আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধের অবসান ঘটায় বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) পায়। অর্জিত এ বিশাল জলরাশিকে ধরা হয়েছিল দেশের আগামী শতাব্দীর ‘জ্বালানি নিরাপত্তার চাবিকাঠি’। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পার হয়ে ২০২৬ সালেও গভীর সমুদ্রের সেই গ্যাস ব্লকে একটিও কূপ খনন করা যায়নি।

পতিত শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সম্ভাবনাময় গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গুরুত্ব না দিয়ে আমদানিনির্ভর জ্বালানিনীতি গ্রহণ করা হয়। এ জন্য সক্রিয় ছিল একটি শক্তিশালী ‘আমদানি লবি’ বা সিন্ডিকেট। যারা নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির কমিশন ও বাণিজ্যে বেশি আগ্রহী ছিল। ফলে দেশীয় অনুসন্ধান সংস্থা ‘বাপেক্স’ বা পেট্রোবাংলাকে সমুদ্রে নামানোর কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে যে নীতিগত দ্বিধা ও বিলম্ব, এর মূল্য চুকাতে হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষকে। বিগত বছরগুলোতে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির জন্য স্পট মার্কেট এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে দেদার খরচ করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় অর্থ। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, নীতিগত ভুলে অর্থনৈতিক খেসারত দিতে হয় আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি।

বিগত এক দশকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় দু’টি ক্ষতÑ বিদেশ থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অলস বসিয়ে রেখে বিপুল অঙ্কের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ (ভর্তুকি) প্রদান। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এবং পেট্রোবাংলা ও পিডিবির তথ্যানুযায়ী, ২০১৬-২৬ সাল পর্যন্ত এই দুই খাতে খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা, যার বেশির ভাগ পরিশোধ করতে হয়েছে মূল্যবান ডলারে।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতিতে সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অন্য দিকে, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, উৎপাদন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রয়োজন দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে দিয়ে সমুদ্রে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গ্যাসের অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নেয়া। এজন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নীতি প্রণয়নও জরুরি। এক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জ্বালানি সাশ্রয় এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে একক কোনো উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না হয়।

জ্বালানিনীতির সাফল্য শুধু বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলায় নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে নিহিত। অতীতের সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি, তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ জ্বালানি কৌশল গ্রহণের সময় এখন এসেছে। যেখানে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় আমদানির মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য বজায় থাকবে।