ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণ

Printed Edition

- শীর্ষ ২০ ব্যাংকেই ৫ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা মন্দ ঋণ, মোট কুঋণের ৯৩ শতাংশ

- পাঁচ ব্যাংকে ২ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা শ্রেণিকৃত ঋণ : প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা

আশরাফুল ইসলাম

দেশের ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট এখন আর কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক বা বিচ্ছিন্ন কিছু ঋণখেলাপির সমস্যা নয়। বিপুল খেলাপি ঋণ, সম্পদের মানের ভয়াবহ অবনতি, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধনের ওপর বাড়তে থাকা চাপ এবং দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্সÑ সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট এখন কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ জুন ২০২৬-এর শ্রেণিকৃত ঋণ ও প্রভিশন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে এর ভয়াবহ চিত্রই সামনে আসে।

তথ্যানুযায়ী দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণ ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা; অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন শ্রেণিকৃত।

আরো উদ্বেগজনক হচ্ছে শ্রেণিকৃত ঋণের গঠন। এর মধ্যে মন্দ ও তিজনক ঋণ পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা; অর্থাৎ মোট ব্যাংক ঋণের প্রায় ৩০ দশমিক ৯১ শতাংশ এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেগুলোকে মন্দ বা তিজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কিন্তু সঙ্কটের সবচেয়ে বড় দিক হলো এর কেন্দ্রীভবন। দেশের মোট কুঋণের পাঁচ লাখ ৩২ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা রয়েছে মাত্র ২০টি ব্যাংকে; অর্থাৎ মোট কুঋণের ৯৩ দশমিক ১০ শতাংশই শীর্ষ ২০ ব্যাংকের দখলে।

এ চিত্র শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণের ভয়াবহতাই প্রকাশ করছে না; বরং দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার কোথায়, কিভাবে এবং কোন ধরনের ঋণ বিতরণে বড় ধরনের ব্যর্থতা হয়েছেÑ সে প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

১৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার ঋণে শ্রেণিকৃত ৬ লাখ কোটি

৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণ ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিয়মিত ঋণ ১২ লাখ ৪৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা। বিপরীতে খেলাপি ঋণ ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যেÑ

* নিম্নমান : ১৯ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা

* সন্দেহজনক : ১৫ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা

* কুঋণ : পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা

অর্থাৎ শ্রেণিকৃত ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশই কুঋণপর্যায়ে রয়েছে।

এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শ্রেণিকৃত ঋণের সবটাই একই মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কিন্তু যখন শ্রেণিকৃত ঋণের বড় অংশ কুঋণ হয়ে যায়, তখন ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একই সাথে ব্যাংকের মুনাফা, প্রভিশন, মূলধন এবং ভবিষ্যৎ ঋণ দেয়ার সমতার ওপর চাপ বাড়ে।

শীর্ষ ২০ ব্যাংকে ৫ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা

কুঋণের ভিত্তিতে শীর্ষ ২০ ব্যাংকের চিত্র আরো ভয়াবহ।

তালিকা থেকে দেখা যায়, মাত্র পাঁচটি ব্যাংকের কুঋণই প্রায় দুই লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা; অর্থাৎ শীর্ষ কয়েকটি ব্যাংককেই বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণ কেন্দ্রীভূত।

এই কেন্দ্রীভবন ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বিশ্লেষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বড় ব্যাংকের বিপুল খেলাপি ঋণ শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সমস্যা নয়; তা আন্তঃব্যাংক লেনদেন, আমানত, তারল্য এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকে একাই প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা মন্দ ঋণ

সবচেয়ে বড় কুঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে। ব্যাংকটির মোট ঋণ এক লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে কুঋণ ৯৪ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা; অর্থাৎ ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৫০ দশমিক ০৩ শতাংশই কুঋণ। নিম্ন মান ও সন্দেহযুক্ত যুক্ত করলে ব্যাংকটির মোট শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ; অর্থাৎ দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকের অর্ধেকেরও বেশি ঋণ শ্রেণিকৃত হয়ে পড়েছে, যা ব্যাংকটির সম্পদের মান ও ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করে।

জনতা ব্যাংকে তিন-চতুর্থাংশ ঋণ শ্রেণিকৃত

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকও সঙ্কটের অন্যতম বড় কেন্দ্র। ব্যাংকটির মোট ঋণ এক লাখ ৯ হাজার পাঁচ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের ৭৫ দশমিক ০৫ শতাংশ। শুধু কুঋণের পরিমাণই ৭৫ হাজার ২০১ কোটি টাকা; অর্থাৎ ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই শ্রেণিকৃত এবং প্রায় পুরোটাই কুঋণপর্যায়ে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছেÑ ঋণ বিতরণের সময় ঝুঁকি মূল্যায়ন কোথায় ছিল, বড় ঋণগ্রহীতাদের সমতা কিভাবে যাচাই করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে এসব ঋণ খেলাপি হওয়ার পরও কী ধরনের পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করা হয়েছে?

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে প্রায় পুরো ঋণই শ্রেণিকৃত

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চিত্র আরো ভয়াবহ। ব্যাংকটির মোট ঋণ ৬২ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। কুঋণ ৬০ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ; অর্থাৎ ব্যাংকটির প্রায় পুরো ঋণ পোর্টফোলিওই শ্রেণিকৃত হয়ে পড়েছে।

এ ধরনের অনুপাত স্বাভাবিক ব্যবসায়িক ঝুঁকি বা সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন, বরং ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন, ঋণগ্রহীতা নির্বাচন, জামানত মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা কাঠামোÑ সব কিছুই এখানে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংকেও প্রায় পুরো ঋণ মন্দ

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণ ১৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ ১৪ হাজার ২১৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। কুঋণ ১৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা, বা মোট ঋণের ৯৬ দশমিক ৯২ শতাংশ।

অন্য দিকে ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট ঋণ ২৮ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। শ্রেণিকৃত ঋণ ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কুঋণ ২৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৬ দশমিক ০১ শতাংশ।

এসব ব্যাংকের েেত্র ঋণের মানের অবনতি শুধু আর্থিক সূচক নয়; বরং ব্যাংকের টেকসই অস্তিত্ব ও আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।

পাঁচ ব্যাংকে দুই লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা শ্রেণিকৃত

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকÑ এই পাঁচ ব্যাংকে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ প্রায় দুই লাখ ৩০ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে কুঋণ প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা; অর্থাৎ এই পাঁচ ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের প্রায় ৯৮ শতাংশই কুঋণ।

এই পাঁচ ব্যাংকের চিত্র ব্যাংকিং খাতে সম্পদমানের অবনতির একটি আলাদা কাস্টার বা গুচ্ছ তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ফলে শুধু পৃথক ব্যাংকের হিসাব না দেখে একই মালিকানা, একই ঋণগ্রহীতা গোষ্ঠী, আন্তঃব্যাংক ঋণ এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মালিকানা পরীা করা জরুরি।

প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো প্রভিশন ঘাটতি। তথ্যানুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ চার লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। বিপরীতে ব্যাংকগুলো প্রকৃত প্রভিশন রেখেছে দুই লাখ ৬১ হাজার ৪০ কোটি টাকা।

ফলে সামগ্রিক প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২২ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা; অর্থাৎ সম্ভাব্য ঋণ তি মোকাবেলায় যে সুরা সঞ্চিতি থাকার কথা, বাস্তবে তার বড় একটি অংশ অনুপস্থিত। এখানেই খেলাপি ঋণের প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি। একটি ব্যাংক ঋণ ফেরত না পেলে শুধু তার সম্পদ কমে যায় না; ওই ঋণের বিপরীতে সম্ভাব্য তি সামাল দিতে মুনাফা থেকে প্রভিশন করতে হয়। পর্যাপ্ত প্রভিশন না থাকলে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত মূলধনের ওপর চাপ পড়ে।

ফলে বিপুল খেলাপি ঋণের সাথে বড় প্রভিশন ঘাটতি যোগ হলে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক সমতা কাগজে প্রদর্শিত হিসাবের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

একই দেশে ভালো ব্যাংকও আছে

সব ব্যাংকের অবস্থা অবশ্য এক নয়। তথ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ কিছু ব্যাংক তুলনামূলকভাবে সম্পদের মান নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে-

* ব্র্যাক ব্যাংক : শ্রেণিকৃত ঋণ ২ দশমিক ০৫ শতাংশ

* ইস্টার্ন ব্যাংক : ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ

* সিটি ব্যাংক : ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ

* প্রাইম ব্যাংক : ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ

* পূবালী ব্যাংক : ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ

* ব্যাংক এশিয়া : ৭ দশমিক ৮২ শতাংশ

অন্য দিকে কয়েকটি ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৫০, ৭০ এমনকি ৯০ শতাংশের ওপর।

এই বৈপরীত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি পুরো সঙ্কট কেবল মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক মন্দা, উচ্চ সুদ বা সামষ্টিক অর্থনীতির কারণে হতো, তাহলে একই অর্থনৈতিক পরিবেশে সব ব্যাংকের ঋণের মানে এত বড় পার্থক্য হওয়ার কথা নয়।

এ থেকে অনুমান করা যায়, ব্যাংক ভেদে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদের কার্যকারিতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণগ্রহীতা নির্বাচন এবং ঋণ আদায়ের সংস্কৃতি বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিদেশী ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণ মাত্র ৪.৯৪ শতাংশ

দেশীয় অনেক ব্যাংকের বিপরীতে বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশী ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত চিত্র তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। তথ্যানুযায়ী বিদেশী ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত শ্রেণিকৃত ঋণ তিন হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের মাত্র ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

তাদের কুঋণ দুই হাজার ৪৭২ কোটি টাকা, বা মোট ঋণের ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। অন্য দিকে রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩৬ দশমিক ২১ শতাংশ।

এই বৈপরীত্য আবারো সেই প্রশ্ন সামনে আনেÑ ব্যাংকের মালিকানা, পরিচালনা কাঠামো, রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ধরন কি খেলাপি ঋণের মাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে?

খেলাপি ঋণ অর্থনীতির ওপর অদৃশ্য কর

খেলাপি ঋণের তি শুধু ব্যাংকের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথমত, ব্যাংকের বিপুল অর্থ আটকে থাকায় উৎপাদনশীল খাতে নতুন ঋণ দেয়ার সমতা কমে যায়। এতে ভালো উদ্যোক্তারাও অর্থায়ন সঙ্কটে পড়েন।

দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি কমাতে ব্যাংক ঋণের সুদ ও অন্যান্য চার্জ বাড়াতে পারে। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।

তৃতীয়ত, প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করতে ব্যাংকের মুনাফা য় হয়। মুনাফা কমে গেলে নতুন মূলধন সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।

চতুর্থত, দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা কিংবা সরকারের মূলধন সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। তখন বেসরকারি খাতে সৃষ্ট ঋণঝুঁকির একটি অংশ শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থের ওপর চাপিয়ে দেয়ার আশঙ্কা থাকে;

অর্থাৎ খেলাপি ঋণকে বলা যায় অর্থনীতির ওপর একটি অদৃশ্য কর; যার সরাসরি বিল কোনো নাগরিকের হাতে আসে না, কিন্তু আমানত, সুদ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সরকারি অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে সবাইকে এর মূল্য দিতে হয়।

এখন প্রয়োজন ঋণের ‘ফরেনসিক অডিট’

বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রকাশ করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন ব্যাংকভিত্তিক ও ঋণগ্রহীতাভিত্তিক ফরেনসিক অডিট।

বড় ঋণগ্রহীতার পূর্ণাঙ্গ অডিট : প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ৫০ বা ১০০ ঋণগ্রহীতার ঋণ, জামানত, অর্থের ব্যবহার, পরিশোধের ইতিহাস এবং বর্তমান সম্পদ যাচাই করতে হবে।

প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ : একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির নামে কত ঋণ নিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মালিক কে এবং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কীÑ তা বের করা জরুরি।

পুনঃতফসিলের হিসাব : কত ঋণ কতবার পুনঃতফসিল হয়েছে, পুনঃতফসিলের পর কত ঋণ আবার খেলাপি হয়েছে এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক সমতা ছাড়া কত ঋণ শুধু হিসাবের খাতা পরিষ্কার রাখতে পুনর্গঠন করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা দরকার।

জামানতের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ : ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে থাকা জামানতের বাজারমূল্য এবং দ্রুত বিক্রি করলে পাওয়া যেতে পারে এমন অর্থের মধ্যে কতটা পার্থক্য রয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রভিশন ও মূলধনের প্রকৃত অবস্থা : ব্যাংকগুলোর ঘোষিত মুনাফা ও মূলধনের পাশাপাশি সম্ভাব্য সব ঋণ তি হিসাব করে ক্ষতি নিরূপণ করা দরকার। এতে বোঝা যাবে কোন ব্যাংক প্রকৃতপে টেকসই এবং কোন ব্যাংক কৃত্রিমভাবে টিকে আছে।

ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্তকরণ : ব্যবসায়িক ব্যর্থতা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে এক করে দেখা যাবে না। প্রকৃত ব্যবসায়িক তির শিকার ঋণগ্রহীতার জন্য পুনর্গঠন যেমন প্রয়োজন, তেমনি সমতা থাকা সত্ত্বেও অর্থ ফেরত না দেয়া ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

মূল প্রশ্নÑ এই বিপুল অর্থ গেল কোথায়?

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন শুধু ‘খেলাপি ঋণ কত’ নয়।

প্রশ্ন হলোÑ এই বিপুল অর্থ কোথায় গেছে? কত টাকা প্রকৃত শিল্পে বিনিয়োগ হয়েছে? কত টাকা প্রকল্প ব্যয়ের নামে অন্যত্র সরানো হয়েছে? কত ঋণের বিপরীতে অতিমূল্যায়িত জামানত নেয়া হয়েছে? কত ঋণ একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে বিতরণ হয়েছে? কত ঋণ রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে দেয়া হয়েছে? কত ঋণ পুনঃতফসিল করে কৃত্রিমভাবে নিয়মিত দেখানো হয়েছে? আর কত টাকা শেষ পর্যন্ত বিদেশে পাচার হয়েছে বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা হয়েই থাকবে।

সঙ্কটের কেন্দ্রে সুশাসন

বর্তমান তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলোÑ বাংলাদেশের ব্যাংকিং সঙ্কটকে শুধু ‘খেলাপি ঋণ সমস্যা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সাথে সুশাসনের সংকট, সম্পদমানের সঙ্কট, মূলধনের সঙ্কট এবং জবাবদিহির সঙ্কট।

কারণ একটি ঋণ যখন কয়েক বছর পর খেলাপি হয়, তখন তার সমস্যা শুধু ঋণগ্রহীতার নয়। ঋণ অনুমোদনের সময় ব্যাংকের কর্মকর্তারা কী করেছেন, পরিচালনা পর্ষদ কিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জামানত কিভাবে মূল্যায়িত হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কোথায় ছিল এবং পরবর্তী সময়ে পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনে কী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছেÑ সব কিছুর দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।

উপসংহার

৩০ জুন ২০২৬-এর তথ্য বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে একটি গভীর সতর্কবার্তা দিচ্ছে। ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা শ্রেণিকৃত। এর মধ্যে পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা কুঋণ। আর এই মন্দ ঋণের ৯৩ দশমিক ১০ শতাংশই রয়েছে মাত্র ২০টি ব্যাংকে।

একই সাথে প্রয়োজনীয় প্রভিশন চার লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা হলেও ব্যাংকগুলোতে রয়েছে দুই লাখ ৬১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২২ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যানের অর্থ অত্যন্ত গভীর।

এখন আর প্রশ্ন শুধুÑ ‘খেলাপি ঋণ কত?’Ñ এটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এর কতটা আদায়যোগ্য, কতটা প্রকৃত তি এবং সেই তি সামাল দেয়ার মতো মূলধন ব্যাংকগুলোর হাতে আছে কি না।

কারণ ব্যাংকের খাতায় একটি ঋণ খেলাপি হলেও তার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয় পুরো অর্থনীতিকে। আমানতকারীকে দিতে হয় নিরাপত্তাহীনতার মূল্য, উদ্যোক্তাকে দিতে হয় উচ্চ সুদের মূল্য, বিনিয়োগকারীকে দিতে হয় আস্থার সঙ্কটের মূল্য এবং শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনে করদাতাকেও দিতে হতে পারে ব্যাংক উদ্ধারের মূল্য।

তাই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন, বড় ঋণগ্রহীতাদের ফরেনসিক অডিট, প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ, সম্পদ উদ্ধার, প্রভিশন ও মূলধনের বাস্তব ঘাটতি নিরূপণ এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।

কাগজে পুনঃতফসিল করে বা হিসাবের শ্রেণী পরিবর্তন করে সঙ্কট আড়াল করলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং যত দেরি হবে, ব্যাংকিং খাতের তির বোঝা তত বেশি ছড়িয়ে পড়বে।

প্রসঙ্গত, ব্যাংকের টাকা কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়Ñ এটি আমানতকারীর অর্থ। আর আমানতকারীর অর্থের সুরা নিশ্চিত করা কেবল ব্যাংকের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতার মৌলিক দায়িত্ব।

ব্যাংক

কুঋণ (কোটি টাকা)

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ

৯৪,৯০৪

জনতা ব্যাংক

৭৫,২০১

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক

৬০,৫২৭

এক্সিম ব্যাংক

৩৫,০৬৯

অগ্রণী ব্যাংক

২৯,৮২৬

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক

২৮,৯৯৬

ন্যাশনাল ব্যাংক

২৮,১৫৮

আইএফআইসি ব্যাংক

২৭,৫৯৭

ইউনিয়ন ব্যাংক

২৬,৯১৯

এবি ব্যাংক

১৯,৫৬০

রূপালী ব্যাংক

১৮,৭৬০

সোনালী ব্যাংক

১৪,৩৫১

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক

১৪,১৬৮

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক

১৩,৪৭৯

প্রিমিয়ার ব্যাংক

১০,১৩৪

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

৮,৯৩৪

ইউসিবি

৮,৪৬২

বেসিক ব্যাংক

৮,০৯৬

পদ্মা ব্যাংক

৪,৮৬৭

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক

৪,৫৬০

মোট

৫,৩২,৫৬৯