চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১০ আসামি বেকসুর খালাস পেয়েছেন। রীতিমতো ১০ জন মানুষ মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। এখন তারা নির্দোষ প্রমাণ হয়ে সম্মান নিয়ে বাঁচার অধিকার ফিরে পাচ্ছেন। শুধু তাই নয় নিম্ন আদালতের যে বিচারক আগের রায় দিয়েছিলেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এই রায়ে। তার দেয়া ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডকে ‘মাইন্ডলেস সেনটেন্স’ বলে মন্তব্য করা হয়েছে। ওই বিচারক যাতে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে উচ্চ আদালতের বিচারকদের পক্ষ থেকে।

বিগত ফ্যাসিবাদী জমানায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা যে জাতির জন্য একটি ফাঁসে পরিণত হয়েছিল আলোচিত মামলাটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই মামলাটিকে একটি দুর্বৃত্ত চক্র ব্যবহার করেছে অর্থ কামানোর সুযোগ হিসেবে। যেমনটি সরকারের সব অঙ্গ ও কাঠামোকে তারা ফায়দা লোটার মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেছে।

দেশের ভেতরে যখন দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের অবিচার চলেছে তখন মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিকসমাজ এবং মিডিয়ার ভূমিকা ছিল চরম হতাশাজনক। মানুষ যখন বিচার না পেয়ে, কোনো অবলম্বন না পেয়ে আর্তনাদ করেছে, তখন এদের একটি অংশ কিছু ক্ষেত্রে মাফিয়া চক্রের সহযোগী ভূমিকা রেখেছে। উচ্চ আদালতের রায়ে নুসরাতের মৃত্যু নিয়ে ন্যায়ভ্রষ্ট বিচার জায়গামতো ফিরে এলেও শত শত ভুক্তভোগী মানুষের কান্না-আহাজারির অপনোদন হয়নি।

Nusrat-Feni

মামলাটির তদন্তভার পুলিশের বিশেষ বিভাগ পিবিআইকে দেয়ার পর শুরু হয় ষড়যন্ত্র। সাজানো হতে থাকে একের পর এক কল্পকাহিনী। নতুন করে বিন্যস্ত করা হয় আসামির তালিকা। যোগ হতে থাকে নতুন নতুন আসামি। পিবিআইয়ের তদন্ত কার্যক্রম যে সাজানো ও ষড়যন্ত্রমূলক ছিল তা মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১০ আসামির বেকসুর খালাস পাওয়া থেকে প্রমাণিত। ওই সময় এই চক্র মামলায় তাদের সাজানো আসামিদের কাছে থেকে নগদ ৭৭ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেয়। টাকা আদায় করতে গিয়ে নানা ধরনের ছলছাতুরী এবং নির্মম নির্যাতনের আশ্রয় নেয়। তাদের আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা প্রতিবাদ করতে চাইলে পিবিআই তাদের ভয়ভীতি দেখায় ও নির্মমভাবে দমন করে। বিষয়টি স্থানীয় মানুষজন জানে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভুক্তভোগীদের পরিবার এ নিয়ে মামলা করেছে।

তৎকালীন পিবিআই প্রধান বনজ কুমার নিজে এই চক্রের নেতৃত্ব দেন। এরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিনকেও এই মামলায় জড়িয়ে দেয়। তার কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয় মামলা থেকে বাঁচানোর আশ্বাস দিয়ে। পুলিশের এই টিমের লক্ষ্য ছিল কাকে ফাঁসালে বেশি অর্থ আদায় করা যাবে। সে জন্য আওয়ামী লীগের লোকেরাও এই তালিকায় এসে যায়।

শেখ হাসিনার সৃষ্ট মাফিয়াদের হাতে আওয়ামী লীগের লোকেরাও জিম্মি হয়েছিল। টেকনাফের কাউন্সিলর ইকরামসহ বহু আওয়ামী লীগ নেতা সেই মাফিয়ার শিকারে পরিণত হন। খুন-গুম, আয়নাঘরে তাদেরও যেতে হয়েছে। নিজাম হাজারির নেতৃত্বে ফেনীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ শক্ত মাফিয়া নেটওয়ার্ক কায়েম করেছিল। সেই নিজাম হাজারিও তার অধীনস্ত একজন আওয়ামী লীগ নেতাকে বাঁচাতে পারেননি সেই সময়কার বনজ কুমারের নেতৃত্বে চালিত চক্রের হাত থেকে। রুহুল আমিনকে অর্থ দিতে হয়েছে, বিনা অপরাধে মৃত্যুদণ্ডও পেতে হয়েছে। উচ্চ আদালত রুহুল আমিনকে খালাস দেয়ায় জোরালো প্রমাণ হাজির হয়, এই মামলা নিয়ে পিবিআই অনিয়ম দুর্নীতি করেছে। সোনাগাজী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর মাকসুদুল আলমকেও ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনিও বেকসুর খালাস পেয়েছেন।

হাসিনার সময় স্থানীয় ভুক্তভোগীরা কোথাও প্রতিকার পাননি। তবে জুলাই বিপ্লবের পর তারা এ নিয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছে। জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। সাবেক পিবিআই প্রধান বনজ কুমার, পুলিশ সুপার মাঈন উদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন, ওসি শাহ আলম, পিবিআই উপপরিদর্শক সন্তোষ চাকমা, রতেপ চন্দ দাস ও লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও মামলা করা হয়েছে। তারই সূত্র ধরে নুসরাত হত্যা মামলার পরবর্তীতে সাক্ষী পিবিআই উপপরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম বাবলু গত ১২ আগস্ট পুনরায় তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ফেসবুকে এক পোস্ট দেন। আসামির মধ্যে এমন নারীও রয়েছে যার স্বজনরা দাবি করছেন ঘটনার সাথে তার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না। তিনি ছিলেন সন্তান সম্ভবা। এই চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে জেলে তার সন্তানের জন্ম হয়েছে। সেখানে এই শিশু বেড়ে উঠেছে।

নুসরাত হত্যা মামলা নিয়ে বনজ কুমারের নেতৃত্বে ফেনীতে বাণিজ্যের বিষয়টি ছিল ওপেন সিক্রেট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতর এ ধরনের আরো বহু সদস্য তখন দেশের নানা এলাকায় ছোট ছোট সাম্রাজ্য কায়েম করেছিল। যেমন, টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার কক্সবাজারে এক অঘোষিত সম্রাট ছিলেন। আড়াই শতাধিক মানুষ হত্যা করেছেন, বহু নারীকে ধর্ষণ করেছেন। এক সাংবাদিকের চোখ উপড়ে ফেলেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য, ডিসি, এসপি কেউ তার বিরুদ্ধে সামান্য ব্যবস্থাও নিতে পারেননি। এসএসএফের অবসরপ্রাপ্ত চৌকস এক কর্মকর্তাকে হত্যা করার আগ পর্যন্ত তিনি মাফিয়া সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে দিয়ে গেছেন। একইভাবে নুসরাত হত্যা তদন্ত নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে ওই সময় বনজের বিরুদ্ধে কারো কথা বলার সাহস হয়নি। ফেনীর মাফিয়া নিজাম হাজারিও কখনো মুখ খোলেননি। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, দেশের শত শত সংবাদপত্র ও টেলিভিশন কেউ বিষয়টি নিয়ে টুঁ শব্দ করেনি। উপরন্তু কিছু সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিক এই মামলার তদন্ত নিয়ে পিবিআইয়ের গল্প রচনায় সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। কিছু কিছু সাংবাদিক ছিল অতিউৎসাহী। প্রবাসী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন প্রথম এই অবিচার নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেন। তার প্রতিবেদনে সব খোলাসা হয়ে গেলেও নির্যাতিতের পক্ষে কারো কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ওই সময় নির্মম অত্যাচারের ঘটনা নিয়ে একটি মানবাধিকার সংস্থাও মুখ খোলেনি। নাগরিক সমাজও হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। উল্টো পিবিআই ইলিয়াসের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়।

নুসরাত হত্যার মামলার রায় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ভঙ্গুর ও নড়বড়ে অবস্থাকে সামনে এনেছে। জুলাই বিপ্লবের পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ও যুদ্ধাপরাধ মামলায় একই নজির নিয়ে হাজির হয়েছে। গ্রেনেড হামলা মামলার সব আসামি বেকসুর খালাস পেয়েছেন। যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়কে মিসক্যারেজ অব জাস্টিস বলে মন্তব্য করেছেন আদালত। এই দুই মামলায় খালাস পাওয়া অভিযুক্তরা শুধু বিচারকের রায়ে নির্দোষ প্রমাণ হয়নি, জনতার আদালতেও তারা সজ্জন হিতৈষী হিসেবে মর্যাদা পেয়েছেন। এদের প্রায় সবাই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে এসেছেন। তাদের প্রতি মানুষের অগাধ ভালোবাসা ও সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে।

বিচারব্যবস্থাকে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার বানিয়েছেন, এ দিকে আরেকটি গোষ্ঠী একে বানিয়েছে অর্থকড়ি কামানো ও মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ হিসেবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভেতরে অনিয়ম-দুর্নীতি যারা সামনে আনবেন, মিডিয়া ও সুুশীল সমাজও তাদের পক্ষে চলে যায়; তখন জনগণের আর বাঁচার সুযোগ থাকে না। দেড়যুগে বাংলাদেশে এই দমবন্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। এ অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কার ও পুননির্মাণ দরকার। পাশাপাশি একটি দায়িত্বশীল মিডিয়া ও সংবেদনশীল নাগরিক সমাজও গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

নুসরাতের মৃত্যু নিয়ে একটি বড় রহস্য রয়ে গেছে। উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামির বড় অংশটি খালাস পাওয়ায় তা আরো ঘনীভূত হয়েছে। অন্তত ১০ জন নির্দোষ ব্যক্তি ইতোমধ্যে সাত বছর ধরে কারাগারের প্রকোষ্ঠে জীবন কাটাতে হয়েছে। যে চক্র তাদের অপরাধী হিসেবে সাজিয়েছে, বিচারকসহ তাদেরও বিচারের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো: মামুনুর রশিদকে এক ধরনের শাস্তি উচ্চ আদালত দিয়েছে। পুলিশের যে চক্র এর সাথে জড়িত তারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এটি কোনোভাবে ন্যায্য হতে পারে না। তাদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ আমলে নিতে হবে। এমন অবিচারের প্রতিকারে রাষ্ট্র যদি এগিয়ে না আসে তাহলে দেশে কখনো সুবিচার কায়েম হবে না।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত