসরকারি দানশীলতার সমন্বয়ে এই ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে টিকে আছে।