যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় জীবনীশক্তি হলো তার নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিরাপত্তা। বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, শিল্প খাত এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন এক নজিরবিহীন জ্বালানি ও বিদ্যুৎসঙ্কটের ঘূর্ণাবর্তে আটকা পড়েছে। এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক বিশাল ও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও, গত ছয় মাসের মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রটি অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক। অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর নিম্নমুখী প্রবণতা, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয়ের দৃশ্যমান অভাব দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক গভীর কাঠামোগত সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

দেশের শিল্প খাতের রক্তক্ষরণ চলছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) দেয়া পরিসংখ্যান বলছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশের শিল্প খাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এই বিপুল অঙ্কের ক্ষতি কেবল কিছু ব্যবসায়ীর মুনাফা কমে যাওয়া নয়, বরং এটি সামগ্রিক জাতীয় আয়ের এক বিরাট অপচয়। দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা যেখানে প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে বড়জোর দুই হাজার ৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের এই যে বিপুল ঘাটতি, তা সরাসরি আঘাত হানছে দেশের তৈরী পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল ও সার কারখানার হৃৎপিণ্ডে। কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকলেও উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণের চড়া সুদ, শ্রমিকের নিয়মিত মজুরি এবং যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও থেমে নেই।

সবচেয়ে গভীর উদ্বেগের জায়গাটি হলো নতুন বিনিয়োগের স্থবিরতা। গ্যাসসংযোগ না পাওয়ায় সূত্র মতে বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৮৫৭ নতুন বিনিয়োগ আবেদন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সক্ষমতার অভাবে আটকে আছে। এই প্রকল্পগুলোতে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল, যা বিপুল সংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারত। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে উদ্যোক্তারা যখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন, তখন পণ্যের উৎপাদন খরচ বহু বেড়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ক্রমে তার অবস্থান হারাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রফতানি আয়ের ওপর এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং ডলার সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করবে।

এই বহুমুখী ও তীব্র সঙ্কটের শিকড় খুঁজতে গেলে কেবল বর্তমান সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে চলবে না; বরং ফিরে তাকাতে হবে বিগত দেড় দশকের ভুলনীতি, কৌশলগত ব্যর্থতা এবং অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরতার দিকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি নিরাপত্তার নামে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করলেও, এর ভিত্তিটি গড়ে তোলা হয়েছিল পুরোপুরি আমদানিকৃত জ্বালানির চোরাবালির ওপর। বিশেষ দায়মুক্তি আইনের ঢাল ব্যবহার করে কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই একের পর এক ব্যয়বহুল ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি করে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে এক ভঙ্গুর কাঠামোতে পরিণত করা হয়েছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় পঁয়তাল্লিশ শতাংশ সক্ষমতা দিনের পর দিন অলস বসিয়ে রেখে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্রভাড়া হিসেবে জনগণের করের টাকা থেকে দেশী-বিদেশী কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক সিস্টেম লসের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছিল। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে কার্যত অকার্যকর রেখে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং এলপিজি আমদানির এক বিশাল সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছিল। এক দশকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট থেকে ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে মাত্র ১৬৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আঠারো মাস দেশ পরিচালনা করেছে। সেই সময়ে তারা জ্বালানি খাতে বড় ধরনের কোনো নতুন সক্ষমতা বৃদ্ধি বা মেগা প্রকল্পে হাত দেয়নি ঠিকই, কিন্তু বিদ্যমান জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং অত্যন্ত সীমিত সম্পদের মাধ্যমেই তারা পরিস্থিতি বেশ সুচারুভাবে সামাল দিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সেই দেড় বছরে মানুষ লোডশেডিং বা জ্বালানি সঙ্কটের তীব্রতা সেভাবে অনুভব করেনি। কিন্তু বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর গত ছয় মাসে সেই ন্যূনতম ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতাটুকুও কেন ধরে রাখা গেল না, তা নিয়ে জনমনে প্রবল প্রশ্ন ও হতাশা তৈরি হয়েছে। দেশজুড়ে ঘন ঘন লোডশেডিং, গ্যাসের তীব্র অভাব এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষুব্ধ জনতা বিদ্যুৎ অফিসে ঘেরাও ও ভাঙচুরের মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটাচ্ছে। সরকারের মন্ত্রী ও কর্তাব্যক্তিরা এই সঙ্কটের জন্য বিগত পনের বছরের জঞ্জালকে দায়ী করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় চাইছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের যুক্তি হলো, ড. ইউনূসের সরকার যদি কোনো রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ছাড়াই আঠারো মাস পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পারে, তবে বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে আসা নির্বাচিত সরকার কেন তা পারছে না?

বিশ্লেষকদের মতে, সঙ্কটের এই তীব্রতার পেছনে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দৃশ্যমান। তবে এর পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতার দায়ও কোনো অংশে কম নয়। বাংলাদেশের প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ পেট্রোলিয়াম জ্বালানির চাহিদা মেটানো হয় বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পরিবহন ও বীমা ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য বাড়লেও ডলার সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর তার প্রভাব পড়ে বহুগুণ বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং এলএনজি সরবরাহের আকস্মিক ঘাটতি আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার এই নগ্ন ও ভঙ্গুর রূপটিকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। একটি উদীয়মান অর্থনীতি যখন তার কারখানার চাকা সচল রাখার জন্য পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাজারের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন এ ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় অনেকটাই অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

খাদের একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে সরকার কিছু তাৎক্ষণিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতি অনেকটাই সামলে ওঠা সম্ভব। শিল্পের এই ভয়াবহ স্থবিরতা কাটাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপে অতি সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকগুলো থেকে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের পুঞ্জীভূত সঙ্কট কাটাতে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) বকেয়া পাওনা বাবদ প্রায় তেরো হাজার কোটি টাকা দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। বিদ্যমান লোডশেডিং পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল কৌশলটি হলো, বিশ্ববাজারে বর্তমানে এলএনজির অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার চেয়ে ফার্নেস তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা রাষ্ট্রের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি সাশ্রয়ী। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অলস বসে থাকা প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতাকে যদি পুরোদমে কাজে লাগানো যায়, তবে তা আক্ষরিক অর্থেই একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস) সমান সুবিধা দিতে সক্ষম। সরকার আশা করছে, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে এই আইপিপিগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে আরো প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে এনে সেই সাশ্রয়কৃত বিপুল পরিমাণ গ্যাস ধুঁকতে থাকা শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত আপৎকালীন সিদ্ধান্ত।

কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, কেবল বকেয়া দেনা পরিশোধ বা ভারত থেকে জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক ডিজেল আমদানির মতো জোড়াতালির সমাধান দিয়ে এই গভীর কাঠামোগত ব্যাধি চিরতরে দূর করা সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে জ্বালানি নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত পরিবর্তন আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। প্রথমত, আমদানিনির্ভরতার সর্বনাশা পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দেশের স্থলভাগ এবং সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রমকে যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থার মতো গুরুত্ব দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত ও জোরালো করতে হবে। বাপেক্সকে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল দিয়ে শক্তিশালী করে পরিকল্পিত দেড়শটি গ্যাসকূপ খননের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার যে পরিকল্পনা সরকার হাতে নিয়েছে, তা যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। এখন পর্যন্ত মাত্র ত্রিশটি কূপের কাজ শেষ হওয়া মোটেও সন্তোষজনক নয়। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, তার প্রক্রিয়া যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থাকে, সে দিকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নজরদারি প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে একক কোনো রাষ্ট্র, কোম্পানি বা চুক্তির ওপর অন্ধের মতো নির্ভর না করে একাধিক বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে এবং মজুদ ও টার্মিনাল অবকাঠামো আরো টেকসই করতে হবে। বিকল্প জ্বালানির উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে কেবল নীতিমালার গোলকধাঁধায় সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহৎ পরিসরে বাস্তব প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং চলতি বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ উপকরণের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক ও আগাম কর প্রত্যাহার করেছে, যা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চুরি, অপচয় ও সিস্টেম লস শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনে সর্বত্র কঠোর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বা আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ কোনো বড় সঙ্কট দেখা দিলে দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা যাতে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত না হয়, সেজন্য অন্তত কয়েক মাসের জাতীয় চাহিদা মেটানোর মতো একটি কৌশলগত বা বাফার জ্বালানি মজুদ গড়ে তুলতে হবে। চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় অঞ্চলে ধাপে ধাপে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি নির্মাণের যে উদ্যোগ থমকে আছে, তা দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিতে হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সঙ্কট কেবল একটি সাময়িক সরবরাহ ঘাটতি নয়; বরং এটি একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা। বিগত দেড় দশকের জমে থাকা পাহাড়সম দুর্নীতি, অপরিকল্পিত চুক্তি ও কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই সঙ্কট রাতারাতি কোনো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় দূর হওয়া অসম্ভব। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সাথে জ্বালানি খাতের সমন্বয়, দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ও দক্ষ ব্যবহার এবং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কেবল আগামী দিনের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা সম্ভব। নীতিনির্ধারকদের এখন শুধু তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামাল দিলেই চলবে না, বরং একটি স্বনির্ভর, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি কাঠামোর মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলার দিকেই তাদের সব মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

rintuanowar.com