মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের যেসব নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা ভারত সরকারের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের এক আমবাগানে প্রবাসী সরকারের ঘোষণা দেন। তারা সেই সরকারের আইনগত বৈধতা দিতে সেদিন ‘স্বাধীনতার সনদ’ (দ্য প্রোক্লামেশন অব ইনডিপেনডেন্স) জারি করেন। তবে ওই সনদ বলবৎ করার তারিখ দেয়া হয় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে। এ সনদই মুক্তিযুদ্ধকালীন নতুন দেশের মৌলিক আইন হিসেবে গণ্য হয়। ওই সনদে স্বাধীনতার উদ্দেশ্য হিসেবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’ নীতির কথা বলা হয়। এ সনদই ছিল প্রবাসী সরকারের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার একমাত্র উৎস। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত ‘স্বাধীনতার সনদ’ই ছিল দেশের সংবিধান।
এ সনদের আওতায় তৎকালীন প্রবাসী সরকার ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যদিও তিনি ছিলেন অনুপস্থিত। আওয়ামী লীগের অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামকে নিয়োগ দেয়া হয় উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকার জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রপতিকে সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয়। যে আওয়ামী লীগ সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার জন্য পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন সংগ্রাম পরিচালনা করল, তারা কেন রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি বেছে নিলো তা বোধগম্য নয়; অথচ সে সময় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রায় সবাই ভারতে উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার দেশে প্রত্যাবর্তন করে। এ সময় ১৬ থেকে ২১ ডিসেম্বর দেশ ছিল একরকম সরকারবিহীন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিব পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব ১১ জানুয়ারি ১৯৭২ বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করেন। এতে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থার কথা বলা হয়। রাষ্ট্রপতিকে করা হয় রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান। ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ শেখ মুজিব রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এরূপ পরিবর্তনের পেছনে যুক্তি দেখানো হয়- সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল বাংলাদেশের জনগণের আকাক্সক্ষা। এই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নেই অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করা হয়েছে।
স্মরণযোগ্য, ১৯৪৯ সালে জন্মের পর থেকে আওয়ামী লীগ ছিল দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৫৪ সালের ২১ দফা থেকে শুরু করে ১৯৬৮-৬৯ সালের ছয় ও ১১ দফা পর্যন্ত প্রতিটি প্রধান আন্দোলনে এবং চূড়ান্তভাবে ১৯৭০-৭১ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিব জনগণের কাছে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছিলেন, তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষপাতী এবং ক্ষমতায় যেতে পারলে দেশে সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন করা হবে। শেখ মুজিবের সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘যদিও সংদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেই এই আদেশ (অস্থায়ী সংবিধান আদেশ) প্রণয়ন করা হয়েছিল, তথাপি এর প্রকৃত ফলশ্রুতি ছিল এই যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়েছিল এক ব্যক্তির হাতেই। এটি ছিল পদ্ধতির এমন একটি পরিবর্তন যা শেখ মুজিবকে তার পদমর্যাদা পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রিত্ব অর্জনে সক্ষম করেছিল। আইন ও নির্বাহীবিষয়ক সমস্ত ক্ষমতা তখন পর্যন্ত ন্যস্ত ছিল শেখ মুজিবের হাতে। সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও বাস্তবে সংসদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সেখানে অবস্থিতি ছিল এমন একটি মন্ত্রিপরিষদের, যার সদস্যরা নিজের কাজের জন্য জনগণের কাছে দায়িত্বশীল ছিলেন না এবং প্রধানমন্ত্রীকে তার পদ থেকে অপসারণের কোনো পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল না। জনগণের মৌলিক অধিকারসহ সব অধিকার ছিল স্থগিত, হেবিয়াস কর্পাস জাতীয় রিট, অর্ডার কিংবা নির্দেশনামা প্রয়োগ, উচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালতের ওপর হুকুমনামা জারি করা, নিষিদ্ধকরণ, ক্যুর ওয়ারেন্টো, নিম্ন আদালতে বিচারিত মকদ্দমার নথিপত্র প্রেরণার্থে উচ্চতর আদালতের তলবপত্র জারি ইত্যাকার কার্যসম্পাদনে হাইকোর্টের ক্ষমতা রহিত করে রাখা হয়।
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান কার্যকর হয়। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়। নতুন সংবিধানে রাষ্ট্রপতির মর্যাদা, দায়িত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে নিম্নরূপ বলা হয়-
ক. বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন এবং তিনি আইন অনুযায়ী সংষদ সদস্য কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।
খ. রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করবেন এবং আইন অনুযায়ী তিনি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন।
গ. সংবিধান অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না এবং করে থাকলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, কোনো আদালত সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারবে না।
ঘ. প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় নীতিসংক্রান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখবেন এবং রাষ্ট্রপতি অনুরোধ করলে যেকোনো বিষয় মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য পেশ করবেন।
ঙ. কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে।
চ. রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো প্রকার ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যাবে না এবং তাকে গ্রেফতার করা যাবে না।
ছ. সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদ কর্তৃক রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যেতে পারে।
জ. শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে রাষ্ট্রপতিকে তার পদ থেকে অপসারণ করা যেতে পারে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে এরূপ ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি নামকাওয়াস্তের রাষ্ট্রপতি থাকতে চাননি। বিভিন্ন স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। একপর্যায়ে ঠিকই পদত্যাগ করেছিলেন। রাষ্ট্রপতির পদের চেয়ে মন্ত্রী হওয়া বেশি পছন্দ করেছিলেন তিনি।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী ছিল শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের আত্মপ্রবঞ্চনা ও জনগণের সাথে প্রতারণার এক বড় দলিল। নতুন সংবিধানের অধীনে ১৯৭৩ সালে সাধারণ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। যদিও ওই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলগুলো প্রচুর অভিযোগ উত্থাপন করেছিল; তথাপি আশা করা হয়েছিল, ক্রমান্বয়ে সংসদীয় ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক ধারা দেশে বিকাশ লাভ করবে। কিন্তু দুই বছরের ব্যবধানে পুরো জাতি বিস্মিত হয়ে শেখ মুজিবের হাতে আমূল পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করে।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় সূচিত হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর দুই বছরের ব্যবধানে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী দেশের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সংশোধনী প্রস্তাবটি পাস হয়। চতুর্থ সংশোধনীর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল- ক. রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার; খ. অ-দায়িত্বশীল মন্ত্রিপরিষদ; গ. নিষ্ক্রিয় আইন পরিষদ; ঘ. উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি; ঙ. মৌলিক অধিকার বলবৎ বাতিল; চ. বিচার বিভাগের স্বাধিনতা খর্ব; ঝ. স্থানীয় সরকারের সংগঠন অনিশ্চিতকরণ; ছ. একদলীয় ব্যবস্থা; জ. রাষ্ট্রপতি ও সংসদের আয়ু বৃদ্ধি।
ওই দিন পার্লামেন্টে সংবিধানে ব্যাপক সংশোধনী এনে মোট ১৫৩টি অনুচ্ছেদের ৩৭টিতে পরিবর্তন ও তিনটি নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়। এ ছাড়া তিনটি তফসিলেও সংশোধন আনা হয়। এসব সংশোধনীর ফলে সংবিধানের মূল চরিত্র পাল্টে দেয়া হয়। বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। রাষ্ট্রপতিকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে নামমাত্র উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদ রাখা হয়। এমনকি আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশাল’ গঠন করা হয়। সব দল, সংগঠন এমনকি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের ওই দলে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতিকে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা দেয়া হয়। সংবিধানে নাগরিকদের প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ব্যাপকভাবে খর্ব করা হয়। চতুর্থ সংশোধনীর আওতায় শেখ মুজিব কোনো নির্বাচন ছাড়া আজীবনের জন্য রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন। এক কথায়, দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের কবর রচিত হয় এমন নেতা ও তার দলের হাতে যারা দীর্ঘকাল গণতন্ত্রের সুখরোচক বাণী কপচিয়ে জনগণের হৃদয় জয় করেছিলেন। শেখ মুজিব কেন এমন অপরিণামদর্শী ও অ-জনপ্রিয় পদক্ষেপ নিতে গেলেন- এ প্রশ্নের জবাব এক কথায় দেয়া কঠিন।
মজার বিষয় হলো- শেখ মুজিব বাকশাল গঠন করে একচ্ছত্র ক্ষমতার স্বাদ বেশি দিন উপভোগ করতে পারেননি। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন। এরপর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর খন্দকার মুশতাক আহমেদ। তিনিও তিন মাসের মাথায় অপসারিত হন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয় বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে। তিনি ছিলেন নামমাত্র রাষ্ট্রপতি। সামরিক শাসনের আওতায় সেনানায়করা বিশেষ করে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন। কিছু দিন পর বিচারপতি সায়েমকে বিদায় দিয়ে জিয়াউর রহমান নিজে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের মূলনীতিসহ ব্যাপক পরিবর্তন আনলেও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা বহাল রাখেন। প্রথম ১৯৭৮ সালে জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করেন। তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে সেনাবাহিনীর একদল বিদ্রোহী সদস্যের হাতে তিনি নিহত হন। এরপর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হলে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। কিন্তু তিনিও বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অস্ত্রের মুখে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। সামরিক আইন জারি করে দেশ চালাতে থাকেন। ক্রমান্বয়ে সামরিক আইন তুলে নিয়ে গণভোট, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং দু’টো সংসদ নির্বাচন দিলেও তা দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। অবশেষে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে পদত্যাগে বাধ্য হন। রাজনৈতিক দলগুলো তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান তথা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেন। তার নেতৃত্বে ১৯৯১ সালে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তা সবার কাছে প্রশংসা কুড়ায়। ওই নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে রূপান্তর করা হয়। বিএনপির নিজস্ব দলীয় গঠনতন্ত্রে তখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার পদ্ধতির কথা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় এরূপ জাতীয় ঐক্য হয়েছিল।
সংসদীয় পদ্ধতির ব্যাপারে সবাই একমত হয়ে সংবিধানের যে সংশোধনী আনা হয়, তাতে রাষ্ট্রপতি পদের ক্ষমতা প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা হয়। তখন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, এখন রাষ্ট্রপতির জানাজা পড়া ছাড়া আর কোনো কাজ থাকবে না। সত্যিকার অর্থে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কোনো মিলাদের দাওয়াতে গেলেও তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ বা সম্মতি নিতে হয়। যদিও রাষ্ট্রপতি দেশের প্রথম ব্যক্তি। মর্যাদায় তিনি সবার উপরে; কিন্তু তাকে আলঙ্করিক পদে বসিয়ে রাখা তো কোনো কাজের কথা নয়। বিষয়টি দাঁড়িয়েছে এরূপ যে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কমাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা এতটাই বাড়ানো হয়েছে যে, তিনিই রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের মতো এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা পেয়ে গেছেন। বাস্তবে রাষ্ট্র রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীশাসিত পদ্ধতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। শেখ হাসিনার সময় এমন মন্তব্যও করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হলেন বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট। সংসদীয় পদ্ধতিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্রে সিনেট ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আছে; কিন্তু বাংলাদেশের সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী।
আমরা লক্ষ করলে দেখতে পাবো, তখন কোনো কোনো মন্ত্রী মাঝে মধ্যে বলতেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এটা-ওটা করা হয়েছে। বর্তমান আমলেও একই দৃশ্য দেখা যায়। অথচ তারা হয়তো জানেন না, কেবিনেট পদ্ধতির সরকার হচ্ছে সামষ্টিক জবাবদিহির সরকার। এখানে সব মন্ত্রী সমানভাবে দায়ী। আবার কোনো কোনো মন্ত্রী বলে থাকেন, এটি তার মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়, অন্য মন্ত্রণালয়ের। বাস্তবে ব্রিটিশ পদ্ধতির মন্ত্রিপরিষদশাসিত সরকার বা সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের পুরো মন্ত্রিপরিষদ সংসদ ও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। অপর দিকে, বাংলাদেশে দুটো রাজনৈতিক পরিবার থেকে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঐতিহ্য আছে। সেই সাথে যে ক’টি দল এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় গেছে, সে দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা নেই বললে চলে। কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দল সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে ভোটাভুটি না করে তারা দলীয় নেতার হাতে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দিয়ে দেন। এরূপ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের সহায়ক নয়।
যাই হোক, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়টি নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন ও একাডেমিয়াতে আলোচনা চলে আসছে। সবশেষ জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নকালে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। প্রায় সব রাজনৈতিক দল ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে সনদ প্রণয়ন করেছে, তাতে রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে, যা বেশ প্রণিধানযোগ্য। নিম্নে তা উদ্ধৃৃত করা হলো-
ক. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী আইনসভার উভয় কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন।
খ. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব : রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) সংশোধন করে এমন বিধান করতে হবে যে, কারো পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারবলে রাষ্ট্রপতি নিম্নলিখিত পদে নিয়োগ দিতে পারবেন- ১. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর; ২. এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য; ৩. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য; ৪. তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য; ৫. বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য; ৬. আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য।
গ. রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়া : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে, রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাস করার পর তা উচ্চকক্ষে প্রেরণ এবং উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অভিশংসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
ঘ. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শন : কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমে ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। সংশ্লিষ্ট আইনে বিধান রাখা হবে যে, এরূপ কোনো আবেদন বিবেচনার আগে মামলার বাদি বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের সম্মতি গ্রহণ করা হবে।
লক্ষণীয় যে, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলে সংসদের উচ্চকক্ষ চালু হতো। রাষ্ট্রপতি উভয় কক্ষের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হতেন। বর্তমান সরকার সেটি হয়তো চায়নি। আবার জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতিকে কতগুলো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতা দিতে চেয়েছে, সেটিও এখন পর্যন্ত হয়নি। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেখা গেছে, রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দলীয় আসামিদের রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় বের করে দেয়া হয়েছে। এইভাবে যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার না হয়, সে জন্য জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টিকে একটি ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতিতে আনার কথা বলা হয়েছে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বারবার সংসদীয় প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত হয়ে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির দিকে ধাবিত হয়েছে। একই সাথে ক্ষমতা এক হাতে কেন্দ্রীভূত করেছে। অন্য দিকে বিএনপি বারবার অধিকতর গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রাধান্য দিয়েছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পরে জাতি রাষ্ট্র কাঠামোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সংস্কারের যে সুযোগ পেয়েছিল, বর্তমান সরকারের আন্তরিকতার অভাবে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না, এটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব