সুরঞ্জন ঘোষ
সেভেন সিস্টার স্টেটস- অরুনাচল, আসাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরাম ও ত্রিপুরা। উত্তর-পূর্ব ভারতে পাশাপাশি এই সাত রাজ্যের অবস্থান। হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ের সাতকন্যা, বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী। এ ছাড়াও সিকিম প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় তিন জেলা দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার উত্তর-পূর্ব ভারতের আওতাভুক্ত। ইংরেজিতে এ অঞ্চলকে বলা হয় North-East India ব্রিটিশ শাসকরা বলতো North-East Frontier of Bengal বা Bengal Frontier.
শেখ হাসিনার শাসন ছিল সিকিমের লেন্দুপ দর্জির মতো। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশকে ভারতের করদরাজ্য বানাতে চেয়েছিলেন। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ভারতের হাতে দিয়েছিলেন। বানিয়েছিলেন ভারতের বাজার ও নয়া উপনিবেশ।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো। কালপরিক্রমায় নানা রাজবংশ এই অঞ্চল শাসন করেছে।
উপমহাদেশে মুসলমান শাসকরাই প্রথম লিখিত ইতিহাসের সূচনা করেন। মুঘল আমলে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত হয় সুবে বাঙ্গালা। প্রথম দিকে দিল্লির বাদশাহদের নিযুক্ত সুবাদারগণ ও পরে কার্যত স্বাধীন নবাবগণ সুবে বাঙ্গালা শাসন করেন। সুবে বাঙ্গালার প্রসঙ্গ উঠলে দিল্লির মসনদকেন্দ্রিক সুলতান-বাদশাহ ও সম্রাটগদের বর্ণাঢ্য শাসনের কথা উঠে আসে। সমগ্র ভারতজুড়ে তুর্কি পাঠান ও মুঘলদের একটানা ৬৬৫ বছরের গৌরবদীপ্ত শাসনামল। (সুলতান মুহাম্মদ ঘোরি ১১৯২ সাল থেকে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত) আসাম ও উত্তর-পূর্ব ভারত সেই ইতিহাসের সাথে নানাভাবে যুক্ত।
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বখতিয়ার খিলজি হচ্ছেন প্রথম মুসলিম নৃপতি ও সিপাহসালার, যিনি আসামের মাটিতে পা রাখেন। বঙ্গবিজয় সুসংহত করে বখতিয়ার ১২০৬ সালে তিব্বত অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। তিনি গৌড় (মালদহ) থেকে আসাম হয়ে এই যাত্রা শুরু করেন। তিব্বত অভিযান সফল হয়নি। তবে বখতিয়ারের অনেক সৈনিক ও অনুসারী আসামেই থেকে যান। আসামে এখনো এরা ‘খিলজিয়া মুসলিম’ হিসাবে পরিচিত।
ব্রিটিশরা আসামকে বলত বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধীনেই তারা প্রথমে কলকাতা থেকে আসাম শাসন শুরু করে। পরে আসামকে চিফ কমিশনারের প্রদেশে পরিণত করা হয় ১৮৭৯ সালে। ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন মাথায় রেখে নতুন প্রদেশ ঘোষণা করেন ১৯০৫ সালে। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ নতুন প্রদেশের গোড়াপত্তনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা হয় নতুন প্রদেশের রাজধানী। ব্রিটিশদের গড়া এই প্রদেশ টিকে থাকে ছয় বছর।
কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি হিন্দু অভিজাত শ্রেণী পূর্ববাংলা আসাম প্রদেশ গড়ার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। ঢাকাকেন্দ্রিক নতুন প্রদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সহায়ক হবে এটা তারা মেনে নিতে পারেননি। তারা ‘বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের’ অভিযোগ তোলেন। ১৯৪৭ সালে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু বাবুরা অখণ্ড বাংলার পরিবর্তে পশ্চিমবাংলা নিয়ে ভারতে যোগদানকে শ্রেয় মনে করেন।
ঢাকাকে নতুন প্রদেশের উপযুক্ত রাজধানী করার জন্য গভর্নর ভবন সেক্রেটারিয়েট ভবন, হাইকোর্ট ভবন, ব্যবস্থাপক সভার ভবন ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন নির্মাণ করা হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে এসব ভবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া হয়। কার্জন হল ছিল পূর্ববাংলা ও আসাম সরকারের ব্যবস্থাপক সভার স্থান। পরে এই ভবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। আসামের গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। এটা উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়, পাকিস্তানের ভাঙন ও যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ উপমহাদেশের রাজনীতিকে নতুনভাবে বিন্যাস করে।
বিদ্রোহ প্রশমন, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিন্যাসের কারণে আসাম ভেঙে চারটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। এগুলো হচ্ছে অরুনাচল, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মেঘালয়। ১৯৭৫ সালে ভারতীয় সৈন্যরা সিকিম দখল করে নেয়। ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
সিকিমের ঘটনাবলি থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের শেখার আছে অনেক কিছু। ‘বাংলাদেশকে সিকিম বানানোর চক্রান্ত প্রতিহত করা হবে’ রাজনীতিতে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয় বারবার। লেন্দুপ দর্জির নাম এই অঞ্চলে উচ্চারিত হয় ঘৃণাভরে।
লেখক : বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা