র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের বিল সংসদে
নতুন বাহিনীর হাতে তল্লাশি জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা
Printed Edition
- ‘চুন খেয়ে মুখ পুড়েছে, এখন দই দেখলেও ভয় লাগে’: বিরোধীদলীয় নেতা
- ‘মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা যায় না’ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- এসআরবি গঠন ‘নতুন মোড়কে র্যাব’: নাহিদ ইসলাম
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতায় ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামের একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এই বাহিনীকে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়ার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার দেয়া হচ্ছে। একই সাথে গুম, ভূমিদস্যুতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করতে পারবে নতুন এই ইউনিট। এসব বিধান রেখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন-২০২৬’ নামের বিলটি গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের বিরোধিতা করেন বিরোধীদলের সদস্যরা। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে বিলটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটিকে চার দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই আইন কার্যকর হলে র্যাব গঠনসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধান রহিত হবে।
‘চুন খেয়ে মুখ পুড়েছে, এখন দই দেখলেও ভয় লাগে’-বিরোধীদলীয় নেতা
র্যাব বিলুপ্তির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, অতীত অভিজ্ঞতার কারণে নতুন কোনো বাহিনী গঠনের আগে তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। র্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা জাতিকে ট্রমার মধ্যে রেখেছে। তিনি মন্তব্য করেন, ‘একবার চুন খেয়ে মুখ পুড়েছে, এখন দই দেখলেও ভয় লাগে। জাতি আজ ট্রমাটাইজড।’
র্যাবের অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। এসব জুলুমের কথা মনে পড়লে এখনো মানুষ ঘুমাতে পারেন না।
নতুন বাহিনী গঠন নিয়ে যেন জনমনে সন্দেহ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, জনগণের কাছে যেন মনে না হয় কেবল পোশাক বদলে একই বাহিনীকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ‘জাস্ট অ্যাপ্রনটা চেঞ্জ করা হয়েছে’-এমন ধারণা যেন তৈরি না হয়। বরং প্রমাণ করতে হবে, নতুন বাহিনীর পুরো কাঠামো ও ধারণাই বদলে গেছে। বিলটি আরো গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য উত্থাপন পিছিয়ে আগামী সপ্তাহে নেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
‘মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা যায় না’-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিলটি উত্থাপন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ীই র্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে। তবে সাইবার অপরাধ, জুয়া ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ মোকাবেলায় পুলিশের অধীনে একটি আধুনিক এলিট ফোর্স প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন থেকেই এসআরবি গঠনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।
র্যাব ও পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, পুলিশের প্রধান ছিলেন কুখ্যাত বেনজীর। তাই বলে পুরো পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করা যায় না। ‘মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা যায় না।’ প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের ওপর রাজনৈতিক বা মাফিয়া প্রভাব থাকতে পারে, তবে এর জন্য পুরো সংস্থাকে দায়ী করা ঠিক নয়।
নতুন বাহিনীতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিলে সে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো সদস্য শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার বিচারে গঠিত কমিটিতে বেসরকারি সদস্য, মানবাধিকারকর্মী ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা থাকবেন। ফলে অতীতের র্যাবের মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না।
এসআরবি গঠন ‘নতুন মোড়কে র্যাব’: নাহিদ ইসলাম
‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ বিল উত্থাপনের বিরোধিতা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, র্যাব বিলুপ্ত করে একই জনবল দিয়ে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করা হলে তা হবে ‘নতুন মোড়কে র্যাবকে ফিরিয়ে আনা’। এটি মূলত র্যাবেরই পুনর্গঠন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে র্যাব গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘরের’ সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। এতে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত হয়। রাজনৈতিকভাবে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও ১১ দল-সবারই প্রতিশ্রুতি ছিল র্যাব বিলুপ্ত করার।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের আগেও বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি র্যাব বিলুপ্তির কথা বলেছিল। তবে র্যাব বিলুপ্ত করে একই ধরনের অন্য প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা তখন বলা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে র্যাবে সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সামরিক বাহিনী ও পুলিশ-দুই প্রতিষ্ঠানকেই নিপীড়নের হাতিয়ার বানানো হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো থেকেও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ এসেছিল।
পুলিশের এমন বিশেষায়িত ইউনিটের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, র্যাব ছিল ফ্যাসিবাদী আমলের এক ‘ক্ষতচিহ্ন ও আতঙ্কের প্রতীক’। তাই আগে র্যাব বিলুপ্ত করা হোক। পরবর্তীতে পুলিশের কোনো বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন হলে আলোচনা করে নতুন আইন আনা যেতে পারে।
আধুনিক বিশেষায়িত ইউনিটের প্রয়োজন
বিলে বলা হয়, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য একটি আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। এতে বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংক্রান্ত বিবৃতিতে বলা হয়, অপরাধের ধরন পরিবর্তন ও জাতীয় নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল একটি আধুনিক ইউনিট প্রয়োজন। আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এসআরবি পরিচালনার লক্ষ্যেই বিলটি আনা হয়েছে।
পুলিশের আওতায় এসআরবি
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, পুলিশের আওতায় এসআরবি পরিচালিত হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী, শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্ধারিত সংখ্যার কর্মকর্তা ও সদস্যকে পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এটি গঠন করা হবে। এর সদর দফতর হবে ঢাকায়।
এসআরবির প্রধান হিসেবে থাকবেন একজন মহাপরিচালক। বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক বা তার ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার তাকে নিয়োগ দেবে। মহাপরিচালক ইউনিটটির প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
সন্ত্রাস, মাদক থেকে গুম ও ভূমিদস্যুতায় ব্যবস্থা
বিলে এসআরবির দায়িত্বের পরিধি বিস্তৃত রাখা হয়েছে। জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে এটি কাজ করতে পারবে।
পাশাপাশি গুম, ভূমিদস্যুতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারবে বাহিনীটি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্য বাহিনীকে সহায়তা করবে তারা। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে যেকোনো ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের ক্ষমতাও দেয়া হচ্ছে এসআরবিকে।
তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হবে। পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন-এমন কর্মকর্তা তদন্তকারীর আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। তবে কাউকে গ্রেফতার বা আলামত জব্দ করার পর তা এসআরবির হেফাজতে রাখা যাবে না। অনতিবিলম্বে গ্রেফতার ব্যক্তি বা জব্দ আলামত নিকটস্থ থানায় হস্তান্তর করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দিতে হবে।
কর্তব্যে অবহেলাসহ অপরাধে কঠোর শাস্তি
বিলে কর্তব্যে অবহেলা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ অমান্য, দায়িত্ব পালনকালে নেশাগ্রস্ত থাকা ও সহকর্মীর সাথে অসদাচরণকে শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ছাড়া অস্ত্র বা সরঞ্জাম হারানো, অবৈধ অর্থ আদায়, জমি দখল, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা মাদকের সাথে জড়িত হওয়াকেও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন বলা হয়েছে।
এসব অপরাধে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অব্যাহতি, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত এবং বেতন-ভাতা বা জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্তের মতো গুরুদণ্ডের বিধান রয়েছে। লঘুদণ্ড হিসেবে রয়েছে জরিমানা, তিরস্কার এবং নির্দিষ্ট সময়ের আটক বা শাস্তিমূলক ড্রিল। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কাউকে শাস্তি দেয়া যাবে না। বিভাগীয় আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ থাকবে।
এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তিতে ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরের প্রতিনিধির পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার সংরক্ষণে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞ ব্যক্তি থাকবেন।
শেষ পর্যন্ত সমঝোতা
বিরোধীদলীয় নেতার আপত্তি ও পর্যালোচনার সময় বাড়ানোর দাবির প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রস্তাব করেন, বিলটি উত্থাপিত হয়ে সংসদের সম্পত্তি হিসেবে থাকুক। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয় এবং কমিটিকে চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
আরো দুই বিল উত্থাপন
সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উত্থাপন করেন ‘ব্যাংক রেজুলিউশন আইন-২০২৬’ বিল। বিল দু’টিও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।