আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভোটের লড়াই হতে যাচ্ছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গত ২৪ জুলাই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধানে ৯০ দিনের মধ্যে এই পদে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিধান আছে।

এই নির্বাচনের তাৎপর্য শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণে সীমাবদ্ধ নয়; এর অন্তরালে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির একটি পরিণত ও কৌশলগত অবস্থান প্রকাশ পাচ্ছে, যা অভিনিবেশের সাথে অনুসরণ করা প্রয়োজন।

সংখ্যার হিসাবটি সরল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সদস্য সংখ্যা ৯০। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারে সংসদ সদস্যদের নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেয়ার সুযোগ নেই। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম ইতোমধ্যে এই সতর্কবার্তা জোরেশোরে দিয়ে রেখেছেন। ফলে বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি, এটি গণিতের মতো পরিষ্কার। দলের উচ্চপর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম প্রায় চূড়ান্ত; চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মনোনয়ন অনুমোদন করেছেন বলে জানা গেছে। মির্জা ফখরুল সম্মতিসূচক বিবৃতিতে স্বাক্ষরও করেছেন।

এই পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে। পরাজয় যখন অবধারিত, তখন এই প্রার্থিতার যৌক্তিকতা কী? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কিছু মৌলিক প্রত্যয়ের মধ্যে।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, এর মূল্য শুধু জয়-পরাজয়ের ফলাফলে নিহিত নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণই একটি রাজনৈতিক বিবৃতি, একটি আদর্শিক অবস্থান। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম যখন বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন, আমরা এটিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হতে দিতে চাই না’-তখন তিনি আসলে গণতন্ত্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতির কথা বলছেন। কোনো নির্বাচনই, তা যতই ‘নিশ্চিত ফলাফলের’ হোক না কেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্পন্ন হওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য সুলক্ষণ নয়। বিরোধী পক্ষ যদি সংখ্যাগত দুর্বলতার অজুহাতে সর্বত্র নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের কাঠামো- সেটি ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। এদিক থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের সিদ্ধান্ত একটি পরিণত ও প্রশংসনীয় রাজনৈতিক পদক্ষেপ।

এই প্রসঙ্গে কর্নেল অলি আহমদের ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকানো যাক। তিনি ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের অধীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা হিসেবে রণাঙ্গনে লড়েছেন, বীরবিক্রম খেতাব অর্জন করেছেন, যা দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননাগুলোর একটি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনী ছেড়ে রাজনীতিতে আসেন, বিএনপি থেকে বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালের সংক্ষিপ্ত ১১ দিনের সরকারে বিদ্যুৎমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু ২০০১-এ চারদলীয় জোটের বিপুল বিজয়ের পরও মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি- যা তার রাজনৈতিক জীবনে একটি গভীর ক্ষতচিহ্ন রেখে যায়। ২০০৬ সালে বিএনপি ত্যাগ করে এলডিপি গঠন করেন। পরে ২০-দলীয় জোটে ফেরেন, আবার বেরিয়ে যান- কখনো কাছে, কখনো দূরে- এমন এক সুদীর্ঘ দোলাচল। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে বিএনপি থেকে প্রত্যাশিত আসন বরাদ্দ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে নির্বাচন করেন। রাজনীতিতে ‘শেষ কথা’ বলে কিছু নেই। অলি আহমদের যাত্রাপথ এই চিরন্তন সত্যের জীবন্ত উদাহরণ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে কর্নেল অলিকে বেছে নেয়ার কৌশলগত মাত্রাটি কী? এখানে কয়েকটি স্তরে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমত, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে ১১ দলীয় ঐক্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে- তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্মান করে এবং দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকেই দেখতে চায়। জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়ে আসছিল, সেখানে এই মনোনয়ন একটি কার্যকর পাল্টা বিবৃতি।

দ্বিতীয়ত, নাহিদ ইসলাম যথার্থই বলেছেন, ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়া উচিত ছিল। গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন, অতএব সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে একটি প্রকৃত অর্থে মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যেত। সংসদ সদস্যরা যখন দলীয় হুইপের কঠোর শৃঙ্খলে বাঁধা থাকেন, তখন তাদের ভোট আসলে ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনার প্রকাশ থাকে নয়- সেটি হয়ে দাঁড়ায় দলীয় সিদ্ধান্তের যান্ত্রিক বাস্তবায়ন। ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার না করে যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, তিনি সত্যিকার অর্থে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন পছন্দের ফসল কি না- এই প্রশ্নটি রাজনৈতিক দার্শনিকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী পক্ষ এই প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে সংস্কার আন্দোলনকে জিইয়ে রাখছে, যেটি একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক ভূমিকা।

তৃতীয়ত, এই প্রার্থিতা ১১-দলীয় ঐক্যের অভ্যন্তরীণ সংহতি ও সক্রিয়তার প্রমাণও বটে। একটি জোট তখনই কার্যকর থাকে, যখন সে প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, বিজয়ের নিশ্চয়তা না থাকলেও। জামায়াতের নেতৃত্বে এই জোট দেখাতে চাইছে, তারা শুধু রাজপথের আন্দোলনে নয়, সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

জামায়াতে ইসলামী জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সমাজে একটি বিশ্বস্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। দুর্যোগ ত্রাণ থেকে শিক্ষা বৃত্তি, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা থেকে স্থানীয়পর্যায়ে সামাজিক সংহতি রক্ষা- তৃণমূলপর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, সেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং নৈতিক রাজনীতির যে ঐতিহ্য, সেটিকেই সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে কার্যকরের প্রয়াস হিসেবে দেখা যায় এই প্রার্থিতাকে।

অন্য দিকে বিএনপির দিকে তাকালে কিছু বিষয় দৃশ্যমান হয়। বড় দল হওয়ার সুবিধা যেমন আছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ জটিলতাও কম নয়। দু’টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা, প্রার্থীর নাম আগাম ঘোষণা না করে মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করানো- এসব দলের ভেতরকার রাজনৈতিক গতিশীলতার চিত্র। বিএনপির মতো ব্যাপক জনভিত্তিসম্পন্ন একটি দলে স্বাভাবিকভাবেই নানা মত ও প্রত্যাশা কাজ করে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের পুরনো রীতিনীতি, আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ এবং ব্যক্তিগত প্রত্যাশার চাপ- এসব একটি বড় দলের চিরাচরিত বাস্তবতা। চিফ হুইপের কঠোর সতর্কবার্তার মধ্যেও দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিতের তাগিদ আছে।

১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাথে এবারের পরিস্থিতির তুলনা করলে পার্থক্য সুস্পষ্ট। সেবার আওয়ামী লীগ ছিল শক্তিশালী বিরোধী দল, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল প্রকৃত অর্থেই তীব্র- আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোটে জিতেছিলেন, বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২। আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক মঞ্চে অনুপস্থিত, বিরোধী জোটের সংখ্যাবল সীমিত। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেয়াটা রাজনৈতিক সাহসের পরিচয়। কারণ হেরে যাওয়া নিশ্চিত জেনেও মাঠে নামা এবং নিজের অবস্থান জানান দেয়া- এটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির মৌলিক চরিত্র। ভোটের ফলাফল হয়তো পূর্বনির্ধারিত; কিন্তু সেই ফলাফলের পথে যে প্রক্রিয়া, যে বিতর্ক, যে অবস্থান গ্রহণ- সেটিই আগামী দিনের রাজনীতির ভিত্তি নির্মাণ করে। ১১ দলীয় ঐক্যের সিদ্ধান্ত সেই ভিত্তি নির্মাণের সচেতন প্রচেষ্টা।

ভোটগ্রহণ ও গণনার পুরো প্রক্রিয়া টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার হবে। স্বচ্ছতার দিক থেকে এটি ইতিবাচক। সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে, তাদের বিভক্তিসংখ্যা অনুযায়ী ভোট দেবেন। এই প্রক্রিয়ায় কোনো গোপনীয়তা নেই, কোনো ম্যানিপুলেশনের সুযোগ নেই- এটিই সংসদীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

সব মিলিয়ে এই নির্বাচনকে ‘প্রতীকী’ বলা গেলেও এর তাৎপর্য মোটেও প্রতীকী নয়। বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দীর্ঘকাল ধরে একটি ‘ওয়ান-ম্যান রেস’ হিসেবে চলে এসেছে, সরকারি দল তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছে, বিরোধী দল নীরবে তাকিয়ে থেকেছে, আর একজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বঙ্গভবনে গেছেন। এই চর্চা গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের জন্য গর্বের বিষয় ছিল না। আজ সেই ধারা ভাঙছে।

বিএনপির প্রার্থীর জয় যেমন সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ফলাফল এবং ক্ষমতাসীন দলের সাংবিধানিক অধিকারের বাস্তবায়ন, তেমনি বিরোধী পক্ষের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত। রবার্ট ডালের ‘পলিআর্কি’ তত্ত্বে গণতন্ত্রের দু’টি অপরিহার্য শর্তের কথা বলা হয়েছে- প্রতিদ্বন্দ্বিতা (পড়হঃবংঃধঃরড়হ) এবং অংশগ্রহণ (ঢ়ধৎঃরপরঢ়ধঃরড়হ)। এই দু’টি শর্তের একটিও যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে গণতন্ত্র তার মর্মবস্তু হারায়।

তবে এই নির্বাচন থেকে একটি বৃহত্তর শিক্ষাও নেয়া দরকার। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যতদিন অপরিবর্তিত থাকবে, ততদিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক অনুশীলনের চেয়ে বেশি দলীয় সিদ্ধান্তের রাবার স্ট্যাম্পিং হয়ে থাকবে। এটি সংসদ সদস্যদের স্বাধীন বিচার-বিবেচনার পথ রুদ্ধ করে এবং সংসদকে কার্যত নির্বাহী বিভাগের অধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। জুলাই সনদে যে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তার বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের নির্বাচন ‘প্রতীকী’ই থেকে যাবে। আজকের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল - উভয়ের কাছেই জনগণের প্রত্যাশা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে শক্তিশালী করা, যাতে প্রতিটি নির্বাচনই হয়ে ওঠে প্রকৃত অর্থে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। সেই দিন আসবে কি না, নির্ভর করছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি ও সদিচ্ছার ওপর।

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Mal55ju@yahoo.com