মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ককাঠামো বিশ্বের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পারস্পরিক শুল্কনীতির কারণে দেশটির বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হয়েছে। এতে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হওয়া অধিকাংশ পণ্যের শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে। আগে তৈরী পোশাকের শুল্ক ছিল ১৫.১ শতাংশ থেকে ১৬.৫ শতাংশ।

বাংলাদেশের জন্য বড় রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। এই বাজারে একলাফে শুল্ক বেড়ে যাওয়ায় পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং কৃষিপণ্যের রফতানি অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি এসেছে তৈরী পোশাক খাত থেকে, যার একটি বড় অংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। শুল্ক বৃদ্ধিতে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে বাংলাদেশী পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে ক্রেতারা তুলনামূলক কম শুল্কযুক্ত বিকল্প দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের প্রভাব অন্য বাজারেও পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা।

দীর্ঘ সময় ধরে আমরা কেবল কয়েকটি দেশের বাজারের ওপর নির্ভর করছি। আর সেসব বাজারে গুটিকয়েক পণ্য পাঠাচ্ছি। এই সীমাবদ্ধতা আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই নীতিই প্রমাণ করছে।

সস্তা শ্রমের ওপর ভর করে কম দামের পোশাক উৎপাদনের একঘেয়ে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কৃত্রিম তন্তু, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে জোর দিতে হবে। জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মতো দেশগুলোতে রফতানি সম্প্রসারণ করতে হবে। পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, আইটি, চামড়া ও কৃষিপণ্যের খাতকে নীতিগত সহায়তা দিয়ে রফতানি বহুমুখীকরণ করতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, বন্দরব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কাস্টমস সেবা দ্রুত করার দাবি জানিয়ে আসছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। এই ঘাটতিগুলো দূর করতে পারলে উৎপাদনব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন পোশাক কারখানা এখন বাংলাদেশে। এই ‘টেকসই উৎপাদন’-এর বৈশ্বিক ভাবমর্যাদাকে আমাদের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

পরিবর্তিত বাণিজ্য পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী ও কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতি। প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা জোরদার করা। যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্ট শুল্কসঙ্কটের শুরুর দিকে বাংলাদেশে ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকারের হয়ে ওয়াশিংটনে ড. খলিলুর রহমান মার্কিন নীতিনির্ধারক, বাণিজ্য প্রতিনিধি ও সিনেটরদের কাছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, শ্রম খাতের সংস্কার এবং মার্কিন তুলা ব্যবহারের ওপর বাংলাদেশী পোশাকের নির্ভরশীলতার কৌশলগত দিকগুলো দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছিলেন। এতে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপের প্রাথমিক অবস্থান থেকে সরে এসেছিল।

এখন খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। বর্তমান বাস্তবতায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সীমিত আকারের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু করতে পারেন। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত কৌশলগত ও নীতিগত সংস্কারের দিকে হাঁটতে হবে। পাশাপাশি জোরদার অর্থনৈতিক কূটনীতি চালাতে পারলে আশা করা যায় সঙ্কট উত্তরণ সম্ভব হবে।