বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

আর্জেন্টিনার রূপকথা, মিসরের বিদায়

Printed Edition
messi
সমতাসূচক গোলের পর লিওনেল মেসির উল্লাস : ইন্টারনেট

ম্যাচের ৬৭ মিনিট পর্যন্ত স্কোরবোর্ড বলছিল ভিন্ন গল্প। দুই গোলে পিছিয়ে বিদায়ের শঙ্কায় কাঁপছিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিসও যেন সেই দুঃস্বপ্ন আরো গভীর করেছিল। কিন্তু শেষ ১৫ মিনিটে বদলে যায় সব হিসাব। ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিওনেল মেসি ও এনজো ফার্নান্দেজের টানা তিন গোলে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে ৩-২ ব্যবধানে মিসরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা।

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আটলান্টায় শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেও গোলের দেখা পায়নি আর্জেন্টিনা। উল্টো ১৫ মিনিটে কর্নার থেকে ইয়াসের ইব্রাহিমের হেডে এগিয়ে যায় মিসর। পেছনের দিক থেকে পেনাল্টি এরিয়ায় বল আসলে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে পেছনে ফেলে দুর্দান্ত হেড ইয়াসের ইব্রাহিমের। এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ডিফেন্ডারের নিখুঁত হেডটি। কী দারুণ শুরু! আর্জেন্টিনা পিছিয়ে।

প্রথম গোলের পর যেন আরো আত্মবিশ্বাসী মিসর। তবে জবাব দেয়ার দায়িত্বে থাকা আর্জেন্টিনা ম্যাচের ২১ মিনিটে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে বক্সে ফাউল করায় পেনাল্টি পায়। তাৎক্ষণিক সমতা ফেরানোর সুযোগ পেয়ে শট নিতে আসেন লিওনেল মেসি... না! আর্জেন্টিনার অধিনায়ক পেনাল্টি শট নিলেন এবং মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই হাতে বল ধরে স্পটকিকটি ঠেলে দিলেন বাইরে। আটলান্টায় দারুণ নাটকীয় দৃশ্য।

২৮ মিনিটে গোলরক্ষকের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে আবার বেঁচে গেল মিসর। ডান দিক থেকে নাহুয়েল মলিনার চমৎকার ক্রসে লিভারপুলের অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের জোরালো হেডারটি দুর্দান্ত রিঅ্যাকশন সেভে রুখে দেন মোস্তফা। ৩২ মিনিটে ২৫ গজ দূর থেকে মেসির নেয়া ফ্রি-কিক মানবপ্রাচীরকে পাশ কাটিয়ে বাঁক খেয়ে গোলের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। আরো একবার ব্যর্থতা ভর করল আলবিসেলেস্তেদের।

৩৯ মিনিটে আবার মিসরের গোলরক্ষকের বদৌলতে গোলবঞ্চিত আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনা ভাবছে তারা সমতায় ফিরেছে। বাম দিকে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ফাঁকা জায়গায় থেকে বলটি মাঝখানে টেনে আনেন, জুলিয়ান আলভারেজ জোরালো ও নিচু শট নেন, কিন্তু কোথা থেকে যেন এসে হাত লাগিয়ে বলটি বাইরে পাঠিয়ে দেন মিসরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। শেষ পর্যন্ত ১ গোলে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

বিরতি থেকে ফিরেই আক্রমণের ঝড় তুলে আর্জেন্টিনা। কিন্তু জালের দেখা পাচ্ছিল না তিন বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। উল্টো ধারার বিপরীতে কাউন্টার অ্যাটাকে ম্যাচের ৫৯ মিনিটে আরো একবার জালে বল পাঠাল মিসর। মিসর দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে মোহাম্মদ সালাহ বল বাড়িয়ে দেন মোস্তফা জিকোর দিকে। যিনি এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। কিন্তু এর আগে মিসরের অর্ধে ফাউল হলে সেই সুবাদে বল জালে ঢুকলেও গোলটি বাতিল করেন রেফারি।

তার একটি গোল বাতিল হলেও ৬৭ মিনিটে মোস্তফা জিকো আবারো বল জালে জড়ালেন। এটা একটা দুর্দান্ত গোল। মোহাম্মদ সালাহ আক্রমণ শুরু করেন এবং ডানদিকে দুর্দান্ত হাইসেম হাসানের দিকে বল বাড়িয়ে দেন। তিনি মাঝখানে বল বাড়িয়ে দেন এবং অরক্ষিত জিকো বলটি জালে জড়িয়ে দেন।

৭৯ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো গোল করে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলে। মেসির অ্যাসিস্টে ডান দিক থেকে বলটি বক্সে পাঠান এবং টটেনহ্যামের ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ফাঁকা পেয়ে ঘাড়ের সমস্ত শক্তি ব্যবহার করে সজোরে হেড গোল করেন। ৫ মিনিট পরই ম্যাচে ফেরে আর্জেন্টিনা। এবার মেসি বাঁচালেন! দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও বিশ্বকাপজয়ীরা সমতা ফেরাল। লাউতারো মার্টিনেজের হাত ধরে তৈরি হওয়া এই আক্রমণে বদলি খেলোয়াড় গঞ্জালো মন্তিয়েলের গায়ে লেগে বলটি মেসির কাছে চলে আসে। তিনি গোলে শট নেন, গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর বলটি হাতে পেলেও কেবল ওপরে ঠেলে দিতে পারেন এবং বলটি ক্রসবারের নিচের অংশে লেগে জালে প্রবেশ করে। এই চলমান বিশ্বকাপে ৮ গোল নিয়ে সবার ওপরে অবস্থান মেসির।

বিশ্বকাপ কেবল অসাধারণ সব নাটকীয়তা সৃষ্টি করেই চলেছে। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে আর্জেন্টিনার জয়ের নায়ক হয়ে গেলেন এনজো ফার্নান্দেজ। নির্ধারিত সময় শেষে যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে আর্জেন্টিনার ডি বক্সে ফেলে দেয়া হয় মোহাম্মদ সালাহকে। তিনি ভেবেছিলেন পেনাল্টি পেয়েছেন। কারণ একই রকম ফাউলের কারণে মিসর গোল করার পরও তা বাতিল করেছিলেন রেফারি।

এই সুযোগ আর্জেন্টিনা অন্য প্রান্তে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল। ডান দিক থেকে লাউতারো মার্টিনেজ ক্রস করলেন এবং চেলসির মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ ব্যাক পোস্টে উপস্থিত থেকে দুর্দান্তভাবে হেড করে মোস্তফা শোবেইরকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ালেন। রেফারি পেনাল্টি না দিয়ে গোলটি বৈধ ঘোষণা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মিসর। এতে কোচিং দলের একজন সদস্যকে বেঞ্চ থেকে লাল কার্ড দেখানো হয়।

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে প্রায় ছিটকেই গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তের তিনটি গোল কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। একটি পেনাল্টি মিস করেও গোল এবং অ্যাসিস্টে দলের জয়ে বড় অবদান রাখেন মেসি। এই জয়ে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ মিশন ধরে রাখল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।