মুসলিম সমাজ তার অতীতকে কিভাবে বুঝবে এবং বর্তমানকে কিভাবে মূল্যায়ন করবে, সে বিষয়ে কোনো সুসংহত তাত্ত্বিক কাঠামো কি এখনো স্পষ্ট? এই জায়গায় ঐতিহ্য-উত্তরাধিকার (তুরাস) ও আধুনিকতার প্রশ্নে দু’টি চরম প্রবণতা দৃশ্যমান। একদিকে তুরাসকে নিঃশর্ত, অখণ্ড ও আক্ষরিক কর্তৃত্ব হিসেবে স্থির করে তার ঐতিহাসিক বিকাশ ও ব্যাখ্যাগত বৈচিত্র্য অস্বীকারের প্রবণতা দেখা যায়। অন্য দিকে আছে আধুনিকতাকে সর্বজনীন ও একমাত্র মানদণ্ড ধরে তুরাসকে অচল, পশ্চাৎপদ ও অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে বাতিল করার প্রবণতা।

তুরাস হলো মুসলিম উম্মাহর দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রার সম্মিলিত স্মৃতি; এমন এক ঐতিহাসিক চেতনা, যার মধ্যে সংরক্ষিত মুসলিম মননের সাফল্য, সংগ্রাম, বিতর্ক, ইজতিহাদ, আত্মসমালোচনা এবং সৃজনশীল অভিযাত্রার সমগ্র ইতিহাস। এর মধ্যে যেমন আছে তাফসির, হাদিস, ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, কালাম, তাসাউফ ও দর্শন; তেমনি আছে ভাষাতত্ত্ব, সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, স্থাপত্য, নগরসভ্যতা, রাষ্ট্রচিন্তা ও সামাজিক সংগঠনের অভিজ্ঞতাও। অর্থাৎ, তুরাস কোনো একক শাস্ত্র বা মতবাদ নয়; এটি একটি সভ্যতার সঞ্চিত আত্মজ্ঞান।

তুরাস মুসলিম উম্মাহকে ইতিহাসহীনতা থেকে রক্ষা করে। একটি জাতি যেমন স্মৃতিহীন হলে আত্মপরিচয় হারায়, তেমনি তুরাস হারালে একটি সভ্যতার জ্ঞানের স্রোতধারা শুকিয়ে যায়। কারণ তুরাস কেবল অতীতের তথ্য সংরক্ষণ করে না; এটি অতীতের সাথে বর্তমানের সংলাপের ক্ষেত্রও তৈরি করে। এর মাধ্যমে একটি সভ্যতা জানতে পারে, সে কোথা থেকে এসেছে, কিভাবে চিন্তা করেছে, কোনো সমস্যার মুখোমুখি হয়ে কিভাবে সমাধান করেছে এবং আজকের সমস্যার সমাধান কোথায় খুঁজবে ।

উম্মাহর একটি ধারা তুরাসকে এমন আক্ষরিক ও প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণ করেছে, যার ফলে এটি জীবন্ত ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার হওয়ার বদলে হয়ে উঠেছে একটি বন্ধ ও সম্পন্ন জগৎ, যাকে ঘিরে নতুন চিন্তা করাও তারা বিপজ্জনক মনে করেন। অন্য দিকে আরেক দল আধুনিকতার বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যে করুণভাবে প্রভাবিত। তারা তুরাসকে অচল, অকার্যকর এবং অগ্রগতির অন্তরায় হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। তাদের কাছে ইতিহাস মানেই পশ্চাৎমুখিতা, আর আধুনিকতা মানেই মুক্তি ও উন্নয়ন। ফলত মুসলিম সমাজ এক দিকে অন্ধ ঐতিহ্যবাদে এবং অন্য দিকে অন্ধ আধুনিকতাবাদে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

কিন্তু এই দুই অবস্থানই মূলত একই ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক দুর্বলতার প্রকাশ। কারণ উভয় ধারাই তুরাস ও আধুনিকতাকে স্থির, একরৈখিক ও অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা হিসেবে কল্পনা করে। অথচ বাস্তবতা হলো, তুরাস কোনো মৃত অতীত নয় এবং আধুনিকতাও কোনো একক, নিরপেক্ষ বা সর্বজনীন সত্য নয়।

তুরাসের মধ্যে রয়েছে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিভিন্ন যুগের মুসলিম মনীষীদের চিন্তা, ইজতিহাদ, বিতর্ক, সমালোচনা, পুনর্ব্যাখ্যা এবং জ্ঞান-উৎপাদনের সমগ্র ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। অন্য দিকে আধুনিকতা ইউরোপীয় ইতিহাসের বিশেষ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতা থেকে উৎপন্ন একটি নির্দিষ্ট সভ্যতাগত প্রকল্প, যার নিজস্ব দর্শন, মূল্যবোধ, ক্ষমতার কাঠামো এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক পূর্বধারণা আছে। এর কেন্দ্রে আছে সেক্যুলারিজম, অর্থাৎ ধর্মকে জ্ঞানব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইহজাগতিক যুক্তিকে চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এই সেক্যুলার জ্ঞানতত্ত্বে জ্ঞানকে প্রায়ই মূল্যনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন হিসেবে কল্পনা করা হয়। ফলে জ্ঞান যে ক্ষমতা, নৈতিকতা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাথে গভীরভাবে যুক্ত- এই বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়। একই সাথে ইহজাগতিকতা, খোদাবিচ্ছিন্ন যুক্তিবাদ ও ব্যক্তিবাদ আধুনিকতার মৌল ভিত্তি হিসেবে মানবকে একটি আত্মনির্ভর বিচ্ছিন্ন সত্তায় রূপান্তরিত করে।

আধুনিকতার উন্নয়ন-দর্শনে পশ্চিমা অভিজ্ঞতাকে ইতিহাসের টেলিওলজিক লক্ষ্য হিসেবে স্থাপন করে। ফলে অন্যান্য সভ্যতার নিজস্ব সময়চেতনা, নৈতিক কল্পনা ও জ্ঞান-পরম্পরাকে সে প্রান্তিক বানায়। অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক যুক্তিতে মানুষ কেবল উৎপাদন ও ভোগের একক হিসেবে পুনর্গঠিত হয়। এতে মানব অস্তিত্বের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও অর্থবহ মাত্রা সঙ্কুচিত হয়। একইভাবে আধুনিক ইতিহাসচেতনা ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে মানব ইতিহাসের মানদণ্ড বানিয়ে অন্য সভ্যতাকে পশ্চাৎপদতার শ্রেণীতে স্থাপন করে।

অতএব আধুনিকতা কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; এটি এক পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানতাত্ত্বিক ও সভ্যতাগত শাসনব্যবস্থা।

আধুনিকতার ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশ সমালোচনামূলক বোধ হারিয়েছে। তারা আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবনের সাথে আধুনিকতার দার্শনিক ভিত্তিকে একীভূত করে ফেলেছে। ফলে আধুনিকতার ভেতরে নিহিত সেক্যুলারিজম, ব্যক্তিবাদ, ভোগবাদ, উপযোগবাদ কিংবা জ্ঞান ও নৈতিকতার বিচ্ছিন্নতার মতো ধারণাগুলোকে নিরপেক্ষ ও অবশ্যম্ভাবী সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।

মুসলিম উম্মাহর চ্যালেঞ্জ বাস্তবে তুরাস বনাম আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ নয়; এটি মূলত স্বাধীন সভ্যতাগত অবস্থান নির্মাণের চ্যালেঞ্জ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তুরাসের সাথে থাকবে ধারণ ও সৃজনশীল পুনরাবিষ্কারের সম্পর্ক, আর আধুনিকতার সাথে থাকবে সমালোচনামূলক সংলাপের সম্পর্ক। কারণ মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিহিত আছে এমন এক নবায়িত বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রায়, যেখানে ঐতিহ্য হবে শিকড়, ওহি হবে দিকনির্দেশনা, যুক্তি হবে অনুসন্ধানের উপায় এবং ভবিষ্যৎ হবে সৃজনশীল নির্মাণের ক্ষেত্র।

ইসলামের ইতিহাসের দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, ইসলামী সভ্যতার প্রকৃত শক্তি যেভাবে তার সংরক্ষণক্ষমতায় নিহিত, তেমনি তার পুনর্নির্মাণক্ষমতায়। ইসলামী সভ্যতা একটি জীবন্ত জ্ঞান-সভ্যতা, যা ওহির চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে ইতিহাসের পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সাথে নিরন্তর সংলাপে প্রবেশ করেছে।

এখানেই তাজদিদ পরিভাষার গভীর তাৎপর্য নিহিত। ইসলামী পরিভাষায় তাজদিদ কখনো নতুন ধর্ম সৃষ্টি নয়, আবার নিছক অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং এটি হলো ওহি-সুন্নাহের মূলনীতির পুনরুজ্জীবন, পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যে তার নতুন কার্যকারিতা ও নতুন প্রাণশক্তির বিস্তার। তাজদিদ এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মুসলিম সমাজ তার মূল উৎসের প্রতি আরো বেশি বিশ্বস্ত হয়। আবার নতুন বাস্তবতার জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা, প্রতিষ্ঠান, পরাক্রম এবং সামাজিক রূপকল্প নির্মাণ করে। তাই তাজদিদকে একটি গতিশীল সভ্যতাগত প্রকল্প হিসেবেও বুঝতে হয়।

কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন মানুষ তুরাস অধ্যয়ন করে না; বরং উপাসনা করতে শুরু করে। ইতিহাস বোঝার পরিবর্তে ইতিহাসের পবিত্রকরণ শুরু হয়। ফলে ওহি, ইজতিহাদ এবং ঐতিহাসিক প্রয়োগ- এই তিন স্তরের পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়।

ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের পরিণত ধারাগুলো এই পার্থক্য সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন ছিল। এ জন্যই ক্লাসিক্যাল আলেমদের ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, তারা ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন, কিন্তু ঐতিহ্যের অক্ষরগুলোতে বন্দী ছিলেন না। ইমাম শাফেয়ি রহ:-এর মাজহাবে কদিম ও মাজহাবে জাদিদের পার্থক্য থেকে স্পষ্ট হয়, বাস্তবতার পরিবর্তন আইনগত ব্যাখ্যার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ইমাম আবু হানিফা রহ:-এর কিয়াস, ইস্তিহসান ও উরফের ব্যবহারও একই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। তা হলো শরিয়াহর উদ্দেশ্য বাস্তবতাকে অস্বীকার করা নয়; বরং তাকে ন্যায় ও কল্যাণের দিকে পরিচালিত করা।

লেখক : কবি, গবেষক

71.alhafij@gmail.com