অরুন কুমার চৌধুরী
বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি অতি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। সাধারণত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। উচ্চ সুদহার, উপযুক্ত জামানতের অভাব, জটিল ব্যাংকিং প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় বহু সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা হতে পারেন না। অথবা মাঝপথে ঝরে পড়েন।

দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানে এসবিএমএমইএফ প্রকল্পের বিশেষত্ব হলো- এটি সম্পূর্ণ লক্ষ্যভিত্তিক এবং কল্যাণমুখী। এই প্রকল্পের আওতায় ৬ শতাংশ সুদে, জামানতবিহীন, সহজ শর্তে দেশের অতি দরিদ্র, প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত এবং প্রকৃত বেকার যুবদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হবে, যা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় অনেক সহনীয় ও সুবিধাজনক।

নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ কোটা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই প্রকল্পের মোট ফান্ডের ৫০ শতাংশের ঋণ সম্পূর্ণভাবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে। গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের নারীরা যেন নিজেদের মেধা ও শ্রম খাটিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন। তারা পরিবারের অর্থনৈতিক হাল ধরতে পারেন। এটি নিশ্চিত করতে এই বিশেষ কোটার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে পাইলটিং প্রোগ্রাম : তিন জেলা দিয়ে যাত্রা শুরু
এসবিএমএমইএফ প্রকল্পের অংশ হিসেবে শেরপুর, কুড়িগ্রাম এবং বরগুনা জেলায় পাইলটিং প্রোগ্রাম হিসেবে ঋণ বিতরণ শিগগিরই শুরু হবে। এই তিন বিশেষ অঞ্চলকে নির্বাচনের মাধ্যমে অতি দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক চাহিদা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই পাইলট প্রজেক্ট থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে দেশব্যাপী এই মডেলের সম্প্রসারণ করা হবে।

কর্মসংস্থান ব্যাংক এ প্রকল্পে শুধু প্রথাগত ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাথে যুক্ত করেছে ‘ক্রেডিট প্লাস’ সেবা। এর মূল স্তম্ভগুলো নিম্নরূপ

ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ : ঋণ প্রদানের আগে বা ঋণ চলাকালীন সময়ে উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক হিসাবরক্ষণ এবং ডিজিটাল লেনদেনের ওপর বাস্তবমুখী গাইডলাইন ও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

নিবিড় তদারকি : ব্যাংক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি করা হবে; যা খেলাপি ঋণের ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে।

বাজার সংযোগ : ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য কিভাবে ছোট-বড় বাজারে বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিপণন করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় বাজার সংযোগ তৈরি করা হবে।

ভবিষ্যৎ করণীয় ও রূপান্তর
এই প্রকল্পকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল করতে সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

ডিজিটাল ও পেপারলেস ব্যাংকিং : ঋণ আবেদন থেকে শুরু করে অনুমোদন এবং আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হবে, যাতে গ্রাহক হয়রানিমুক্ত সেবা পান এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।

গ্রিন ও ইনোভেটিভ ফান্ডিং : প্রথাগত ব্যবসায় বা উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্প, আইটি ফ্রিল্যান্সিং, মোবাইল ও টিভি সার্ভিসিং এবং আধুনিক কৃষি-প্রযুক্তিতে তরুণদের নতুন নতুন আইডিয়াকে এই ফান্ডের আওতায় অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা : মাঠপর্যায়ে প্রকৃত অতি দরিদ্র, প্রান্তিক ও যোগ্য বেকার তরুণরা যেন এই ঋণসুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে শতভাগ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নজরদারি ব্যবস্থা করা হবে।

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কর্মসংস্থান ব্যাংক