জনপ্রশাসনে অসন্তোষ আছে বহু বছর ধরে। বিরোধী রাজনীতির সাথে ন্যূনতম সম্পর্ক আছে এমন কর্মকর্তাদের নির্বিচারে ওএসডি করেছে পতিত হাসিনা সরকার। কাউকে চাকরিচ্যুত করেছে। পদোন্নতি, পদায়ন, সুবিধাদি পাওয়ার ক্ষেত্রে চরমভাবে বঞ্চিত ও নিগৃহীত হয়েছেন জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ভাবধারার কর্মকর্তারা।
লক্ষণীয় হলো বিগত সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার কোনো রকম ন্যায়নীতির তোয়াক্কা করেনি। দক্ষতা, যোগ্যতা দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি। ধার ধারেনি প্রশাসনিক নিয়মকানুনের। প্রচলিত সব রীতিনীতি ভেঙে নিজেদের অনুগত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে তুলে এনেছে। দুই বা তিনজন ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি ঊর্ধ্বতনকে ডিঙিয়ে পছন্দের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। গোটা দেশের মতো জনপ্রশাসনেও কায়েম করা হয় দলতন্ত্র। ফলে পেশাদার ও যোগ্য আমলাদের অনেকে বঞ্চনা, হতাশা, অপমান ও পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্থকষ্টে মারা গেছেন। অনেকে ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছেন।
গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর পুরো দেশবাসীর মতো জনপ্রশাসনের বঞ্চিত কর্মকর্তারাও আশায় বুক বেঁধেছিলেন এবার নিশ্চয় তাদের বঞ্চনার অবসান ঘটবে। সুদিন না এলেও হয়তো নিয়মনীতি ফিরে আসবে এবং তাদের হারানো অধিকার ফিরে পাবেন। অবশ্য, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে এ বঞ্চনার অবসানে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবু অভ্যুত্থান-পরবর্তী আট মাস চলে গেলেও অনেকের বঞ্চনার অবসান হয়নি। কারণ, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ অনেকে এখনো জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। অথচ এরাই নানাভাবে মদদ দিয়ে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট শাসককে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের কাজ করেছেন । শুধু তাই নয়, এখনো নানা কায়দায় তারা সব ধরনের সুবিধা বাগিয়ে নিতে সচেষ্ট। এ যেন এক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। আর আওয়ামীপন্থী নন, তারা বঞ্চিত থেকেই যাবেন।
শেখ হাসিনার আস্থাভাজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত এবং সুবিধাবাদীরা এখনো ‘নানা কৌশলে’ পদোন্নতি বাগিয়ে নিচ্ছেন। যাদের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে কিংবা বাছাই করা হয়েছে তাদের অনেকে অতীতে প্রশাসনের বিভিন্ন লোভনীয় পদে পোস্টিং পেয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। এ জন্য স্বাভাবিকভাবে জনপ্রশাসনে নতুন করে অসন্তোষ সৃষ্টির কারণ ঘটেছে। এতে সাড়ে ১৫ বছর বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো শেখ হাসিনার আমলে বারবার পদোন্নতি পেয়েছেন, সবসময় ভালো জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন, প্রতিবার পদোন্নতি পেয়ে অন্য কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে টুঙ্গীপাড়ার মাজার জিয়ারত করেছেন; তাদেরও কেউ কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন। এদের কেউ কেউ তো মুজিব ও আওয়ামী বন্দনায় পঞ্চমুখ ছিলেন, শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের পুরোধা ও নেপথ্য সংগঠক হিসেবেও জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। এসব দেখে এত দিনের বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন, পলাতক ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ আমলাদের এখনো কিভাবে এবং কার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পদোন্নতি ও পদায়ন করা হচ্ছে?
সঙ্গত কারণে এ কথা বলা যায়, জনপ্রশাসনে এখনো যে ক্ষোভ বিরাজ করছে, তা প্রশমনে ফ্যাসিবাদী জামানায় বঞ্চিত সব কর্মকর্তার বঞ্চনার অবসান ঘটাতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।