রশীদ নবী
একটি সামুদ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় নিরাপত্তার কৌশলগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক থাকার কথা নয়। বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রসীমা, সামুদ্রিক সম্পদ, নৌপরিবহন, মৎস্য, জ্বালানি, বন্দর, সামুদ্রিক আইন ও নীল অর্থনীতি- সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সাথে সমুদ্রের সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে : জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত বলেই কি একটি মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনীর হাতে থাকা অপরিহার্য?

একটি সাম্প্রতিক বর্ণনায় বাংলাদেশের মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও কাঠামোগত বিবর্তনকে মূলত ‘কৌশলগত বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে যুক্তি দেয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে যদি কেবল বণিক জাহাজের নাবিক তৈরির প্রতিষ্ঠান বানানো হতো, তাহলে তা জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রয়োজন পূরণ করতে পারত না। একই সাথে নৌবাহিনীর প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে বিশ্ববিদ্যালয়টির কৌশলগত চরিত্রের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা হয়েছে।

এই যুক্তির একটি অংশ নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু পুরো সিদ্ধান্তটি গ্রহণযোগ্য কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন।

‘মেরিটাইম সেফটি’ আর ‘মেরিটাইম সিকিউরিটি’- দু’টিই গুরুত্বপূর্ণ
একটি জাহাজের নিরাপত্তা আর একটি রাষ্ট্রের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এক জিনিস নয়- এ কথা ঠিক। কিন্তু এখান থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় না যে সামুদ্রিক নিরাপত্তার জ্ঞান মূলত সামরিক প্রতিষ্ঠান থেকেই আসতে হবে।

মেরিটাইম সিকিউরিটি আজ বহুমাত্রিক বিষয়। এর মধ্যে সামরিক প্রতিরক্ষা যেমন আছে, তেমনি আছে সমুদ্র আইন, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ মাছ ধরা, মানবপাচার, জলদস্যুতা, সামুদ্রিক দূষণ, বন্দর নিরাপত্তা, সাবমেরিন ক্যাবল, জ্বালানি অবকাঠামো, সমুদ্রবিজ্ঞান, সামুদ্রিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য; অর্থাৎ একজন নৌ কৌশলবিদ সমুদ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা বুঝতে পারেন, কিন্তু তিনি সমুদ্রের সব মাত্রার বিশেষজ্ঞ নন। একইভাবে একজন ওশেনোগ্রাফার, সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ বা অর্থনীতিবিদও সামরিক কৌশলের পূর্ণাঙ্গ বিশেষজ্ঞ নন। একটি সত্যিকারের মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি হওয়া উচিত এই ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানকে একই একাডেমিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা।

সুতরাং প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘নৌবাহিনী বনাম বেসামরিক’ নয়; প্রশ্ন হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়টি কি সামরিক, বেসামরিক ও আন্তর্জাতিক জ্ঞানের সমন্বিত কেন্দ্র হতে পারছে?

বিশ্ববিদ্যালয় মানেই কি কমান্ড কাঠামো?
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন, জাহাজ বা প্রযুক্তি নয়; তার একাডেমিক স্বাধীনতা।

সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন হয় কমান্ড, শৃঙ্খলা, গোপনীয়তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তের। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন হয় প্রশ্ন করা, মতের ভিন্নতা, গবেষণার স্বাধীনতা, বিতর্ক ও প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ।

এই দুই সংস্কৃতি এক নয়। মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক যদি বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, নৌবাহিনীর কৌশল, প্রতিরক্ষা বাজেট, সমুদ্রসীমা বা কোনো সরকারি নীতির সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করতে চান, তখন তার একাডেমিক স্বাধীনতা কতটা থাকবে- এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন। কারণ জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও ভুল করতে পারে। আর সেই ভুল শনাক্ত করার জন্যই স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি কেবল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর নীতিগত সম্প্রসারণ হয়ে যায়, তাহলে সেটি থিংকট্যাংক হওয়ার বদলে পলিসি-সাপোর্ট ইনস্টিটিউশন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

‘বিইউপি মডেল’ কি সর্বত্র প্রযোজ্য?
বিইউপির মডেল অনুসরণের যুক্তিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু একটি সামরিক-সম্পৃক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক মডেলকে একটি পূর্ণাঙ্গ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আদর্শ ধরে নেয়া কতটা যৌক্তিক?

মেরিটাইম খাতের পরিধি নৌবাহিনীর চেয়ে অনেক বড়
বাংলাদেশের বন্দর, শিপিং কোম্পানি, জাহাজ নির্মাণ, নৌ প্রকৌশল, মৎস্য, সামুদ্রিক পর্যটন, অফশোর জ্বালানি, সমুদ্রবিজ্ঞান, সামুদ্রিক পরিবেশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নৌ আইন এবং নীল অর্থনীতির সাথে অসংখ্য বেসামরিক প্রতিষ্ঠান জড়িত।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি এসব খাতের জন্য মানবসম্পদ ও গবেষণা তৈরি করতে চায়, তাহলে তার প্রশাসনিক কাঠামোও স্বাভাবিকভাবেই বহুমাত্রিক হওয়া উচিত। নৌবাহিনী সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে; কিন্তু একমাত্র অভিভাবক হওয়া অপরিহার্য নয়।

জাতীয় নিরাপত্তা মানেই সামরিক নিরাপত্তা নয়
সমুদ্র নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলোর কিছু সামরিক নয়। ধরা যাক, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক দূষণ বেড়ে গেল। অথবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলো। অথবা গভীর সমুদ্রে অবৈধ মাছ ধরা বেড়ে গেল। অথবা কোনো বিদেশী কোম্পানি বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ আহরণে অসম চুক্তির সুযোগ নিলো।

এসব মোকাবেলায় যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি প্রয়োজন অর্থনীতিবিদ, সমুদ্রবিজ্ঞানী, আইনজীবী, পরিবেশবিদ, কূটনীতিক, প্রকৌশলী ও তথ্যবিশ্লেষক; অর্থাৎ জাতীয় নিরাপত্তাকে যদি আমরা সামরিক নিরাপত্তায় সঙ্কুচিত করি, তাহলে সামুদ্রিক নিরাপত্তার একটি বড় অংশই অদৃশ্য হয়ে যায়।

একটি আধুনিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এখন ‘whole-of-government’ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে। সমুদ্রের নিরাপত্তাও তার ব্যতিক্রম নয়।

সমুদ্রসীমা অর্জনের কৃতিত্ব : ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান
মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব বোঝাতে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা অর্জনের উদাহরণ দেয়া হয়েছে। এই অর্জন অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক। কিন্তু এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অন্য জায়গায়।

বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা পেয়েছে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নয়; পেয়েছে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, পেশাদার দক্ষতা, রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে। এটি আসলে প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের সামুদ্রিক শক্তির ধারণা নৌবাহিনীর বাইরেও বিস্তৃত।

একজন সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ, একজন কূটনীতিক কিংবা একজন সমুদ্রবিজ্ঞানীও জাতীয় নিরাপত্তার যোদ্ধা। তাদের যুদ্ধক্ষেত্র আদালত, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গবেষণাগার কিংবা কূটনৈতিক টেবিল।

তাই বাংলাদেশের মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ এমন হওয়া উচিত, যেখানে একজন নৌ কৌশলবিদ এবং একজন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞ একই গবেষণা প্রকল্পে কাজ করবেন; একজন ওশেনোগ্রাফার এবং একজন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক একই তথ্য বিশ্লেষণ করবেন; একজন অর্থনীতিবিদ ও একজন নৌ প্রকৌশলী মিলে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর বা অফশোর অর্থনীতির সম্ভাবনা মূল্যায়ন করবেন।

‘নৌবাহিনীর বিশ্ববিদ্যালয়’ নয়, ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়’
এখানেই মূল পার্থক্য। নৌবাহিনীর জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার। নৌ কৌশল, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামরিক অপারেশন ও নৌ যুদ্ধ বিষয়ে গবেষণার জন্য সামরিক প্রতিষ্ঠানও অপরিহার্য। কিন্তু মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় যদি হয় শুধু ‘নৌবাহিনীর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন বিশ্ববিদ্যালয়’, তাহলে তার সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যেতে পারে। বরং এর পরিচয় হওয়া উচিত- বাংলাদেশের সমুদ্রকে বোঝার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে নৌবাহিনী থাকবে, কোস্টগার্ড থাকবে, বন্দর কর্তৃপক্ষ থাকবে, শিপিং শিল্প থাকবে, মৎস্য বিশেষজ্ঞ থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন গবেষক থাকবে, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ থাকবে এবং পরিবেশবিজ্ঞানী থাকবে। নৌবাহিনীর উপস্থিতি যতটা শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন, একাডেমিয়ার স্বাধীনতাও ততটাই শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ‘সামরিকীকরণ’ নয়, একমাত্রিকতা
মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় নিরাপত্তার সাথে যুক্ত করার সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো- সমুদ্র এখন ভূরাজনীতির কেন্দ্র। এই যুক্তি সঠিক। কিন্তু এর উত্তর যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো সামরিকীকরণ, তাহলে আমরা সমস্যাটিকে একমাত্রিক করে ফেলব।

কারণ ভবিষ্যতের সমুদ্রযুদ্ধ কেবল যুদ্ধজাহাজ দিয়ে হবে না। হবে তথ্য দিয়ে, প্রযুক্তি দিয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, স্যাটেলাইট দিয়ে, সাবমেরিন ক্যাবল দিয়ে, সমুদ্র আইন দিয়ে, বন্দর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে, অর্থনৈতিক প্রভাব দিয়ে এবং কূটনীতি দিয়ে।

সুতরাং বাংলাদেশের দরকার এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা সামরিক শক্তিকে জ্ঞান দিয়ে সমর্থন করবে, কিন্তু নিজে কোনো সামরিক কমান্ড কাঠামোর সম্প্রসারণ হবে না। এটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

শেষ কথা
মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে কার ব্যক্তিগত ভূমিকা কতটা ছিল, কে কোন সভায় কী যুক্তি দিয়েছিলেন কিংবা কোন প্রশাসনিক কাঠামোর বিরুদ্ধে কী কৌশল নেয়া হয়েছিল- এসব ইতিহাসের অংশ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কৃতিত্বের বয়ান যথেষ্ট নয়।

প্রশ্নটি আরো বড়। বাংলাদেশ কি এমন একটি মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় চায়, যা মূলত একটি সামরিক-সমর্থিত কৌশলগত প্রতিষ্ঠান? নাকি এমন একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় চায়, যেখানে সামরিক শক্তি, বেসামরিক জ্ঞান, আন্তর্জাতিক আইন, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কূটনীতি একসাথে বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে? আমার উত্তর দ্বিতীয়টি। কারণ সমুদ্রের মালিকানা শুধু যুদ্ধজাহাজ পাহারা দেয় না; সমুদ্রকে যে রাষ্ট্র সবচেয়ে ভালো বোঝে, শেষ পর্যন্ত কৌশলগত সুবিধা তারই।

আর সেই ‘বোঝার’ কাজটি যদি বিশ্ববিদ্যালয় করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত তার স্বাধীনতা- কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নয়। বাংলাদেশের মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় তাই নৌবাহিনীর হতে পারে না, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়েরও একক সম্পত্তি হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত বাংলাদেশের সামুদ্রিক জ্ঞান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির যৌথ জাতীয় প্রতিষ্ঠান।

সামুদ্রিক শক্তির যুগে বাংলাদেশের প্রয়োজন শক্তিশালী নৌবাহিনী অবশ্যই। কিন্তু তার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী শক্তি হতে পারে- স্বাধীন, বহুমাত্রিক ও বিশ্বমানের সামুদ্রিক জ্ঞানব্যবস্থা।